প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২৪
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সুনামগঞ্জে এবার নতুন করে ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে। জেলার ৯২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ফলাফল পর্যালোচনা ও মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ফলাফল উন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ফল বিপর্যয়ের পেছনে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণ কী, বিদ্যালয় পর্যায়ে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং আগামী দিনে কীভাবে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানো যায়— এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর—এর বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ শহরের এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রেমানন্দ বিশ্বাস। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সাম্প্রতিক ফলাফল পর্যালোচনা সভায় ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে আপনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার প্রধান কারণ কী মনে করেন?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ দক্ষ শিক্ষকের সংকট। একটি বিদ্যালয়ে ৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত শ্রেণি থাকতে পারে। কিন্তু সরকারি কাঠামো অনুযায়ী অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র একজন বা দুজন ইংরেজি শিক্ষক রয়েছেন। ফলে সব শ্রেণিতে দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এছাড়া শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও একটি বড় সমস্যা। কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে উচ্চ শ্রেণিতে উঠার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি অনেক কমে যায়। নিয়মিত পাঠ গ্রহণ না করার কারণেও শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে পিছিয়ে পড়ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিক্ষার্থীদের এই দুর্বলতার পেছনে ইংরেজির প্রতি আগ্রহের অভাব বেশি, নাকি শিক্ষকদের পাঠদানের পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: ইংরেজি একটি বিদেশি ভাষা হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ভীতি কাজ করে। দক্ষ শিক্ষক ও কার্যকর পাঠদানের মাধ্যমে এই ভীতি দূর করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারলে তাদের দুর্বলতাও অনেকাংশে কাটিয়ে উঠা সম্ভব।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ইংরেজি গ্রামার, রাইটিং ও কমপ্রিহেনশনের মধ্যে কোন জায়গায় শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্বল?
ে্রমানন্দ বিশ্বাস: শিক্ষার্থীদের প্রধান দুর্বলতা গ্রামারে। এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজির একটি বড় অংশ গ্রামারভিত্তিক। গ্রামারের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ ও ভীতি রয়েছে। অনিয়মিত উপস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে তারা এই অংশে বেশি পিছিয়ে পড়ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীদের ভয় ও দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: প্রথমত শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে হবে। দক্ষ শিক্ষক দিয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। গতানুগতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতিতে পাঠদান করতে হবে। অল্প করে পড়ানোর পর পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখতে পেরেছে, তা যাচাই করতে হবে। যেসব জায়গায় দুর্বলতা থাকবে, সেগুলো আবার বুঝিয়ে দিতে হবে। মোটকথা, পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শুধু এসএসসি পরীক্ষার সময় উদ্যোগ নিলে কি ভালো ফল করা সম্ভব, নাকি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: অবশ্যই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু দশম শ্রেণিতে এসে বিশেষ উদ্যোগ নিলে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাওয়া কঠিন। শিক্ষার্থীদের মৌলিক দুর্বলতা শুরু থেকেই চিহ্নিত করে ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বিদ্যালয়ের বাইরে ইংরেজি চর্চার পরিবেশ তৈরিতে অভিভাবকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: একটি শিক্ষার্থী দিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যালয়ে থাকে। বাকি সময় সে পরিবারের সঙ্গে কাটায়। তাই ইংরেজি শিক্ষায় অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন অভিভাবকরা ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ইংরেজি শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুললে তাদের দক্ষতা বাড়ে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণিতে ওঠার পরও প্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দভাণ্ডার আয়ত্ত করতে পারে না। পরিবার থেকে শুরু থেকেই এ বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনার দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে ইংরেজিতে ফলাফল উন্নয়নে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কী পরামর্শ দেবেন?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: প্রথমত শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঠদান পদ্ধতিকে আরও আধুনিক ও পরীক্ষাভিত্তিক করতে হবে। বর্তমানে প্রযুক্তি ও এআইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক লেসন প্ল্যান পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহার করে পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করা সম্ভব। পাশাপাশি অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জেলা শিক্ষা প্রশাসন ও বিদ্যালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী দিনে ইংরেজির ফলাফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন?
প্রেমানন্দ বিশ্বাস: অবশ্যই সম্ভব। অতীতেও ফল বিপর্যয়ের সময় শিক্ষা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং পরে ফলাফলে উন্নতি হয়েছে। জেলা শিক্ষা প্রশাসন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করলে শিক্ষার মান এবং ইংরেজিতে ফলাফল—দুটোতেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন