এখনও গোলায় বন্দি

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৫৭

হাওরপাড়ের কৃষকের ঘামঝরানো সোনার ফসল ধান এখন গোলায় বন্দি। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন হাওরাঞ্চলের কৃষাণ—কৃষাণীরা। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে যাদের বাৎসরিক সাংসারিক বাজেট নির্ধারণ হয়, তারা আজ নির্বাক। ছেলে—মেয়ের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা—মায়ের চিকিৎসা, দৈনন্দিন খরচ থেকে শুরু করে যুবক—যুবতীদের বিয়ে—শাদি—সবই আজ যেন ধানের মতো গোলায় আটকে আছে। বাজারে ক্রেতা না থাকায় এবং আড়তদাররা ধান না কেনায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।

 


ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক এবাদুল ইসলাম জানান, এলাকায় এখন ধানের কোনো ক্রেতা নেই। আগে কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেপারিরা এসে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কিনতেন। এবার সেই চিত্র পুরো ভিন্ন। বাধ্য হয়ে কৃষকরা প্রতি মণ ধান মাত্র ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা গত বছর এ সময়ে ছিল ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা।

 


অথচ হাওরের ফসল রক্ষায় সরকার প্রতি বছর শতকোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু সেই কষ্টার্জিত ফসল যখন পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে, তখন তা তদারকিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

 


একই গ্রামের কৃষক লগুছ মিয়া জানান, সরকারি খাদ্য গুদামে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করায় প্রকৃত কৃষকরা সুযোগ পাননি। তার দাবি, লটারিতে নাম ওঠা ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ ভাগই সরাসরি কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত নন।


তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হুদা বলেন, বর্তমানে হাওরপাড়ের কৃষকদের চরম দুর্দিন চলছে। এক ফসলি ধানের ওপর নির্ভর করে যাদের সংসার চলে, তারা একেবারেই বেকায়দায়। এ বছর টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা সঠিকভাবে ধান শুকাতে পারেননি। অনেক ধানে চারা গজিয়ে যাওয়ায় বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে।

 


কৃষি খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা। শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের দুমাল গ্রামের কৃষক ফারুক মিয়া (৬০) বলেন, আমার জীবনে প্রথম দেখলাম হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে ধান কেনার মতো কোনো বেপারি নেই। ৩০ শতক (এক কিয়ার) জমিতে রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন মেলে ১২ থেকে ১৫ মণ। ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই ওঠে না। সরকার নজর না দিলে কৃষকরা চাষাবাদে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।

 


ধানের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় এর সামাজিক প্রভাবও পড়ছে গ্রামগুলোতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক জানান, ধান বিক্রি করে ছেলের বিয়ের খরচ জোগানোর কথা ছিল। কিন্তু পাইকাররা মণপ্রতি মাত্র ৮০০ টাকা দাম বলায় তিনি ধান বিক্রি করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে আপাতত ছেলের বিয়ে স্থগিত রেখেছেন। শনির হাওরপাড়ের মারালা গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মিয়া হোসেন বলেন, এখানকার মানুষ আদিকাল থেকেই বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। সংসার চালানো থেকে শুরু করে সামাজিক অনুষ্ঠান—সবই ধান বিক্রির টাকার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে ক্রেতা সংকট ও কম দামের কারণে সাধারণ কৃষকরা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।
খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ বন্ধের বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা অবিনাশ দাস জানান, এ বছর উপজেলায় ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১,৫৯৪ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ১,৫২১ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় আপাতত ধান সংগ্রহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট ৭৩ মেট্রিক টন ধান কেনা সম্ভব হয়নি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার