প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৬
১৯৯২ সালের ৯ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী (ক্ষুদ্র জাতিসত্তা) দিবস’ পালনের আলোচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৪৯/২১৪ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ৯ আগস্টকে ’আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন। তখন থেকেই আদিবাসীদের অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস।’ দিনটি শুধু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি পৃথিবীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের স্বীকৃতির দিন। ২০২৬ খ্রি: আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিবাদ্য বিষয় হলো—“Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and well-being.” অর্থাৎ “আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন।”
বাংলাদেশ বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, লোকসংগীত, নৃত্য, উৎসব, সামাজিক রীতি ও জীবনদর্শন বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। আদিবাসী ফোরাম এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গারো, হাজং, খাসি, চাকমা, ত্রিপুরা, কোচ, বানাই, মনিপুরি, খিয়াং, ম্রো, বম, চাক, পাংখু, লুসাই, মারমা, তঞ্চঙ্গা, রাখাইন, খুমি, ডালু, সাঁওতাল, পাহাড়িয়া, মুন্ডা, মাহাতো, সিং, পাহান, রাজুয়াড়, মুসহর, রাই, বেদিয়া, বাগ্দি, কোল, রাজবংশী, পাত্র, মুরিয়ার, তুরী, মাহালী, মালো, উড়াঁও, ক্ষত্রিয় বর্মন, গন্ড, খন্ড, আসাম, গোর্খা, কর্মকারসহ ৫৪ টি স¤প্রদায়ের ৪০—৫০ লক্ষ আদিবাসী রয়েছে।
অইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯—এর অনুচ্ছেদ—১ অনুযায়ী আদিবাসী হওয়ার কতগুলি শর্তের কথা উলে¬খ করা হরেছে। শর্তগুলো :
১। কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের সদস্য যাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা রাষ্ট্রের অন্যান্য কমিউনিটির তুলনায় অনগ্রসর ।
২। যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তাদের রীতি—নীতি দ্বারা অথবা বিশেষ কোন আইনানুসারে পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত ।
৩। যাদের স্বতন্ত্র সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সত্বা রয়েছে ।
৪। তারা পূর্ব পুরুষ থেকে এসেছে যারা যুদ্ধে বিজিত হওয়ার ফলে কিংবা উপনিবেশে পরিণত হওয়ার সময় অথবা আধুনিক রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রতিষ্ঠা হওয়ার ফলে সংশি¬ষ্ট দেশে বসবাস করত ।
৫। যারা আইনগত দিক বিবেচনা না করেই তাদের সমস্ত কিংবা কিছু সামাজিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখতে চায় ।
৬। তাদের পরিচয় নির্ধারনের ক্ষেত্রে তারা যেভাবে পরিচিতি পেতে চায় আদিবাসী বা ট্রাইবাল হিসেবে তাদের আত্মপরিচয়কে মৌলিক মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে ।
কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, স্বাধীনতার প্রায় ৫৬ বছর পরেও আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমন কি আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারিভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রামে আদিবাসীরা বীরদর্পে সংগ্রামগুলোতে অংশগ্রহণ করেছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দিয়েছে প্রিয় স্বদেশ ভূমির জন্য তাদের বুকের তাজা রক্ত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আদিবাসীরা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে বার বার স্বীকৃতির দাবী করলেও আমাদের বাংলাদেশে এখন পর্যন্তও ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি মিলেনি। আবার বাংলাদেশ সরকার উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ—গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করেছেন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। বর্তমান সরকারের নিকট আমাদের প্রত্যাশা তারা হয়তো দ্রুত এ বিষয়টি সুবিবেচনা করবেন বলে আমরা মনে করছি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ছে। ভূমি নিয়ে বিরোধ, সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ অংশগ্রহণের সুযোগের অভাব তাদের জীবনকে আরও সংকটপূর্ণ করে তোলে। অধিকার মানে কেবল বেঁচে থাকার অধিকার নয়; মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারও। একজন আদিবাসী শিশু যেন নিজের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়, একজন তরুণ যেন যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, একজন নারী যেন নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন এবং একটি পরিবার যেন তার ঐতিহ্যগত ভূমি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে—এসবই ন্যায়সংগত অধিকার ও মানবিক মর্যাদার অংশ।
আদিবাসীদের স্বপ্ন
আদিবাসীদের স্বপ্ন সুজলা—সুফলা, শস্য—শ্যামলা, সবুজেঘেরা সুনিবিড় এই মাতৃভূমিতে নিজের আত্ম পরিচয়ে পরিচিত হওয়া। কারণ প্রতিটি নাগরিক আত্মপরিচয়ে পরিচিতি লাভের অধিকার রাখে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে ১৯৫৭ সালে আইএলও (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) কনভেনশন ১০৭ (ইন্ডিজেনাস এন্ড ট্রাইবাল পপুলেশন কনভেনশন ১৯৫৭) গণতন্ত্র, অসা¤প্রদায়িকতা ও সাম্যতা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭২ সালের ২২ জুন আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে অনুস্বাক্ষর করেন। পরবতীর্তে আইএলও কনভেনশন ১০৭—এর আংশিক পরিবর্তন করে ১৯৮৯ সালে কনভেনশন ১৬৯ প্রণয়ন করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের প্রতি সদয় দৃষ্টি দেয়া ।
আদিবাসীদের স্বপ্ন, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণতন্ত্র, অসা¤প্রদায়িকতা ও সাম্যতা নিশ্চিত করা। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। আদিবাসীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত বিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, বৃত্তি ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। তাই সরাকারের উচিত পিছিয়ে পরা নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা যোগাযোগে পিছিয়ে পরা দুর্গম এলাকায় বসবাসরত আদিবাসীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারীভাবে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং উচ্চ পর্যায়ে লেখাপড়ার জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টির করা।
আদিবাসীদের স্বপ্ন, তাদের ভূমি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভূমি—সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে—এমন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করাই উত্তম।
আমাদের আদিবাসীদের স্বপ্ন, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সার্বিক সহযোগিতা করা। আদিবাসী ভাষাগুলোর লিখিত ও মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, অভিধান ও শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, লোকগান—লোককথা সংগ্রহ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করা জরুরী প্রয়োজন। সংস্কৃতি কোনো জাদুঘরে বন্দি রাখার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন্ত পরিচয়ের অংশ।
আদিবাসীদের স্বপ্ন, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে তাদের স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত উন্নতি করা। দুর্গম অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক, চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
আদিবাসীদেও স্বপ্ন, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা আদিবাসীদের বাদ দিয়ে করা উচিত নয়। তাদের জীবন, ভূমি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
আদিবাসীদের স্বপ্ন, আদিবাসী নারী ও শিশুদের যেন বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। আদিবাসী নারীদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিশুদের ঝরে পড়া রোধ এবং বাল্যবিবাহ, সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আদিবাসীদের বিশেষ স্বপ্ন, আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য ও নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে হবে। পাঠ্যবই, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। ভিন্ন ভাষা, পোশাক বা সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা নয়—জানার ও সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আদিবাসী দিবস কেবল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর দিবস নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক মানবিক মূল্যবোধের পরীক্ষা। আমরা যদি বৈচিত্র্যকে সম্মান করি, অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতির মতো মর্যাদা দিই এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাহলে আমাদের সমাজ আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন ও নীতির মাধ্যমে অধিকার নিশ্চিত করা; আর নাগরিকের দায়িত্ব হলো বৈষম্য ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানো, গণমাধ্যমে ইতিবাচক উপস্থাপন এবং স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আদিবাসীদের স্বপ্নের ভোরবেলা
আদিবাসীদের প্রত্যাশা একদিন দীর্ঘরাত সুখের স্মৃতি খেঁাজতে খেঁাজতে স্বপ্নের ভেলা ভূমিতে চড়ে আদিবাসীদের রাতের পরিসমাপ্তি ঘটবে। স্বপ্নের ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আদিবাসীরা শুনবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের উপর থেকে উপ—জাতি বা ক্ষুদ্র নৃ—গোষ্ঠী নামের প্রলেপ মুছিয়ে আদিবাসীদের ইচ্ছা অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আর আদিবাসীরা সারা বিশে^ নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে বুক ফুলিয়ে। সকল আদিবাসী নারী—পুরুষ, ছেলে—মেয়ের ঢল নামবে রাস্তায় শান্তির অগ্রযাত্রায়। কেউ নাচবে, কেউ গাইবে নিজেদের ছন্দে আদিবাসী গান। আর মাঝে মাঝে আনন্দ ধ্বনিতে উচ্চারিত হবে ‘খা সাংমা’, “খা মারাক” (বিজয় ধ্বনি)। কারো হাতে ঢা’মা (ঢোল), আদুরু (বাঁশি), রাং (ঘন্টার ন্যায়), মিল্লাম—স্ফী (ঢাল—তলোয়ার), তীর—ধনুক, নাগ্রা (ঢোল বিশেষ) ও বিভিন্ন আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নেচে নেচে আনন্দ ফূর্তি করছে। সবাই আদিবাসী পোশাক পড়েছে। গায়ে পড়েছে আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরণের অলংকার থাংখা’ছড়া (রৌপ্যের অলংকার), খক্কাসিল (কপাল বেষ্টনি) , রিকমিচিক (গলার মালা), ও আরোও কত কি! সকল পুরুষ—মহিলা, ছেলে—মেয়েরা নতুন সাজে সাজবে সে এক অনাবিল শান্তি। আজ তারা দীর্ঘ—শ^াস নিতে পারছে অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে। আজ নেই কোন বাধা; আজ তারা নিজের ইচ্ছানুযায়ী নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারছে। আজ যে তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের আনন্দের আজ শেষ নেই। আকাশে, বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে আনন্দধারা। এ আনন্দধারা বর্ষিত হচ্ছে প্রতিটি আদিবাসী পল্লীতে, ছড়িয়ে যাবে শহরে, দেশে ও সারা বিশে^ সকল মানব জাতির উপর শান্তির ঝর্ণাধারা হয়ে। এ ছাড়াও তাদের জন্য হয়েছে আলাদা ভূমি কমিশন, অর্পিত সম্পত্তি আইন অবমুক্ত হয়ে আদিবাসীরা তাদের স্থাবর সম্পত্তি কোন শংকা ছাড়াই ফিরে পাচ্ছে, আদিবাসী অধ্যূষ্যিত এলাকার খাস জমি আদিবাসীদের নিকট বন্দোবস্ত হচ্ছে, আদিবাসীদের বংশপরম্পরায় বসবাস করা জমিতে ইকোপার্ক না হয়ে পতিত জমিতে ইকোপার্ক তৈরী হচ্ছে, আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিটি উপজেলায় বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে স্থাপিত হয়েছে আদিবাসী কালচারাল একাডেমি ও যাদুঘর আর এসব হতে অর্জিত রাজস্ব দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। আদিবাসীদের ধমীর্য় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের জন্য ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদযাপনে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমান সরকারি অর্থের বরাদ্ধ, প্রতি মৌসুমে সহজেই হাতের কাছে পাবে সেই জীবন বাজি রাখা পাহাড়ের ঝোপ ঝাড় পরিস্কারের মধ্য দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঝুম চাষ বা সমতল ভুমিতে কৃষি কাজের জন্য আধুনিক কৃষি উপকরণ, সার ও উন্নতমানের বীজ। এসব কৃষি উপকরণ, সার ও বীজ সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের যোগান দিচ্ছে তারা এবং দারিদ্রমুক্ত দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছে। আবার ফিরে আসছে সেই আনন্দঘন পরিবেশ ওয়ানগালা (নবান্ন উৎসব), রংচুগাল্লা প্রভৃতি অনুষ্ঠান। সরকারি চাকুরী নামক সোনার হরিণটি অধরা না থেকে কোন অনিয়ম/বাধা ছাড়াই বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি চাকুরীতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে আদিবাসীরা দেশের, জাতির ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
সেই স্বপ্নের ভোর বেলা কী আসবে? কখন আসবে? আদিবাসীদের স্বপ্ন কী বাস্তবরূপ লাভ করবে না? সেই স্বপ্নের ভোর বেলা যাতে শীঘ্রই ফিরে আসে আদিবাসীদের জীবনে; সেই প্রতীক্ষায় অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ৫০ লক্ষ আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি দেশের শক্তি। বাংলাদেশ তখনই সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ হবে, যখন এখানে বসবাসকারী প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী তার নিজস্ব পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে এগিয়ে যেতে পারবে। তাই আদিবাসী দিবসের অঙ্গীকার হোক—কেবল শুভেচ্ছা ও আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সমঅধিকার, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ। একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও অন্তভুর্ক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু তাদের দাবি নয়—এটি আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক : অধ্যক্ষ, স্যানক্রেড কমিউনিটি প্যারামেডিক ইনস্টিটিউট, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন