আমাদের লোকবাদ্যযন্ত্রের অস্তিত্ব সংকট

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ২২:২৬

শিকড়ের সুর বনাম আধুনিকতার মোহ

আমাদের বাংলা গানের মূল প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে মাটির গন্ধে মাখা লোকবাদ্যযন্ত্রের মাঝে। যখন আজকের আধুনিক গিটার, প্যাড কিংবা কিবোর্ডের মতো বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব বা প্রচলন এই বঙ্গে ছিল না, তখনও আমাদের লোকশিল্পীরা গ্রামীণ বাদ্যযন্ত্রের জাদুকরী ধ্বনি দিয়েই মানুষের মন জয় করেছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকিয়ে রেখেছেন হাজার বছরের ঐতিহ্য।

 

লোকবাদ্যযন্ত্র কেবল সুর তোলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের জাতীয় সত্তা ও নিজস্ব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শাশ্বত সত্যকে ধারণ করেই কবি গেয়েছিলেন—“তাকডুম তাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল; আমি সব ভুলে যাই তা ভুলি না বাংলা মায়ের বোল।” আমাদের লোকগীতিতে এই বাদ্যযন্ত্রগুলো এতটাই জড়িয়ে আছে যে, এদের কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। একতারাকে নিয়ে যেমন গাওয়া হয়— “সাধের একতারা আমার বাংলাদেশ বিনে নাই কোনো ঠিকানা”, তেমনি দোতারাকে ভালোবেসে শিল্পী গেয়ে ওঠেন— “আজই আহা হা করিয়া বাজাও রে দোতরা, সুন্দরি কমলা নাচে!” যুগে যুগে লোকবাদ্যযন্ত্র এভাবেই আমাদের গানের শরীর ও আত্মাকে সমৃদ্ধ করেছে।

 

 


সম্প্রতি লোকসংস্কৃতির উর্বর ভূমি সিলেটে “সিলেট মিউজিক এসোসিয়েশন” নামে একটি নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। অত্যন্ত আশার কথা যে, এই সংগঠনের সাথে আমাদের লোকসংস্কৃতির অনেক কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব, প্রিয় মানুষ এবং প্রাজ্ঞ লোকগবেষকেরা যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই ২১ সদস্যের নবগঠিত কমিটির যন্ত্রশিল্পী তালিকার দিকে তাকালে এক তীব্র শূন্যতা ও হতাশা গ্রাস করে। কমিটির প্রতিটি যন্ত্রী শিল্পীই আধুনিক বিদেশি বাদ্যযন্ত্র বাজান। প্রশ্ন জাগে, যে সংগঠনের চালিকাশক্তিতে লোকগবেষক ও লোকসংস্কৃতির ধারকেরা রয়েছেন, সেখানে আমাদের নিজস্ব মাটির বাদ্যযন্ত্রের প্রতিনিধিরা কেন উপেক্ষিত? এখানে বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা নিন্দা জ্ঞাপন আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রযুক্তির প্রয়োজনে আধুনিক যন্ত্র আমরা ব্যবহার করবই, কিন্তু তা যেন কখনোই আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে হটিয়ে দিয়ে না হয়।

 

 

আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজী, একুশে পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) স্বর্গীয় শ্রী বিদিত লাল দাস মহাশয়ের কথা এই প্রসঙ্গে ভীষণভাবে মনে পড়ে। তিনি তাঁর সৃষ্টিতে সবসময় দেশীয় লোকবাদ্যযন্ত্রের সুনিপুণ ও নান্দনিক ব্যবহার নিশ্চিত করতেন। গুরুজী বলতেন— সানাই, একতারা, দোতারা, মন্দিরা ইত্যাদি লোকবাদ্যযন্ত্রই হলো আমাদের লোকসংগীতের আসল প্রাণ। এর সুর ছাড়া লোকগানের আসল নির্যাস অধরাই থেকে যায়। গুরুজীর সেই দর্শনের এক ঐতিহাসিক প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম ২০০৭ সালে কলকাতার “ওয়ার্ল্ড ফোক ফেস্টিভাল” (বিশ্ব লোক উৎসব)—এ। সেখানে ‘ছায়াবাণী স্টুডিওতে’ নৌকাবাইচের ওপর একটি ১৩ মিনিটের বিশেষ গান রেকর্ড করা হয়েছিল। অত্যন্ত গর্বের বিষয়, সেই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের লিড দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার এবং সাজ্জাদ ভাইয়ের। গানের শুরুতে বন্দনা পর্বে যখন সানাইয়ের করুণ অথচ গম্ভীর সুরটি বেজে উঠেছিল, মুহূর্তের মধ্যে তা পুরো মাঠের দর্শকদের মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। মূলত আমাদের লোকবাদ্যযন্ত্রের সেই খাঁটি ও জাদুকরী আবহ তৈরি করার কারণেই আমরা সেই বিশ্বমঞ্চে সেরা পুরস্কার লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কতটা শক্তিশালী, এটি তার এক অকাট্য দলিল।

 

 


কলকাতার সেই গৌরবময় সফরে আমাদের সাথে ছিলেন নজরুল সংগীতের শ্রদ্ধেয় গুণী শিল্পী হিমাংশু কাকা। এছাড়া আমাদের লোকসংগীতের অন্যতম দিকপাল জামাল উদ্দিন হাসান বান্না ভাই এবং প্রখ্যাত লোকগবেষক ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য মহাশয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা বর্তমান সময়ের এই সাংস্কৃতিক রূপান্তরকে খুব কাছ থেকে দেখছেন। আমার গভীর আফসোস ও মনকষ্টের জায়গাটি ঠিক এখানেই। এমন সব বিদগ্ধ ও প্রাজ্ঞ মানুষেরা চারপাশ জুড়ে থাকা সত্ত্বেও, একটি নতুন মিউজিক এসোসিয়েশনের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেশীয় লোকবাদ্যযন্ত্রের শিল্পীদের এই অনুপস্থিতি কীভাবে তাঁদের চোখ এড়িয়ে গেল? কেন লোকসংগীতের এই পুরোধা ব্যক্তিত্বরা বিষয়টি খেয়াল করলেন না কিংবা এর প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন না?

 

 


শেকড় বাঁচানোর আহ্বান একটি জাতির culture বা সংস্কৃতি তখনই পঙ্গু হয়ে পড়ে, যখন তার নিজস্ব উপাদানগুলো অবহেলায় হারিয়ে যায়। বিদেশি আধুনিক যন্ত্রের চটকদার সুর সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো আমাদের মাটির তৃষ্ণা মেটাতে পারে না। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, যদি নতুন প্রজন্মের কাছে একতারা, দোতারা, মন্দিরা বা সানাইয়ের বাদকদের যথাযোগ্য সম্মান ও স্থান করে দিতে না পারি, তবে আমাদের লোকসংগীত তার নিজস্বতা হারিয়ে যান্ত্রিক হয়ে পড়বে। তাই আসুন, নতুন কোনো প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাসোসিয়েশন গড়ার সময় আমরা যেন ঘরের মানুষকে ভুলে না যাই। আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটুক, কিন্তু তা যেন লোকবাদ্যযন্ত্র ও তার শিল্পীদের আত্মত্যাগকে আড়াল করে না দেয়। আমাদের শেকড়ের সুর বেঁচে থাকুক আমাদেরই সযত্ন পৃষ্ঠপোষকতায়।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, পাইকাপন, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার