প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২১
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, গান, গল্প উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটক নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু কবির চিত্রশিল্প নিয়ে আলোচনা হয় না বললেই চলে। তিনি কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত হলেও সাহিত্যের সব বিষয়ে তিনি পা রেখেছেন। যেখানে তাঁর পদচারণা সেখানেই সোনা ফলেছে। সাফল্য ধরা দিয়েছে। সেগুলো আলোচনা, গবেষণা বিস্তর হচ্ছে। কিন্তু তার চিত্রকলা নিয়ে আলোচনা একেবারেই কম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা হলো বিশ্বকবির জীবনের শেষভাগের এক অনন্য সৃষ্টি। লেখার কাটাকুটি ও পদ্যের মার্জিন ঠিক করতে করতে প্রৌঢ় বয়সে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। তাঁর চিত্রকলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ছিল না, বরং স্বতঃস্ফূর্ত মন ও অবচেতন মনের গভীরে থাকা রূপ এখানে প্রকাশ পেয়েছে। ‘রবীন্দ্র চিত্রকলা জগতের অভিনব সৃষ্টি— অনন্য সাধারণ। তাঁর চিত্রকলা একান্তরূপে তাঁর নিজস্ব, তাঁর ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের দ্বারা চিহ্নিত। এ চিত্রকলার হুবহু অনুকরণ কারো পক্ষেই যেমন সম্ভবপর নয়, তেমনি মনের মতো করে সমুচিত ব্যাখ্যা দেওয়াও অসম্ভব। কোনো কলা সমালোচক যে একে কোনো বিশিষ্ট কলারীতির অন্তর্ভুক্ত করে দেখাবেন কিংবা তাঁর নিজস্ব কোনো ধরাবাধা তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে এর ব্যাখ্যা দেবেন তারও কোনো সম্ভাবনা নেই।’—(অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
লেখার খাতার কাটাছেঁড়া ও কাটাকুটি অংশকে জ্যামিতিক ছন্দে রূপ দিতে দিতেই তার চিত্রশিল্পের শুরু। সেসময়ের ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল ধারা কিংবা বেঙ্গল স্কুলের প্রথাগত বাস্তববাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক স্বাধীন ও আধুনিক পথ বেছে নেন। তার চিত্রকলায় শক্তিশালী কালি ও বলদর্পী রেখার ব্যবহার দেখা যায়, যা প্রকাশের মুন্সিয়ানায় অনন্য। মানুষের মনস্তত্ত্ব, রহস্য, অদ্ভুত মুখাবয়ব, এবং কল্পিত বা স্বপ্নের প্রাণী তার ক্যানভাসে রূপ পায়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আঁকা শুরু করলেন কবিগুরু। ১৯২৪ থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যু অবধি প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকে তিনি এক বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্তুর ছবি আঁকা শুরু করেন ১৯২৮ সাল থেকে। আজ আমরা ‘রবীন্দ্র চিত্রকলা’ বলতে যা বুঝি তা হলো— সেই সময় থেকে পরবর্তী দশ—বারো বছরে আঁকা তাঁর আড়াই হাজারের ওপর ছবি। নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি। আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন।’ জীবনের শেষলগ্নে (১৯২৪ থেকে ১৯৪১) বেশিরভাগ ছবিই এঁকেছেন। ছোটবেলার আঁকা—আঁকি শেখা পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প শিক্ষা প্রচলন— এগুলো তো ছিলই। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী— এঁরাও চিত্রচর্চা করতেন। ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক ভারতীয় চিত্রশিল্পের পথিকৃতজনদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য, আলাপ—আলোচনা এবং শিল্প পরিবেশ ইত্যাদির মধ্যে তাঁর ছিল বসবাস। জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারে প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র গিরীন্দ্রনাথ এবং তার পুত্র এবং রবীন্দ্রনাথের জ্ঞাতিভাই গুণেন্দ্রনাথ মূলত ছবিই আঁকতেন। আর গুণেন্দ্রনাথের তিন পুত্র গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ তো ভারতের চিত্রকলা জগতে দিকপাল। শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাঁদের দুই বোন বিনয়িনী ও সুনয়ানী। কবিগুরু রবি ঠাকুরের ছবিকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন— ১. নর—নারীর মুখের ছবি ২. জীব—জন্তু ও প্রতিকৃতি ৩. প্রকৃতির পটভূমিকায় মানুষের রূপকচিত্র ৪. অলঙ্কারিক চিত্র ৫. প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। তাঁর আঁকা নর—নারীর মুখের ছবিতে যেমন বিশিষ্ট মনের আকৃতি, তেমনি প্রতিকৃতিতে পাওয়া যায় তাদের স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। তাঁর চিত্রকলায় অপরূপকে সন্ধানের কোন আকুলতা নেই। আছে শুধু রূপকে অপরূপ করার সাধনা। তাঁর ছবিতে যে রহস্য, তা অরূপের রহস্য নয়, অপরূপের রহস্য। তাঁর কাব্যের এবং চিত্রকলার পার্থক্য এইখানে। সৃজনশীলতা প্রকাশের যতগুলো মাধ্যম রয়েছে, তার মধ্যে চিত্রকর্ম একটি অন্যতম মাধ্যম। বৈষয়িক জীবনে রবি ঠাকুরের মনে যে ভাবাবেগ, আবেগ, উদ্দীপনা ও সৌন্দর্যবোধের উদয় হতো তা তার চিত্রে প্রতিফলিত হতো। চিত্রকলায় কবির প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও তিনি চিত্র অঙ্কনে ছিলেন বেশ দক্ষ। ‘পূরবী’ ছবিটি তাঁর আঁকা অন্যতম ছবি । কবি কায়সুল হক রবীন্দ্রনাথের চিত্রাবলী শীর্ষক একটি কবিতায় তাঁর চিত্রমালা চর্চা সহজেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এভাবে— ‘দুঃখগুলো কি রবীন্দ্রনাথ/ভুলবার জন্যে/নাকি খুব সহজেই/বোঝা যাক তার দুঃখগুলো/তাই যত্নশীল হয়ে এঁকেছেন এই সব ছবি।/সেই সরোবর তাঁর রঙের রেখার/খেলা। আর দীপান্বিত মনের আকুতি।/হয়তো মনের সঙ্গে হয়ে গেছে মাখামাখি নানান রঙের সহজেই।’ তাঁর ছবির আর একটা বৈশিষ্ট্যময় পরিচয় হলো শিল্পজ্ঞানহীন—নির্মল নির্দোষ মনোভঙ্গির শিল্প চিত্রময়তা। ‘মা ও ছেলে’ শীর্ষক একটি ছবিতে দেখা যায়, একজন মধ্যবয়সী মা তার শিশু ছেলেকে কোলে নিয়ে আসীন। হালকা বাদামি শাড়ি পরিহিত মার কোলে পরিধেয় বিহীন শিশুর অবস্থান আর মায়ের দৃষ্টি যেন দারিদ্রের প্রকাশ। প্রাণি সদৃশ ছবিগুলো তৈরি করেছেন রবীন্দ্রনাথ, সেই তাঁর অনুজ্জ্বল রঙের মুন্সীয়ানা ব্যবহারে। গাঢ় কালো, বাদামি, লাল আর হলুদাভ রঙে তাঁর ক্যানভাস হয়ে উঠেছে মূর্ত। রঙের ব্যবহারে ছবিতে কখনো কখনো বিষাদ, ব্যাঙ্গ, আদিমতা আর রহস্যময়তার প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর অঙ্কিত ফর্মগুলোতে নেই রঙের প্রচণ্ডতা। এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি প্রকৃতির বিচিত্র রূপ এঁকেছেন। তবে রং তাঁর ছবিতে প্রাণময়তা খুব আনেনি বরং হয়েছে বিষন্নতার প্রতিমূর্তি। নারী রবীন্দ্রনাথের অন্যতম বিষয় ছিল। কখনো যোগাসনে, কখনো যুগলে, কখনো সুশ্রীতায়, কখনো উপবেশনে নানা আসনে নারী উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর ক্যানভাসে। উজ্জ্বল লাল রং, সাদা কালো, ধূসর, কালচে বাদামি রঙে নানা বৈচিত্রে নারী রবীন্দ্র চিত্রকলার উপজীব্য হয়েছে। ‘নিসর্গ’ শীর্ষক তাঁর কাগজে কালি ও জলরংয়ে করা ছবিটি অনবদ্য হয়েছে। ঘন আঁধার, গাছপালার মাঝে কুটিরের আভাস, আর বন বনানীর ফাঁকে সাদা আকাশ সত্যিই নিসর্গের অনবদ্যতা প্রকাশ করে। কবিগুরুর চিত্রকলা নিয়ে বলতে গিয়ে কাইয়ূম চৌধুরী বলেন—— ‘রবীন্দ্র চিত্রকলায় আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তাঁর রমণী মুখাকৃতি, জলরঙে, কালি কলমে আঁকা বাঙালি রমণীর লালিত্য তাঁর ছবিতে আবিশ্বাস্য সৌন্দর্যে্য ধরা পড়েছে। অন্য কোনো শিল্পীর কাজে এমনটা দেখা যায়নি। মুখাবয়বগুলো অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের আশপাশের পরিচিত জনেরই ছায়া। এমন শ্যামল সুন্দর ছবি রবীন্দ্রনাথের সংগীতের মতোই চিরকালীন’—(কাইয়ূম চৌধুরী: রবিতীর্থে রবীন্দ্রনাথ)। রবীন্দ্রনাথ কাগজ ও কালিতে ছবিগুলোতে জীবন দান করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি একটি অন্তর্নিহিত ছন্দ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। নারীর অবয়ব সবচেয়ে ভালো ফুটিয়ে তুলেছেন তুলিতে। প্রাকৃতিক দৃশ্যেরও অনেক ছবি এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ।
শিল্পী যামিনী রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি আঁকার ভঙ্গি সম্পর্কে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকেন খাঁটি ইউরোপিয়ান ভঙ্গিমায়। শিল্পসুষমা ও রং প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তিনি বিস্ময়কর উৎকর্ষতায় এগিয়ে ছিলেন। এসব কারণেই পশ্চিমারা তাঁর শিল্পকলাকে প্রশংসা করেছে। আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী করে সহায়তা করেছে। এটা বাংলা সাহিত্যের জন্য বিরাট পাওনা। রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ কাজ এখনো প্রকাশিত হয়নি। তিনি গারো বাদামি এবং কালো রং বেশি ব্যবহার করতেন। তিনি খুব কম সময়েই লাল এবং সবুজ রং ব্যবহার করতেন। নারী ছবিগুলো বেশি জীবন্ত হয়েছে। রবি ঠাকুর পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য সমালোচক ও লাতিন আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সহযোগিতায় ১৯৩০ সালে প্যারিস শহরের পিগ্যাল আর্ট গ্যালারিতে তার প্রথম শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে এ প্রদর্শনী চলে। প্রতিটি প্রদশর্নী সমসাময়িক চিত্র সমালোকদের আকৃষ্ট করেছে। ইউরোপীয় চিত্রামোদীরা ঠাকুরের ছবিতে ভারতীয় নয় বরং আধুনিক ইউরোপীয় অঙ্কনরীতির সাযুজ্য লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছেন। বিশেষ করে বার্মিংহাম, লন্ডন, বার্লিন, মিউনিখ, কোপেনহেগেন, জেনেভা, মস্কো, বোস্টন, নিউ ইয়র্ক এবং সর্বশেষে ১৯৩১ সালের মে মাসে ফিলাডেলফিয়ায় এ প্রদর্শনী শেষ হয়। তাঁর ছবিগুলো বর্তমান সময়ের চিত্রগ্রাহক ও বোদ্ধাদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ।
১৯২৩ সালে রক্তকরবীর পাণ্ডুলিপির খসড়ার পাতায় তাঁর কাটাকুটি থেকে ছবি তৈরির উদাহরণ আছে। ১৮৭৮—৮২ সময়কালে রবীন্দ্রনাথ 'মালতী' নামে একটি পুঁথির পাতায় ছবি আঁকতেন। ১৮৮৯ সালের দিকে তিনি একটি পকেটবুক রাখতেন, তাতে যখন যা মনে হত, তাই আঁকতেন। ওকাম্পোর ব্যাপারে এটুকু অন্তত বলা যায় — শেষ বয়সে সাহিত্য ছেড়ে চিত্রকলায় মনোনিবেশের পেছনে রবীন্দ্রনাথের আর্জেন্টিনা উপাখ্যান এবং ওকাম্পোর উৎসাহের ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে খুব বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্যারিসে প্রথম প্রদর্শনীর সময় রবীন্দ্রনাথের কাছের বন্ধু—বান্ধবদের অনেকেই মুখ টিপে হেসেছিলেন। তা সত্ত্বেও প্রদর্শনী থেমে থাকেনি। ১৯৩০ সালের মে মাসে প্যারিসের পিগ্যালে প্রদর্শনীর পর রবিঠাকুরের চিত্র—প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হল জুন মাসে বার্মিংহ্যাম ও ইন্ডিয়া সোসাইটি, লণ্ডনে। জুলাই মাসে বার্লিন, ড্রেসডেন, মিউনিখে। আগস্ট মাসে কবিগুরুর ছবি প্রদর্শনী হয় কোপেনহেগেন ও জেনেভায়। সেপ্টেম্বরে মস্কোয়, অক্টোবর মাসে আমেরিকার বোস্টনে এবং ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়ায়। জার্মানিতে সফল চিত্রপ্রদর্শনীর পর কবিগুরু প্রায় শিশুর মতো উৎফুল্ল হয়ে সে সময়কার আরেক 'গুণমুগ্ধা' রানী মহলানবিশকে লিখলেন, ‘আজ আমার জার্মানির পালা সাঙ্গ হল, কাল যাব জেনিভায়। এ পত্র পাবার অনেক আগেই জানতে পেরেছ যে, জার্মানিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতকটা আশা করি তোমরা বোঝো।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা দুটি বিখ্যাত ছবি হলো ‘নৃত্যরতা নারী’ এবং ‘মা ও ছেলে’ । জীবনের শেষভাগে এসে তিনি স্বকীয় ও আধুনিক ধারায় বহু চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেন। ঠাকুর পরিবারে প্রথম থেকেই শিল্পচর্চার পরিবেশ ছিল। ৬নং জোড়াসাঁকোর ‘দক্ষিণের বারান্দায়’ শিল্পচর্চায় মগ্ন গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেশবিদেশ থেকে বিখ্যাত শিল্পীরা দেখা করতে আসতেন। এসেছিলেন ওকাকুরা, রদেনস্টাইনসহ অনেকেই। আর রবীন্দ্রনাথ নিজের বাড়িতে এবং শান্তিনিকেতনে বসেই অবলোকন করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, অসিত হালদার, নন্দলাল বসু এবং রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখের কাজ। কাজেই রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মগুলো নেহাতই ‘শেষ বয়সের ছেলেমানুষি’ এই ধারণা খুব ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও মোটের উপর সঠিক নয় বলেই মনে হয়। বাংলা চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান আধুনিক ও স্বতন্ত্র এক ধারা উন্মোচন করেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রায় ষাট বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছাড়াই তিনি নিজের মনের গভীরে থাকা অবচেতন জগৎ, ছন্দ ও রেখার টানে ফুটিয়ে তোলেন কালজয়ী ও আধুনিক সব চিত্রকর্ম। অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করে পরাবাস্তব ও অভিব্যক্তিভিত্তিক চিত্রশিল্পের চর্চা করে তিনি ভারতীয় আধুনিক শিল্পের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিলেন।
প্যারিসসহ বিদেশের মাটিতে তাঁর আঁকা ছবি প্রদর্শিত ও সমাদৃত হয়, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলার শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী ও কলাভবন প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা এবং নন্দলাল বসুর মতো শিল্পীকে দায়িত্ব প্রদান বাংলা তথা ভারতের শিল্পশিক্ষাকে সুদৃঢ় ভিত্তি দেয়।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন