প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০৭
মিয়ারচর খেয়াঘাট
তাহিরপুর উপজেলার মিয়ারচর খেয়াঘাটে টোল আদায়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে একই ঘাটের এপার—ওপারে দুইদফায় ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এই পরিস্থিতি চললেও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং দু'পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সোমবার দুপুরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির প্রতিবাদে বাদাঘাট বাজারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতি, সাধারণ জনগণ ও শ্রমিকদের উদ্যোগে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বণিক সমিতির সভাপতি নজরুল সিকদার, সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশিদ, কোষাধ্যক্ষ মাওলানা মোখলেসুর রহমান, বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, আমির শাহ, আজিজুর ইসলাম, হেলু মিয়া, ব্যবসায়ী সারোয়ার হোসেন, জুবায়ের আহমদ, সাজ্জাদ হোসেন প্রমুখ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিয়ারচর খেয়াঘাটের পশ্চিম পাড়ে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অনুমোদিত ইজারাদার ওয়াহেদ মিয়ার লোকজন টোল আদায় করছেন। অপরদিকে নদীর পূর্বপাড়ে শ্রী শ্রী মদন মোহন জিউ দেবোত্তর এস্টেটের দাবি করা কালী চরণ দত্ত চৌধুরী ভজনের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া জেলা ছাত্রদল নেতা নাইম আহমেদ শিশিরের লোকজনও একই ঘাটে টোল আদায় করছেন।
জানা যায়, মিয়ারচর খেয়াঘাট জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি সম্পত্তি। এ বিষয়ে জেলা জজ আদালতের আপিল মামলা নং—২৭/২০২৪—এর রায়ে দাবিকৃত ভূমিকে দেবোত্তর সম্পত্তি নয়, বরং বাংলাদেশ সরকারের সম্পত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিশন মামলা নং—২৭৪০/২০২৪ দায়ের করা হলে হাইকোর্ট বিভাগ স্থিতাবস্থার (Status Quo) আদেশ দেন। পরবর্তীতে ওই আদেশের মেয়াদ সময় বর্ধিত করা হয়।
সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫—২৬ অর্থবছরে ওয়াহেদ মিয়া ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে খেয়াঘাটের টোল আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন। চলতি ২০২৬—২৭ অর্থবছরেও জেলা পরিষদের মাসিক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত ৪২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে পুনরায় টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেবোত্তর এস্টেটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট খেয়াঘাট তাদের সম্পত্তির অংশ। তারা বৈধভাবে লিজ দিয়েছে এবং সেই লিজের ভিত্তিতেই তাদের প্রতিনিধি নাইম আহমেদ শিশির টোল আদায় করছেন।
খেয়াঘাটের যাত্রী আমির হোসেন বলেন, ‘খেয়াঘাটের মালিকানা যে পক্ষেরই হোক, দুই পক্ষ একসঙ্গে টোল আদায় করায় আমাদের দ্বিগুণ টাকা দিতে হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জেলা ছাত্রদল নেতা নাইম আহমেদ শিশির বলেন, আমি দেবোত্তর এস্টেটের মালিক কালী চরণ ভজনের কাছ থেকে এই ঘাট ইজারা নিয়ে ভাড়া আদায় করেছি। জেলা পরিষদ থেকে ইজারা নেওয়ার দাবি করা অপরপক্ষ অবৈধ। এই ঘাট নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বারবার বসার অনুরোধ করলেও তারা বসছেন না।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তাঁরা মিয়া আমাকে ও প্রতিপক্ষকে বলেছেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই যেন ঘাটে ভাড়া আদায় না করি। আপাতত যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়া তৃতীয় পক্ষের একজনের কাছে জমা থাকবে এবং ঘাটের প্রকৃত মালিক নির্ধারিত হলে ওই টাকা তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এতে আমি সম্মতি জানিয়েছি।
ইজারাদার মো. ওয়াহেদ মিয়া বলেন, জেলা পরিষদ থেকে আমি ঘাটটি ইজারা নিয়েছি। শুধু এ বছর নয়, গত দুই যুগ ধরে জেলা পরিষদ থেকে আমাকে এই ঘাট ইজারা দেওয়া হচ্ছে। ইদানীং হঠাৎ করে ছাত্রদল নেতা শিশির দেবোত্তর এস্টেটের মালিকানা দাবি করে নৌকা পারাপারে বাধা সৃষ্টি করছেন এবং যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন।
তিনি বলেন, সোমবার সাবেক চেয়ারম্যান তাঁরা মিয়া যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাতে আমরাও একমত হয়েছি।
দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তারা মিয়া বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘাট নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলা চলছে। এক পক্ষ এপারে টাকা তোলে, আরেক পক্ষ ওপারে টাকা তোলে। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সোমবার বাদাঘাট বাজারে মানববন্ধনের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। তিনি আরও বলেন, ‘পরে দুই পক্ষকে ডেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘাটে ভাড়া আদায় না করতে নিষেধ করেছি। যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে খেয়া নৌকা চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন যে ভাড়া আদায় হবে, শেষ পর্যন্ত যারা বৈধভাবে ঘাটের মালিক হবেন, তাদের কাছে সেই টাকা তুলে দেওয়া হবে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান মানিক বলেন, মিয়ারচর খেয়াঘাটটি জেলা পরিষদের অধীনে। এরপরও এ ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন