খবরনামা

সাফল্যের চাবিকাঠি কী?

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩০

সুবিধাবঞ্চিত থেকে কিংবা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকলেও প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া সম্ভব। এটি এবার এসএসসির ফলাফলে শীর্ষ নম্বর পেয়ে সরকারি জুবিলীর শিক্ষার্থী প্রীতম বণিক ও ভালো ফলাফল করে জানান দিয়েছে শহরের বেসরকারি স্কুল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়ে বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় এবার উঠে এসেছে সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যের গল্প এবং সুনামগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনকারী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রীতম বণিকের অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। বুধবার (১২ আগস্ট) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কার্যালয়ে তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন পত্রিকার সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।


সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এসএসসি পরীক্ষায় ২৭টি জিপিএ—৫ অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা রহমান এই সাফল্যের পেছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, বিশেষ ও অতিরিক্ত ক্লাস, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং সর্বোপরি টিমওয়ার্ককে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রীতম বণিক তার সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের পেছনে মায়ের নিরন্তর সহযোগিতা, শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং টেক্সটবুকনির্ভর প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রীতম, তোমার এই সাফল্যের পেছনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল? কারও সহযোগিতা পেয়েছ কি?


প্রীতম বণিক: আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা আমার মায়ের। আমার মা আমার প্রতিটি ক্ষেত্রে, রেজাল্টের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাকে সর্বাধিক সাপোর্ট ও সহযোগিতা করেছেন। তিনি আমার বাবার অভাব পূরণ করেছেন। আমার বাবা নেই। কিন্তু মা আমাকে কখনো বাবার অভাব বুঝতে দেন নি। সব ক্ষেত্রে তিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া আমার সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী, আত্মীয়—স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরাও বিভিন্নভাবে আমাকে অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা করেছেন।


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: এই ফলাফল অর্জনের পেছনে কীভাবে পড়াশোনা করেছ? কতটা প্রস্তুতি নিতে হয়েছে?


প্রীতম বণিক: আমি প্রধানত টেক্সটবুকভিত্তিক পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি বিভিন্ন সহায়ক বইও পড়েছি। নিয়মিত স্কুলের ক্লাস করারও চেষ্টা করেছি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ২৭টি জিপিএ—৫ পেয়েছে। এই ফলাফলের পেছনে নিয়ামকগুলো কী?
নাসিমা রহমান: বিগত কয়েক বছর ধরেই সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় তার সাফল্য দেখিয়ে আসছে। শুধু লেখাপড়াই নয়—সাংস্কৃতিক অঙ্গন, খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, গ্রাফিতি অঙ্কন এবং বিজ্ঞান মেলায় জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করেছে। আর এবার যে ফলাফল হয়েছে, সেটি আমি বলব বিগত কয়েক বছরের প্রচেষ্টার ফল।
২০১৮ সালের আগে আমরা একটি খুব বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলাম। শিক্ষক সংকট ছিল, এক শিফটের স্কুল ছিল। পরবর্তীতে কমিটির অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজনমতো শিক্ষক নিয়েছি। বর্তমানে আমাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ১৮ জন এবং নন—এমপিও শিক্ষক আরও ২০ জন। স্টাফও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়েছি। আমরা কোনো দিকে ঘাটতি রাখি নি। ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে আমরা আপোস করিনি। আমরা মনে করেছি, যেকোনোভাবেই হোক ক্লাস সচল রাখতে হবে এবং স্কুলকে গতিশীল রাখতে হবে।

 


ভালো ফলাফল ধরে রাখতে হলে যে কাজগুলো করা প্রয়োজন, আমরা সেগুলো করেছি। বিশেষ ক্লাস, অতিরিক্ত ক্লাস—সবকিছুর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল টিমওয়ার্ক। আমার স্কুলের শিক্ষক—শিক্ষিকা ও স্টাফ সবসময় টিমওয়ার্কের মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন। তারই ফলাফল আমরা এবার দেখাতে পেরেছি।


আমি এ নিয়ে খুবই আনন্দিত, আপ্লুত ও গর্বিত। এর পেছনে নেতৃত্বেরও একটি বিষয় আছে। আমি নেতৃত্ব দিয়েছি, সেটা ঠিক; কিন্তু আমার সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা যদি সেভাবে পরিশ্রম না করতেন, সর্বাত্মক সহযোগিতা না করতেন, তাহলে হয়তো আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতাম না। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে চাই যে, আমরা আমাদের সততা ও প্রচেষ্টার ফল পেয়েছি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আসলেই এটি একটি টিমওয়ার্ক এবং টিম সঠিক নেতৃত্বের ওপর চলে। সঠিক নেতৃত্ব না থাকলে সফলতা আসে না। আপনার নেতৃত্বে এই সাফল্য এসেছে। আমরা আশা করব, আপনি এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন এবং পরবর্তী শিক্ষকরাও যারা দায়িত্বে আসবেন, তারাও এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখবেন। ম্যাডাম, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আপনারা যে সাফল্য দেখিয়েছেন, সে সম্পর্কে আরও কিছু বলবেন?


নাসিমা রহমান: আসলে সীমাবদ্ধতা আমাদের অনেক। এত বেশি সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের মেয়েরা ও শিক্ষকরা যে পর্যায়ে এসেছে, এটা অতুলনীয়, অবিস্মরণীয় সাফল্য। পাশাপাশি থাকা দুটি সরকারি স্কুলের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের শিক্ষকদের যে সুবিধা আছে, শিক্ষার্থীদের যে সুবিধা আছে, অবকাঠামোগত যে সুবিধা আছে, মাঠ বা স্পেসের যে সুবিধা আছে—আমাদের ছাত্রী বা শিক্ষকদের সেগুলো নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের কোনো খেলার মাঠ নেই। তারা ছোট্ট একটি জায়গায় খেলার অনুশীলন করে পুরস্কার জিতে নিয়ে আসে। অ্যাসেম্বলির সময় বারান্দার ছোট ছোট স্পেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে অ্যাসেম্বলি করতে হয়। আমাদের সমৃদ্ধ গবেষণাগার ও লাইব্রেরি—এগুলো আমরা অনেকটা নিজেদের প্রচেষ্টায় করেছি। আগে এগুলো ছিল না। ক্লাসের সংকট ছিল, শ্রেণিকক্ষের সংকট ছিল। আমরা এগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। কমিটির অনুমোদন নিয়ে যখন যেখানে যা প্রয়োজন হয়েছে, আমরা সেটার ব্যবস্থা করেছি। আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের। তারা অনেক সময় বেতন দিতে পারে না। বেতনের কারণে যেন তাদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেজন্য আমরা স্কুল থেকে বিনামূল্যে ও অর্ধেক বেতনের সুবিধা দিয়েছি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তার মানে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের মধ্যে সংযোগ বা মেলবন্ধন আরও শক্তিশালী করার জন্য আপনারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন?


নাসিমা রহমান: জি। আমরা গতকালও অভিভাবক সমাবেশ করেছি। সেখানে আমাদের মূল কথাই ছিল—আপনার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠান। কারণ অনেক ক্ষেত্রে স্কুলে না পাঠালে এই ফলাফল আসে না। নিয়মিত স্কুলে আসতে হবে— এটাই মূল কথা।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: চলতি বছরের ডিসেম্বরে আপনার চাকরিজীবন শেষ হয়ে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আপনার দীর্ঘ পথচলার শেষ পর্যায়ে এসে এই সাফল্য পেলেন। এটি আপনার জন্য নিশ্চয়ই বিশেষ আনন্দের ও গর্বের?


নাসিমা রহমান: অবশ্যই। আমি এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে চাই। আমার অবসরে যাওয়ার কয়েক মাস আগে আল্লাহ তাআলা আমাকে যে ফলাফল দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।


আপনি একটি কাজ করবেন, সেই কাজের ফলাফল যদি আপনার কাঙ্ক্ষিত হয়, কিংবা আপনার প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়, তখন অবশ্যই ভালো লাগবে। আমি মনে করি, এবারের ফলাফল আমার জন্য একটি বড় উপহার। আমি আশা করব, এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আমাদের স্কুলের শিক্ষক—স্টাফ অত্যন্ত দক্ষ, যোগ্য এবং পরিশ্রমী। তারা সবাই টিমওয়ার্কে কাজ করেন। এই টিমওয়ার্ক যদি বজায় রাখা যায়, তাহলে ফলাফল উত্তরোত্তর আরও ভালো হবে। জিপিএ—৫ ও সামগ্রিক ফলাফলের দিক থেকে একসময় আমরা জেলার দুটি সরকারি স্কুলের সঙ্গে সমান্তরালে এগিয়ে যেতে পারব—আমি এমনটাই মনে করি।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রীতম, তুমি সুনামগঞ্জে এসএসসিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছ। এটি আমাদের সবার জন্য আনন্দের বিষয়। এখন তোমার স্বপ্ন কী? ভবিষ্যতে কী করতে চাও?


প্রীতম বণিক: আমার স্বপ্ন এখন উচ্চমাধ্যমিক ভালোভাবে শেষ করে এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। আমি যেন দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারি—এটাই আমার ইচ্ছা।


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আমরা প্রীতমের ইচ্ছাশক্তির কথা শুনলাম। তার স্বপ্নের কথা জানলাম। আমরাও চাই, প্রীতমের সেই স্বপ্ন পূরণ হোক।
ম্যাডাম, আপনার নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই সাফল্য এসেছে। ফলাফল ধরে রাখা এবং আরও ভালো করার জন্য আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?


নাসিমা রহমান: আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। আমাদের শিক্ষক—শিক্ষিকারা অত্যন্ত আন্তরিক ও পরিশ্রমী। তারা যদি একইভাবে টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে আসা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আমরা আরও ভালো ফলাফল করতে পারব।


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আমরাও চাইব, আপনারা সমান্তরালে এগিয়ে যান এবং ফলাফলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আরও ভালো ফলাফল করেন। প্রীতম, আমরা চাইব তোমার স্বপ্ন পূরণ হোক।


একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো ফল এবং একটি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সাফল্য—দুটিই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়— সীমাবদ্ধতাই শেষ কথা নয়; ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম, সঠিক নেতৃত্ব ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সাফল্যের বড় শক্তি।

 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার