নিজ বাসায় নৃশংস খুন

প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৯

গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাবুল মিয়া। সিসি ক্যামেরায় তাকে এভাবেই শনাক্ত করা হয়। -ছবি. সুখবর

সিলেটে লোডশেডিংয়ের সুযোগে বাসা ও মহল্লা সিসি (ক্লোজ সার্কিট) ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত আবাসিক এলাকায় নৃশংস খুনের ঘটনার রহস্য ৫ ঘন্টার মাথায় উন্মোচন করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)।  

 


বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছিল। এই সুযোগে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। বাসায় ঢুকে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের বাসায় গৃহকর্মী তাহমিনাকে (১৫) গলা কেটে হত্যা করা হয়। লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনাটি বেছে নেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছিল, ওই বাসার প্রতি নজর রাখা দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। 

 


তবে এ ঘটনার সাত ঘন্টার মাথায় খুনিকে আরেক সিসি ক্যামেরায় শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি)। গ্রেপ্তারকৃত যুবকের নাম বাবুল মিয়া (২৯)। ঘটনার কারণও উদঘাটন হয়েছে। পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, কাজের মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থেকে তিক্ততায় খুনি প্রথমে কাজের মেয়ে, পরে সাত্তারের স্ত্রী ও সাত্তারকে হত্যা করে।  খুনে ব্যবহৃত ছোরাও গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

 


বাবুলের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে এসএমপি কমিশনার জানান, বাবুল মিয়া পেশায় রংমিস্ত্রি হলেও তিনি কসাইয়ের কাজ করতেন। ৯টা ২০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে বাবুল বাসায় যায়। কাজের মেয়ে বাসার দরজা খুলে দিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে দেন। কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে হাতে রাখা ছোরা দিয়ে গলায় আঘাত করে। পরে সাত্তারের স্ত্রী ও সাত্তারকে হত্যা করেন বাবুল। বাসা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক থাকেন বাবুল। হাতের ছোরাটি মহল্লার একটি ঝোপে ফেলে এলাকায় অবস্থান করেন। বিকেল পাঁচটার দিকে বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 


স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নিহত আব্দুস সাত্তার দম্পতি রায়নগরের মিতালি আবাসিক এলাকার প্রথম বাসিন্দা। তাদের মূল বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার। প্রায় ৫০ বছর ধরে নিজ বাসায় তিনি বসবাস করছেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তৃণমূলে আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ সংগঠক হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তিনি ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য পদে থাকা সাত্তার সাবেক পরিচালক ছিলেন। এ দম্পাতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা  সপরিবারে লন্ডন ও আমেরিকায় থাকেন। সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া আমেরিকার পাসপোর্টধারী ছিলেন। 

 


মহল্লার বাসিন্দারা বলছেন, মিতালি আবাসিক এলাকা পুরোটা ১২০টি সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত। ১১১নম্বর বাসায়ও ছিল নিজস্ব সিসি ক্যামেরা। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকায় মহল্লার ও বাসার সিসি ক্যামেরায় কিছুই ধরা পড়েনি।

 


লোডশেডিংয়ের সুযোগে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে ধারণা করে প্রাথমিক তদন্তে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি সূত্র বলছে, এলাকায় লোডশেডিংয়ের প্রতি নজর রাখা দুর্বৃত্তরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ বিষয়টিকে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহল্লার সিকিউরিটি গার্ডের বিল উত্তোলনকারীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
সাত্তার—সুরাইয়ার সঙ্গে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার বাড়ি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার। তার পরিবার নগরীর জল্লারপারে বসবাস করে। পরিবার জানায়, মাত্র দেড় মাস আগে তাহমিনাকে ওই বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। বিকেলে তিনজনের মরদেহ বাসা থেকে উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

 


এর আগে ট্রিপল মার্ডারের স্পট পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) নবনিযুক্ত কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি তাৎক্ষণিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বাসার ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা আছে। স্বর্ণসহ দামি জিনিস খোয়া গেছে বলে জেনেছি। চুরি—ডাকাতির ঘটনা কি না, তা—ও তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অন্য কোনো কারণে হত্যা করা হয়েছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পারিবারিক বিরোধ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছি।’

 


পাঁচ ঘন্টার মাথায় খুনি গ্রেপ্তার করে খুনের রহস্য উদঘাটন হওয়ায় এলাকাবাসী স্বস্তি প্রকাশ করেন। মিতালি আবাসিক এলাকা মহল্লা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা কাল প্রতিবাদ কর্মসূচি ডেকেছিলাম। এসএমপির কর্মতৎপরতায় স্বস্তিতে সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছি। নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার ও ঘটনার রহস্য উদঘাটনকারী পুলিশ দলকে আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

 


যেভাবে খুনি শনাক্ত
ঘটনার সময় লোডশেডিং থাকায় বাসার ও মহল্লার সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। তবে মহল্লায় বিচারণ করা একটি একটি সিসি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়। তাতে দেখা যায়, ওই বাসার রং মিস্ত্রি বাবুল মিয়া হেঁটে যাচ্ছেন। মাত্র ১০ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ফুটেজে বাবুল মিয়াকে হাতে রক্ত দেখা যায়। তা দেখে প্রাথমিক সন্দেহ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাবুলকে সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। 

 


সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শিপলু চৌধুরী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল স্বীকার করেন হত্যার ঘটনাটি। এরপর পুলিশের একাধিক দল তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে সত্যতা পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি জানান, বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রি হলেও কসাইয়ের কাজও করতেন। মিতালি আবাসিক এলাকার রায়নগর—রাজবাড়ির একটি কলোনিতে বসবাস করতেন। সঙ্গে তার ছুরি থাকতো। ওই বাসায় কাজের মেয়েকে পছন্দ করতেন। হত্যার পর বাবুল এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার