‘এমপিকে ঘিরে লুটের সিন্ডিকেট’

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৩

দিরাই বিএনপির দুই গ্রুপ মারমুখী অবস্থান নিয়েছে। বৃহস্পতিবার একপক্ষের সমাবেশে এমপি কঠোর বক্তব্য দিলেও, শনিবার আরেকপক্ষ সমাবেশ করে তাদের জবাব দিয়েছে।
শনিবারের সমাবেশের আগে শুক্রবার রাতে এবং শনিবার সকালে থানা পয়েন্টে মিছিল করে স্থানীয় বিএনপিতে নাছির উদ্দীন চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেনের সমর্থকরা। ওই দুই মিছিলের পর দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে লিখিতভাবে জানান, সমাবেশ ও পাল্টা শোডাউন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থানা পয়েন্টসহ আশপাশ এলাকায় সকালে ১৪৪ ধারা জারি করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সকাল দশটায় আমির হোসেনের সমর্থকরা মিছিল ও পথসভার সমাপ্তি টানেন। এসময় ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করেন ইউএনও। পরে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হয় অপরপক্ষের। ওইপক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাছির উদ্দীন চৌধুরীর সৎ ভাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক।

 

 

 

 


জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দুই গ্রুপের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধে উত্তপ্ত হয়ে উঠে দিরই উপজেলা সদর। 
শনিবারের সমাবেশে বক্তারা, দলের স্থানীয় সংসদ সদস্যকে (এমপি) ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে এবং তাঁকে 'আয়নাঘরে বন্দি' করে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। 


দিরাইয়ের বাগানবাড়ী কমিিউনিটি সেন্টারে দিরাই উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি এবং অঙ্গ—সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে এই গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। 
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। 

 


সমাবেশে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈনুদ্দিন চৌধুরী মাসুকের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরীর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাইয়ুম, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান, যুগ্ম আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রতি রঞ্জন দাস, জেলা বিএনপির সদস্য অশোক রায়, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল করিম চৌধুরী, সদস্য শোয়েব হাসান, অ্যাডভোকেট ওবায়দুর চৌধুরী মিশু, সুমন মিয়া, জাকারিয়া আহমেদ, সাবেক ছাত্রনেতা আবুল হাসনাত রিপন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন মিলাদ, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েল তালুকদার, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু হাসান চৌধুরী সাজু সহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

 

 

 

 


সভাপতির বক্তব্যে দিরাই উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে দিরাই—শাল্লা বিএনপি তিনভাগে বিভক্ত ছিল—তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমী এবং নাছির উদ্দিন চৌধুরী এই তিন নেতার আলাদা বলয় ছিল। তাঁরা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর সবাই নাছির চৌধুরীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন এবং দিরাই—শাল্লার মানুষ নিজেদের অর্থ ব্যয় করে তাঁকে বিজয়ী করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার জন্য এলাকাবাসীকে যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানানো হয় নি, বরং এমপিকে ঘিরে একটি বলয় প্রকল্প বণ্টন ও প্রকল্প কমিটি দখল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

 


তিনি নাছির উদ্দিন চৌধুরী স্ত্রী পারভিন আক্তারকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমি বৃহস্পতিবারের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে শুনেছি, ‘বলা হচ্ছে এমপি সাহেবকে নাকি আয়নাঘর থেকে মুক্ত করা হয়েছে। আমি বলতে চাই, আয়না ঘর থেকে মুক্তি করা হয়নি বরং এখন এমপি সাহেবকে আয়নাঘরে বন্দি করা হয়েছে। তিনি (এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী) ৪০ বছর ধরে দিরাই—শাল্লায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং সবসময় অন্যায়—দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। সারা জীবন যিনি চোরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেন, তিনি—ই এখন ডাকাত পালছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্পের নামে ইতিমধ্যে কয়েক কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এসব দুর্নীতির সঠিক তথ্য প্রশাসনের কাছ থেকে না পেয়ে তথ্য অধিকার আইনে দরখাস্ত করা হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পের তালিকা পর্যালোচনা করে দুর্নীতির বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

 


মাসুক অভিযোগ করেন, সমাবেশ বানচাল করতে অন্যপক্ষ তাঁর ও অন্যান্য নেতার নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে সমাবেশ স্থগিতের গুজব ছড়ায়, রাতে মিছিল বের করে এবং ১৪৪ ধারা জারির চেষ্টা চালায়। তিনি এমপি’র চারপাশের সিন্ডিকেটকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে বিএনপির রাজনীতি করেন না।
৫ আগস্টের আগে—পরের প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, জনতার ঢল সামাল দেওয়া কঠিন। কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের প্রভাবে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 


মাসুক বলেন, উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির নেতৃবৃন্দ রেজুলেশনের মাধ্যমে পৌরসভা ও উপজেলা আহ্বায়কের অপসারণের দাবিতে জেলা বিএনপির কাছে চিঠি ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ জমা দিয়েছেন।


দিরাই পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কোথাও কোনো ব্যক্তির নামে বিএনপির কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নি। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা নির্বাচনে তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ থেকে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।

 


সমাবেশে বক্তারা স্থানীয় এমপির গত ছয় তারিখের একটি বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান, যেখানে তিনি বলেছিলেন আওয়ামীলীগ ও বিএনপি অচিরেই একাকার হয়ে যাবে। বক্তারা বলেন, এই বক্তব্য এমপির নিজস্ব নয় বরং তাঁর পাশের সিন্ডিকেটের সাজানো এবং এটি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রতি অবমাননাকর।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জিত সরকার বললেন, শনিবার একপক্ষ বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টারে সমাবেশ ডাকে। আরেকপক্ষ পাশের থানা পয়েন্টে মিছিল করতে থাকলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পৌর শহরে আইন—শৃঙ্খলা অবনতি ঘটতে পারে। একপর্যায়ে থানা পয়েন্ট ও বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি হয়। কিন্তু সকাল দশটার পর একপক্ষ কর্মসূচী সমাপ্তি ঘোষণা করলে ১৪৪ ধারা তুলে নেওয়া হয়। অপরপক্ষ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে।

 


দিরাই বিএনপির এমন মারমুখী অবস্থান প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য অ্যাড. আব্দুল হক বললেন, গেল পাঁচ আগস্ট জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ককে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, চিঠিতে নির্দেশনা ছিল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য স্থানীয় এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র সঙ্গে সমন্বয় করে দুইপক্ষ একমঞ্চে সমাবেশ করার জন্য। এটি কেন হলো না, কার কারণে হলো না এই বিষয়টি দলের সাংগঠনিক কমিটি যাচাই করে দেখবে।

 


প্রসঙ্গত. গেল প্রায় এক মাস হয় দিরাই বিএনপি দ্বিধাবিভক্ত। দিরাই শাল্লায় বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী। নাছির উদ্দিন চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ভাটি অঞ্চলের ডাকসাইটে এই রাজনীতিক গেল জাতীয় নির্বাচনের আগে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এরপরও নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয় ওই নেতাকেই দল মনোনয়ন দেয়। বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী’র ছায়া কে পাবেন— এই নিয়েই স্থানীয়ভাবে দ্বন্দ্ব শুরু হয় মাসখানেক আগে থেকেই। দ্বন্দ্বে যুক্ত দুইপক্ষের একপক্ষে আছেন নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ভাই (সৎ ভাই) মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। তিনি উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত)। এমপি অসুস্থ্য থাকায় স্থানীয়ভাবে প্রচার আছে আরেকপক্ষ এমপি’র স্ত্রী পারভিন আক্তারের পরামর্শ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিএনপির স্থানীয় একাধিক কর্মী বলেছেন, ‘এখানে এমপির ছায়া স্ত্রী না ভাই পাবেন, এ নিয়ে লড়াই চলছে।’ 

 


গেল প্রায় এক মাস হয় পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, যৌথসভা, অব্যাহতির সুপারিশ এবং পৃথক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দুইপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ পায়। বৃহস্পতিবার জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার সমাবেশ করেছে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন গ্রুপ। শনিবার একই ইস্যুতে আলাদা সমাবেশ করেছে প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বাধীন অংশ।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার