প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:১৮
সুনামগঞ্জের ছাতকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০টি কাঠজ্বালিত পাজু বা চুন তৈরির চুল্লি। এসব পাজুতে প্রতি মাসে পুড়ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ। এতে একদিকে জ্বালানি কাঠের সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে বনাঞ্চল ও পরিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ। পাজুগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকিও।
সুরমা নদীর দুই তীর, ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের দুই পাশ, বৌলা, তাতিকোনা এলাকাসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক মাসে এসব পাজু গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে দিন দিন বাড়ছে এর সংখ্যা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় চুনাপাথর ও চুনশিল্পের জন্য পরিচিত ছিল ছাতক। পরিবেশগত কারণে খড় ও ছন দিয়ে চুনাপাথর পোড়ানোর প্রচলিত পদ্ধতি বন্ধ হওয়ার পর এই ব্যবসা অনেকটা নারায়ণগঞ্জকেন্দ্রিক হয়ে যায়। সেখানে গ্যাসের মাধ্যমে চুনাপাথর পোড়ানো হলেও সম্প্রতি গ্যাসসংকট ও পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে চুনের দাম বেড়ে যায়। সেই সুযোগে কয়েক মাস ধরে ছাতকের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে কাঠজ্বালিত পাজু গড়ে উঠতে শুরু করে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, প্রতিটি পাজুতে মাসে দুই দফা চুনাপাথর পোড়ানো হয়। একটি পাজুতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাত টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ২০০টি পাজুতে মাসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ কাঠের চাহিদার কারণে ছাতকে জ্বালানি কাঠের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে ১২০ টাকার কাঠ এখন ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা মেটাতে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি কাঠবাহী ট্রাক ও পিকআপ ছাতকে প্রবেশ করছে। এতে বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটার আশঙ্কাও বাড়ছে।
পাজুগুলোতে চুনাপাথর পোড়ানোর সময় ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়। বাতাসে মিশছে চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধ। আবাসিক এলাকার পাশাপাশি নদীর তীর ও সড়কের পাশে এসব চুল্লি স্থাপন করায় পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে পাজুতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই প্রায় ছয় মাস ধরে এসব পাজুতে কার্যক্রম চলছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকরভাবে বন্ধ করা হচ্ছে না। তাঁরা দ্রুত এসব অবৈধ পাজু বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান বলেন, ‘ছাতকে শিল্পকারখানা থাকায় আগে থেকেই এ উপজেলায় পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। গত কয়েক মাসে এটি আরো বেড়েছে।’
তবে পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এটি ছাতকের প্রাচীন ব্যবসা। এই ব্যবসার সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত। হঠাৎ করে এটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়বেন। পরিবেশের ছাড়পত্র দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্ব আদায় করা হলে সরকার ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই লাভবান হবে।’ একই ধরণের মন্তব্য করেন সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম
ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদুস বলেন, ‘আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। মাত্র দুজন লোক দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনাক্রমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। আমরা তাদের নোটিশ দিয়েছি এবং জরিমানাও করেছি। জ্বালানি কাঠ সরবরাহ বন্ধ করার জন্য বন বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও কথা বলেছি। তাঁদের নিয়ে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তাই আমরা ছাড়পত্র দিই নি। এগুলো বন্ধ করার জন্য আমরা কাজ করছি।’
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.মহি উদ্দিন বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর ও পাজুর মালিকদের নিয়ে শিগগিরই বসা হবে। অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এগুলো চলছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন