প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩৫
একসময় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অবকাঠামো হিসেবে পরিচিত ছাতক—ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে (রজ্জুপথ)। সীমান্তবর্তী ভোলাগঞ্জ থেকে পাথর পরিবহনের জন্য নির্মিত এই রোপওয়ে ছিল বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং দেশের শিল্প ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বন্ধ থাকার সুযোগে অবহেলা, লুটপাট, যন্ত্রাংশ চুরি ও নিরাপত্তাহীনতায় আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে পুরো প্রকল্পটি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে দখল ও বেহাতের ঝুঁকিতে রয়েছে রেলওয়ের এক হাজার একরেরও বেশি জমি।
সরেজমিনে ভোলাগঞ্জ রোপওয়ের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থাপনাই এখন পরিত্যক্ত। কোথাও ট্রেসেল হেলে পড়েছে, কোথাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। রোপওয়ের প্রধান তার বিভিন্ন স্থানে ছিঁড়ে গেছে। শত শত বাকেট মাটিতে পড়ে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। প্রথম সেকশনের লোডিং স্টেশন, কন্ট্রোল রুম ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বহু বছর ধরে অচল। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় অধিকাংশ যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে নির্মিত ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রোপওয়েটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুনর্বাসনের মাধ্যমে ১৯৮০ সালে পুনরায় চালু করা হয়। ১২০টি ট্রেসেল, চারটি স্টেশন এবং ৪২৫ টি বাকেটের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ১২ লাখ ঘনফুট পাথর পরিবহনের সক্ষমতা ছিল এই রজ্জুপথের। কিন্তু সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পাথর পরিবহনের পর থেকে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালুর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে ও পাথর কোয়ারি এলাকায় মোট ১ হাজার ২৭ দশমিক ৩৩ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৯ দশমিক ৮৭ একর অধিগ্রহণকৃত জমি এবং ৬৬৭ দশমিক ৪৬ একর রেলওয়ের অনুকূলে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তাবিত খাস জমি। দীর্ঘদিন তদারকির অভাবে এসব জমির একটি অংশ দখলের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সরকারি সম্পদের বড় অংশ বেহাত হয়ে যেতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত কয়েক বছরে রোপওয়ের বিভিন্ন অংশ থেকে মূল্যবান যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লোহার মালামাল ও বাকেট চুরির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসব চুরি চললেও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় চুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভোলাগঞ্জ রেলওয়ে বাঙ্কার এলাকায় ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গিয়ে রেজিস্টারভুক্ত বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও মালামাল খুঁজে পাননি। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে হারিয়ে যাওয়া সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং কতটুকু উদ্ধার হয়েছে—সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
লুটপাটের ঘটনার পর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা এলাকা ত্যাগ করেন। বর্তমানে সেখানে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন না। ফলে পুরো প্রকল্পটি কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি সম্পদ রক্ষায় কোনো দৃশ্যমান নজরদারি না থাকায় অবশিষ্ট যন্ত্রপাতিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাকারিয়া আহমদ বলেন, একসময় সারাক্ষণ বাকেট চলাচলের শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। এখন চারদিকে শুধু নীরবতা আর ধ্বংসের চিত্র। একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে শুধু একটি পাথর পরিবহন ব্যবস্থা নয় এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও রেলওয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যথাযথ সংরক্ষণ, পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এটিকে শিল্প ঐতিহ্য কিংবা পর্যটন সম্ভাবনার অংশ হিসেবেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
এ বিষয়ে রেলপথের নির্বাহী প্রকৌশলী (ছাতক) আহসান হাবিব বলেন, ২০১২ সালের শেষের দিকে রোপওয়ের কয়েকটি ট্রেসেল ভেঙে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সময় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ের বিভিন্ন মালামাল লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রোপওয়েটি পুনরায় চালুর বিষয়ে আপাতত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নেই।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন