প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৫১
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর: সুনামগঞ্জ
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক দফা দাবিতে রূপ নেওয়া ছাত্র—জনতার গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সেই ছয় দিনে সারা দেশের মতো সুনামগঞ্জেও দেখা গিয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘর্ষ, প্রতিবাদ এবং শেষমেশ বিগত সরকার প্রধানের চলে যাওয়া। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল জেলার প্রতিটি উপজেলার অলিগলিতে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা (জুলাই বিপ্লব, মনসুন রেভলিউশন, জেন—জেড বিপ্লব)—এ সুনামগঞ্জে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা ছিল মূলত দুই মেরুতে বিভক্ত। একদিকে বর্তমানের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা আন্দোলন প্রতিরোধে সক্রিয় ছিলেন, অন্যদিকে বিএনপিসহ আন্দোলনের পক্ষের রাজনৈতিক নেতারা ছাত্র—জনতার পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
দুই বছর আগের এই উত্তাল অধ্যায় সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। চরম উত্তাপ, সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিবাদী সুর, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ছাত্র—জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য, রক্তক্ষয়, ক্ষমতার পতন এবং সর্বস্তরের মানুষের বিজয়োল্লাস—সবকিছু একসূত্রে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল সেই দিনগুলোতে। সেই ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনাবলীই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
৩১ জুলাই ২০২৪: আইনজীবীদের মানববন্ধন, আ.লীগের অবস্থান
দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, গুলি ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে সুনামগঞ্জ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে জেলা আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উদ্যোগে মানববন্ধন হয়। বক্তারা বলেন, ‘নিরস্ত্র ছাত্র—জনতার ওপর পাখির মতো গুলি চালিয়ে দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। অবিলম্বে এর দায় নিয়ে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে, অন্যথায় ছাত্র—জনতা রাজপথ ছাড়বে না।’
একই সময়ে রাজপথে পাল্টা অবস্থান নেয় জেলা আওয়ামী লীগ। রমিজ বিপণিস্থ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করে বর্তমানের নিষিদ্ধ এই সংগঠনটি ‘বিএনপি—জামায়াতের, ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় প্রস্তুত’ থাকার ঘোষণা দেয়। ওইদিন এই সংগঠনের জেলা সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট বলেন, ‘বিএনপি এবং জামায়াত—শিবিরের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে আমরা রাজপথে ছিলাম, আছি এবং থাকব। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আমরা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।’ সীমান্তবর্তী মধ্যনগর উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এদিন সিলেটে শাবিপ্রবি কেন্দ্রিক ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ‘গানমিছিল’ সুনামগঞ্জের আন্দোলনকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
১ আগস্ট ২০২৪: রাজনৈতিক উত্তাপ ও নাগরিক কণ্ঠস্বর
শিক্ষার্থী—জনতা হত্যা’, নির্বিচার মামলা—গ্রেফতার এবং জামায়াত—শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জে দেখা যায় রাজনৈতিক পাল্টা—কর্মসূচি ও নাগরিক প্রতিবাদ। একদিকে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান, অন্যদিকে শহীদ মিনারে সাধারণ নাগরিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিবাদী সুর— শহরের পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাকর।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা ‘রক্তাক্ত জুলাই’ ও ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’ ব্যানার—ফেস্টুন নিয়ে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ করেন। গান, কবিতা ও বক্তব্যের মাধ্যমে তারা স্পষ্ট বার্তা দেন—‘একটি স্বাধীন দেশে এত সংখ্যক মৃত্যু দেখে কেউ চুপ করে থাকতে পারে না। চোখ বন্ধ করলেই ওই লাশগুলো দেখতে পাই। রক্ত দিয়ে আনা স্বাধীন দেশে এমন মৃত্যু কখনো কাম্য নয়।’ সমাবেশে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানানো হয়।
একই দিনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এবং ‘শোকাবহ আগস্ট’ ব্যানারে জেলা আওয়ামী লীগ শোক র্যালি ও সমাবেশ করে। সমাবেশে জামায়াত—শিবিরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, জামায়াত—শিবির কৌশল বদলে আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।
২ আগস্ট ২০২৪: জমিয়তের মিছিলে বাধা, দোয়া—প্রার্থনা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের হামলা, হত্যা ও গণগ্রেফতারের প্রতিবাদ এবং ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে সিলেট ও সুনামগঞ্জে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করে। সিলেটে আখালিয়া ও মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল এলাকায় পুলিশের টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপের পর প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে শিশুসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন এবং অন্তত ৮ জন শিক্ষার্থী আটক হন। সিলেট—সুনামগঞ্জ মহাসড়কের প্রায় এক কিলোমিটার অংশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এর প্রভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সুনামগঞ্জও। জামতলা মসজিদ থেকে জেলা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সমর্থক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী মিছিল বের করলে মাদানিয়া মাদ্রাসার সামনে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সহ—সভাপতি মাওলানা আব্দুল বছিরের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পুরো শহরে থমথমে ভাব বজায় থাকে।
৩ আগস্ট ২০২৪: শিক্ষার্থীদের প্রথম বড় মিছিল
সুনামগঞ্জ শহর দেখেছিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শাসকদলের সামনাসামনি শক্তির মহড়া। সুনামগঞ্জ শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে একদফা দাবিতে প্রথমবারের মতো বড় মিছিল বের হয়। ঐতিহ্য জাদুঘর থেকে শুরু হয়ে হোসেন বখত চত্বরে গিয়ে শেষ হয় মিছিলটি। স্লোগান ওঠে ‘তুমি কে আমি কে—রাজাকার রাজাকার’, ‘আমার ভাই মরলো কেন—শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘এক দফা এক দাবি—শেখ হাসিনা কবে যাবি’। সাধারণ ছাত্র—ছাত্রীর পাশাপাশি বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী—সমর্থকরাও এতে অংশ নেন।
একই সময়ে আলফাত স্কয়ারে অবস্থান নেয় জেলা ছাত্রলীগ। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট ও সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিনের নেতৃত্বে পৃথক দুইটি মিছিল ও সমাবেশ হয়। উভয় পক্ষই রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুনামগঞ্জে কোনো রকম সহিংসতা আমরা চাই না এবং সরকার আন্দোলনকারীদের অধিকাংশ দাবি মেনে নিয়েছে, বাকি দাবিও মেনে নেবে।
৪ আগস্ট ২০২৪: রণক্ষেত্র সুনামগঞ্জ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদফা দাবির শেষ দিন ৪ আগস্ট ছিল সুনামগঞ্জের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন। বেলা ১২টা থেকে পুরান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী—জনতা—বিএনপি—জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষ শুরু হয়, যা আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে। পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এতে প্রায় ৫০ জন আহত হন, ৬—৭ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেটে পাঠানো হয়। একজন আন্দোলনকারীকে পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। তার পায়ের গোড়ালি ভেঙে যায়। সংঘর্ষ চলাকালে বিএনপির কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার একটি চেষ্টা কয়েকজনের হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয়। সংঘর্ষের জেরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ে। পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
বিকালে আন্দোলনকারীরা কালেক্টরেট এলাকা, বড়পাড়া প্রবেশমুখী সড়ক ও বিদ্যুৎ অফিস সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ পুনরায় টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে উপজেলাগুলোতেও, বিশ্বম্ভরপুরে পুলিশসহ ৬০—৭০ জন আহত হন, তাহিরপুরে সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, জামালগঞ্জে দুই পক্ষের বাড়িঘর ও কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং দোয়ারাবাজারের আমবাড়ি সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ হয়। ছাতকে বিক্ষোভ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল। এছাড়াও মধ্যনগর উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আওয়ামী লীগের গণজমায়েত ও শান্তিগঞ্জে মিছিল হয়। তবে জেলায় ব্যতিক্রম ছিল জগন্নাথপুর উপজেলা। সেখানে দূরাপ্লস্নাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও ব্যবসা—বাণিজ্যসহ সব স্বাভাবিক ছিল।
সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সন্ধ্যায় অনির্দিষ্টকালের কাউফিউ, বিচারিক আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ও ৩ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এতে শহরের বিভিন্ন ব্যাংকের বুথে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে গ্রাহকদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
৫ আগস্ট ২০২৪: সরকার পতন ও বিজয় উল্লাস
পূর্ববর্তী পাঁচ দিনের উত্তেজনা, আতঙ্ক ও রক্তপাতের সমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্ট। এর আগে কোটাপ্রথা নিয়ে ৫ জুলাই শুরু হওয়া অহিংস আন্দোলন সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠে ১৫ জুলাই। ৩ আগস্ট শিক্ষার্থীরা সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি ঘোষণা করে। পরবর্তিতে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়। সারাদেশে কারফিউ ভঙ্গ করে ছাত্র—জনতা রাস্তায় নামেন। ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদফা দাবির মুখে দুপুর আড়াইটার দিকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেন। টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ব্যাপক ছাত্র ও গণবিস্ফোরণের মুখে এই বিদায় ঘটে।
এর আগে সকাল থেকে সুনামগঞ্জের মানুষ টেলিভিশনের পর্দার দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিজয় উৎসব। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে আনন্দ মিছিল শুরু হয়ে দ্রুত পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, আলফাত উদ্দিন স্কয়ার ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশু সবার বাঁধভাঙা ঢল নামে। জাতীয় পতাকা হাতে নেচে—গেয়ে উল্লাসে মেতে উঠেন হাজারো ছাত্র—জনতা।
বিকালে জেলা বিএনপির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নুরুল এক যৌথ বিবৃতিতে এই বিজয়কে ছাত্র—জনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয় বলে অভিহিত করেন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাইকে শান্ত থেকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান তাঁরা। এদিনে উত্তেজিত জনতার হামলা থেকে সুনামগঞ্জ সদর থানা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গণমাধ্যম কর্মী ও ছাত্র—জনতা।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন