বাস টার্মিনালে নেই যাত্রীসেবার বালাই

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪৫

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গেল বছরের পহেলা সেপ্টেম্বর ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে উদ্বোধন করা হয়েছিল সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। সুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল শহরের প্রধান সড়ক থেকে বাস সরিয়ে নেওয়া হবে, কমবে যানজট, বাড়বে যাত্রীসেবার মান এবং নিরাপদ হবে গণপরিবহন ব্যবস্থা।

 


কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হয়নি। টার্মিনালে এখনো পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। নেই যাত্রীদের জন্য শৌচাগারের সুযোগ—সুবিধা। রাত নামলেই টার্মিনাল এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। এতে একদিকে যেমন বাস ও পরিবহনের মালামাল চুরির আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রীদেরও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে।


এরই মধ্যে চলতি বছরের ১৮ জুন টার্মিনালের একাংশে ৪২ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা চুক্তিমূল্যে নির্মাণ করা হয়েছে আরসিসি পাকা সড়ক। নতুন পাকা সড়ক নির্মাণে টার্মিনালের চলাচলের পরিবেশ উন্নত হলেও পুরো টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন হয় নি।

 

 

 

 

 

 

 


দিনের বেলায় টার্মিনালে বাসের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যার পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় টার্মিনালের বিভিন্ন অংশ অন্ধকারে পড়ে থাকে। এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে বাস থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন চালক ও শ্রমিকরা।

 


বাসচালক এরশাদ মিয়া বলেন, আমরা শ্রমিকরা সারাদিন পরিশ্রম করে এখানে বাস রেখে যাই। কিন্তুটার্মিনালে কোনো লাইট নেই। যার কারণে চুরি—চামারি বেশি হয়। কয়েক দিন পরপর কোনো গাড়ি থেকে ব্যাটারি নাই হয়ে যায়, কোনো গাড়ি থেকে তার চুরি হয়ে যায়। এছাড়া গাড়িতে উঠে ব্রাশ, বালতি, এমনকি চাকা পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে যায়। এজন্য টার্মিনালে লাইট দেওয়া জরুরি।
সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কের বাসচালক সুভাস দেব বলেন, টার্মিনাল থেকে বাসের ব্যাটারি এবং ব্যাটারির তার চুরি হয়ে যায়। এগুলো পাহারা দেওয়ার জন্য স্টাফকে রাতে বাসে ঘুমাতে হয়, অনেক সময় স্টাফরা তাতে রাজি হয় না। 

 


তিনি বলেন, বাস মালিকেরা এখান থেকে ভালো আয় করছেন। তাদের প্রতি অনুরোধ, টার্মিনালে একজন পাহারাদারের ব্যবস্থা করা হলে চালক ও শ্রমিকরা নিরাপদে গাড়ি রেখে বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে পারবেন।
বাস টার্মিনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোর একটি হচ্ছে যাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার। কিন্তু সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এখনো যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 


বাসচালক লোকমান হোসেন বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলা সিলেটের টার্মিনালটি খুবই সুযোগ—সুবিধা সম্পন্ন। কিন্তুএই টার্মিনালের ইটসলিং হওয়ার পর আর কোনো কিছু করা হয় নি। কোনো লাইট নেই, শৌচাগার নেই। যাত্রীরা অনেক দুর্ভোগে পড়েন। তার দাবি, জেলা পরিষদ দ্রুত প্রয়োজনীয় সুযোগ—সুবিধা নিশ্চিত করলে পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা উপকৃত হবেন।
শহরের যানজট কমানো এবং সড়কে বাসের চাপ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নির্মাণ। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, টার্মিনাল থাকার পরও শহরের প্রধান সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে।

 


একারণে ব্যস্ত সময়ে প্রধান সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সড়কের ওপর বাস দাঁড়িয়ে থাকায় ছোট—বড় যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

 


সুনামগঞ্জ জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহ—সভাপতি অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান বলেন, টার্মিনালটি একসময় পৌরসভার অধীনে ছিল। পরবর্তীতে উন্নয়নের আশায় এটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ কম হয়েছে। জেলা শহরে এমন একটি সেবাবঞ্চিত বাস টার্মিনাল আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এখানে বাস মালিক—শ্রমিকদের জন্য যেমন পর্যাপ্ত সুযোগ—সুবিধা নেই, তেমনি যাত্রীদের জন্যও প্রয়োজনীয় কোনো সেবা নেই। টুকটাক উন্নয়নের কাজ হয়েছিল, এটিও মুলত লুটপাটের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো। আমরা প্রত্যাশা করি, দ্রুত এই টার্মিনালটি আধুনিকায়ন করে একটি যুগোপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।

 


বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জুয়েল মিয়া বলেন, বাস টার্মিনালটি আধুনিকায়নের জন্য সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী উদ্যোগ গ্রহণের চিন্তা করছেন। এই লক্ষ্যে একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে, সুনামগঞ্জবাসী উপকৃত হবেন। তিনি আরও বলেন, বাস টার্মিনালে প্রায়ই ছোটখাটো চুরির ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে একজন পাহারাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাতে টার্মিনালে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় একজন পাহারাদারের পক্ষে একা দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই টার্মিনালে দ্রুত পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি যেহেতু আন্তজেলার বাসগুলো এখান থেকে ছেড়ে যায় তাই এর নিরাপত্তা ও টহলের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।

 


সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, সুনামগঞ্জের বাস টার্মিনালটা ভালো নয়। আমি জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে গিয়েছি। দেখেছি সেখানে অনেক সমস্যা আছে। যাত্রীদের জন্য যেসব সুযোগ—সুবিধা থাকার কথা, এর অনেক কিছুই এখানে নেই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর টার্মিনালের জন্য ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে চলাচল পথ করা হয়েছে।

 

পর্যায়ক্রমে সুনামগঞ্জের বাস টার্মিনালকে আধুনিকায়ন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করব। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আধুনিকায়নের জন্য ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিছুদিনের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে উন্নয়নকাজ শুরু হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার