প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪৩
পবিত্র হজব্রত পালন করে দেশে ফেরা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নারী রহিমা খাতুনের (৬০) কাছে কিছু টাকা ধার চেয়েছিলেন স্থানীয় এক লোক। রহিমা লোকটিকে টাকা না দিয়ে ‘বইতল’ বলে ভর্ৎসনা করেছিলেন। এতে ক্ষোভে ও অপমানে ওই নারীকে নিজ বাড়িতে কুপিয়ে নৃশংস কায়দায় হত্যা করেন ‘বইতল’ গালি শোনা লোকটি।
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার নাগরিকাপন গ্রামে ২০২০ সালের ২৮ জুলাই ঘটেছিল ঘটনাটি। বইতল গালি শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন আবদুল জলিল কালু (৪০)। এক গালিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেকটা বিচলিত ছিল তদন্তকারী পুলিশ দল। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে গালির বিষয়টি চরম অপমানসূচক হিসেবে প্রকাশ পায়। ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল আদালত ওই হত্যা মামলার রায়ে একমাত্র আসামি ‘বইতল’ কালুকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
কালু থেকে বাবুল, সিলেটি গালির তোড়ে এবার একটি নয়, ট্রিপল মার্ডার হয়েছে। সিলেটের রায়নগরে মিতালি আবাসিক এলাকায় গতকাল বুধবার সংঘটিত ট্রিপল মার্ডারের পেছনে তুচ্ছ একটি গালি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। হত্যার বর্ণনায় সিলেটি সেই গালিটি হচ্ছে ‘বাদ’।
বুধবার সকালে হত্যাকাণ্ডের পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে হত্যাকারী শনাক্ত করার পর বিকেলে গ্রেপ্তার হন বাবুল মিয়া (৪০) নামের স্থানীয় রংমিস্ত্রি। এ পেশার পাশাপাশি তিনি কসাইয়ের কাজও করতেন। বাবুল তার হাতের ছোরা দিয়ে পরপর তিনটি খুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঘুরেফিরে বলেছেন ‘বাদ’ বলে গালির কথা।
সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় ‘বাদ’ মানে বদ লোক। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি) সাইফুল ইসলাম জানান, সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির গৃহকর্মী তাহমিনা রংমিস্ত্রি বাবুলকে ‘বাদ’ বলে গালি দিয়েছিল। এই গালিতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল প্রথমে তাহমিনাকে ছোরা দিয়ে বুকে আঘাত করেন। পরে সাত্তারের স্ত্রী ও সাত্তারকে ছোরা দিয়ে আঘাত করে পরে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধারের পর এসএমপির ডিসি সাইফুল সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সিলেটি ভাষায় ‘বাদ’ বলা অপমানজনক। বাবুল এই অপমানের শোধ নিতে গিয়ে একে একে তিনটি খুন করেন।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রায়নগরে মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার পাশের একটি ঝোপ থেকে এই ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। ছোরাটি রক্তমাখা ছিল।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির।
পরে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন এসএমপির উপ-কমিশনার (ডিসি-নর্থ) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল মিয়া রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ছোরাটি ফেলে দেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেন। বুধবার সন্ধ্যায় সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও ছোরাটি পাওয়া যায় নি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে ওই এলাকায় আবার তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম সমন্বয় করা এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমরা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠাব। ছোরায় থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে কার রক্ত সেখানে রয়েছে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যাবে। হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণে ধারণা পাওয়া গেছে। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। এছাড়া একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্কটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। গৃহকর্মীর বাদ আচরণে বাবুল মিয়া ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় গিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।
সিলেটে লোডশেডিংয়ের সুযোগে বাসা ও মহল্লা সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত আবাসিক এলাকায় নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে। বাসায় ঢুকে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের বাসায় গৃহকর্মী তাহমিনাকে (১৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনায় প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘটনার পরপরই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তিনটি শাখা তদন্তে নামে।
স্থানীয়রা জানান, নিহত আব্দুস সাত্তার দম্পতি রায়নগরের মিতালি আবাসিক এলাকার প্রথম বাসিন্দা। তাদের মূল বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তৃণমূলে আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ সংগঠক হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তিনি ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিকভাবে নিস্ত্রিয় ছিলেন। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য পদে থাকা সাত্তার সাবেক পরিচালক ছিলেন।
সাত্তার-সুরাইয়া দম্পাতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা সপরিবারে লন্ডন ও আমেরিকায় থাকেন। সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া আমেরিকার পাসপোর্টধারী ছিলেন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন