হাওরে মাছের আকাল

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩৮

জামালগঞ্জে বিপাকে জেলেরা

এক দশক আগেও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হালি ও পাকনার হাওর ছিল মাছের রাজ্য। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও হাওরাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ ঢাকা, ভৈরব, কুলিয়ারচরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে সেই চিত্র। সরকারি আইন অমান্য করে নিষেধাজ্ঞার সময়েও পোনা ও মা মাছ ধরার কারণে কমে গেছে মাছের উৎপাদন।
একারণে বর্ষার ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়ছে না। এতে স্থানীয় বাজারে মাছের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবার পড়েছে বিপাকে।

 


উপজেলার বৃহত্তম পাকনা ও হালি হাওর বর্ষাকালে প্রায় ছয় মাস অথৈ পানিতে পূর্ণ থাকে। এ হাওরের কালিবাউশ, পাবদা, চিংড়ি, লাছো, বোয়াল, বাঁশপাতা ও চাপিলাসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ স্বাদে অনন্য। এসব মাছের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। ফলে ক্রেতারাও মাছ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। 

 


স্থানীয়রা বললেন, এক মণ ধান বিক্রি করেও এখন এক কেজি দেশীয় মাছ কেনা যায় না।
দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির কারণ জানতে চাইলে জেলেরা জানান, জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার, জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া, মা ও পোনা মাছ নির্বিচারে ধরা এবং বিলের তলা শুকিয়ে মাছ ধরার কারণে দিন দিন মাছের অভয়াশ্রম নষ্ট হচ্ছে। একারণে ক্রেতা-বিক্রেতাসহ হাজারো জেলে পরিবার বিপন্ন হয়েছে।

 


জেলেদের দাবি, অনেক প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। কিছু প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমানিপুর, শ্রীমন্তপুর, জামলাবাজ, বদরপুর, উত্তর কামলাবাজ, গোপালপুর, নিতাইপুর, শরৎপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ হাওরে জাল নিয়ে মাছ ধরতে গেলেও আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। এতে হাওরাঞ্চলের জেলে পরিবারগুলো কর্মহীন হয়ে পড়ছে।
আমানিপুর গ্রামের জেলে রাধাকান্ত বর্মণ বললেন, কয়েক দশক আগে খাল-বিলে হাতে কিংবা জালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে পোনা ও মা মাছ ধরা, জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং কারেন্ট ও চায়না দোয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে মাছের বংশ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। হাওরে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে এবং জেলেদের আয়ের পথ বাড়াতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার যদি জাল কেনার সময় সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে জেলেরা নিজেরাই জাল কিনে মাছ ধরতে পারতেন। কারও কাছ থেকে জাল কেনার জন্য ঋণ নিতে হতো না।

 


সাচনা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী শমসের আলী বলেন, এক দশক আগেও হাওর থেকে সকাল-বিকেল জেলেরা মাছ ধরে সাচনা বাজারে নিয়ে আসতেন। এলাকার চাহিদা মেটানোর পর প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাছ ঢাকা, ভৈরব ও কুলিয়ারচরে পাঠানো হতো। কিন্তু এখন যে পরিমাণ মাছ আসে, তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করাই সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে ক্রেতা, বিক্রেতা ও জেলে পরিবারগুলো কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

 

 


তিনি বলেন, হাওরে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের জন্য অভয়াশ্রম স্থাপন করে প্রচুর পরিমাণ পোনা মাছ অবমুক্ত ও সংরক্ষণ করা গেলে কিছুটা হলেও মাছের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। হাওরের জেলেদের রক্ষা করতে হলে সরকার ও হাওরবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।


জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম বলেন, হাওরে মাছ ধরার জন্য জেলেদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। পরিচয়পত্র পাওয়া জেলেরা সমবায় সমিতি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

 


তিনি আরও বলেন, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পোনা ও মা মাছ ধরা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং বিলের তলা শুকিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে।
এ ব্যাপারে বিলের মালিক, এলাকাবাসী ও প্রশাসন সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশীয় মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাবে এবং হাওরের মাছের উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হবে।

 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার