প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ০০:১৭
এসএসসি পরীক্ষায় সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর ১১৮৮ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রীতম বনিক। বাবাকে হারানোর পর মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা ও নিজের নিয়মিত পড়াশোনার মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জন করেছে সে।
প্রীতম বনিকের বাবা পলাশ কুমার বনিক মারা যাওয়ার পর তার মা বেবিরানী বনিক একাই ছেলের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নেন। স্বামীকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ছেলেকে ভেঙে পড়তে দেননি তিনি। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রীতমকে সাহস, সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
নিজের অনুভূতি জানিয়ে প্রীতম বনিক বলেন, আজকের ফলাফলে আমি খুবই আনন্দিত। আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই ফলাফল শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমাকে কখনো ভেঙে পড়তে দেননি। তিনি বাবার অভাব পূরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। পড়াশোনার সময় আমার পাশে বসে থাকতেন।
প্রীতম বলেন, মায়ের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা। আমার পড়াশোনার জন্য মা অনেক শ্রম দিয়েছেন এবং সর্বক্ষেত্রে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী, পাড়া—প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও সবসময় সহযোগিতা করেছেন।
সুনামগঞ্জ জেলায় প্রথম হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রীতম বলেন, ভালো ফলাফল হবে—এমন আত্মবিশ্বাস ছিল। কিন্তু জেলার মধ্যে প্রথম হব, সেটা সম্পূর্ণভাবে ভাবতে পারি নি। প্রথম হওয়ার পরের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। আমার শিক্ষক, মা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া—প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের গর্বিত করতে পেরেছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে প্রীতম বলেন, আজ হয়তো আমার জুবিলিয়ান হিসেবে শেষ দিন। আগামীতে আমি প্রাক্তন জুবিলিয়ান হয়ে যাব। কিন্তু জুবিলীর এই স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে। শিক্ষকদের ভালোবাসা, আদর—শাসন এবং সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় ও গুরুত্বপূর্ণ সময় কখনো ভুলব না। এই স্কুল থেকেই আমি এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছি। এই স্মৃতি সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে।
পড়াশোনার কৌশল সম্পর্কে প্রীতম বলেন, আমি সবসময় টেক্সটবুকভিত্তিক পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি। স্কুলের ক্লাসগুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করেছি এবং প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছি। প্রশ্ন যত কঠিনই হোক কিংবা খাতা দেখার পদ্ধতি যত কঠিনই হোক, ভালোভাবে পড়াশোনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সে জানায়, এসএসসি শেষে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।
জেলার অন্যান্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রীতম বলেন, যারা আমার মতো ভালো ফলাফল করতে চায়, তাদের প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে আয়ত্ত করার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত ও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আমি আশা করি, ভালোভাবে পড়াশোনা করলে সবাই তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারবে।
সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম আজাদ মিয়া জানালেন, এ বছর বিদ্যালয় থেকে ২৩৬ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১৯৯ জন পাস করেছে। পাসের হার ৮৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। জিপিএ—৫ পেয়েছে ৬২ জন শিক্ষার্থী।
তিনি বলেন, আমরা জানতাম, এবারের ব্যাচটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। টেস্ট পরীক্ষার আগে ও পরে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য বিশেষভাবে পরিচর্যা করা হয়েছে। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে তাদের সহযোগিতা করেছেন।
তবে ফলাফলে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন তিনি। বললেন, আমরা চেয়েছিলাম শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করুক এবং জিপিএ—৫—এর সংখ্যা আরও বেশি হোক। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষক সংকট। বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্যাটার্ন ৫৩ জনের হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩২ জন। ২১ জন শিক্ষক কম আছেন।
প্রীতম বনিকের সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে এ কে এম আজাদ মিয়া বলেন, প্রীতম খুবই মেধাবী ও বিনয়ী ছেলে। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে সে শিক্ষকদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করত—স্যার, এটা কীভাবে করব, একটু বুঝিয়ে দেন। শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে তাকে সহযোগিতা করেছেন। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।
আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্যও ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, শিক্ষক সংকট থাকার পরও আমরা ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য কাজ করছি। অভ্যন্তরীণ ক্লাসের সময়ের বাইরে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিভাবক সভার আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জুবিলীর ইতিহাসে এবারই প্রথম তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সভা করা হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—এই তিন পক্ষের সমন্বয় ছাড়া ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। তাই অভিভাবকদেরও সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি আরও সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিভাবক সভায় বিভিন্ন শ্রেণিতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অভিভাবক অংশ নিয়েছেন। আগামীতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসসহ আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, আমরা কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে চাই। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও আমাদের শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। আশা করছি, আগামীতে বিদ্যালয়ের ফলাফল আরও ভালো হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন