প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩১
নজরুলের ছবি -সংগৃহীত ছবি
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবিতা ও গানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষাভাবনা ছিল যুগান্তকারী। যেখানে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজকে মুক্ত ও মানবিক করে তোলার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব। ভারতবর্ষের শৃঙ্খলিত সমাজ তিনি দেখা দেন বিপ্লবীর ভূমিকায়। তাঁর লেখা ছিল যাবতীয় অসত্য, অন্যায়, অকল্যাণ, অমঙ্গল ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে। নজরুলের শিক্ষাচিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানবতাবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর দৃষ্টিতে, যে শিক্ষা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে বা সামাজিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখে, তা প্রকৃত শিক্ষা নয়। বরং শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের মধ্যে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা গড়ে তোলে।
নজরুল স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত বুদ্ধির বিকাশকে শিক্ষার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে দেখেছেন। তিনি গৎবাঁধা, মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তাঁর মতে, এমন শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা নষ্ট করে এবং তাদের কেবল অনুকরণকারী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখবে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে পারবে এবং নতুন চিন্তার জন্ম দিতে সক্ষম হবে। নজরুল ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শাসকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য তৈরি হয়েছিল—এমন ধারণা তাঁর প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। এই শিক্ষা মানুষের স্বাধীন সত্তাকে বিকশিত না করে বরং তাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে। নজরুল মনে করতেন, এই ধরনের শিক্ষা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল বা সৃজনশীল করে না; বরং তাকে চাকরিপ্রার্থী ও নির্ভরশীল করে তোলে। নজরুল কর্মমুখী ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা যদি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জীবনের বাস্তব চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হবে। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগ স্থাপন হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এই চিন্তা বর্তমান সময়ের ভোকেশনাল ও স্কিল—ভিত্তিক শিক্ষার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নজরুলের শিক্ষাভাবনায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারতা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তিনি সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি না করে বরং ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে তুলবে।
নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন নজরুলের শিক্ষাচিন্তার অন্যতম প্রধান দিক। তিনি মনে করতেন, কেবল তথ্য ও জ্ঞান অর্জনই শিক্ষার লক্ষ্য নয়; বরং শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা সেই, যা মানুষের অন্তর্গত মানবিক গুণাবলিকে বিকশিত করে । নজরুল নারীর শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ও প্রগতিশীল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির অগ্রগতির জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের সমানভাবে শিক্ষিত হওয়া অপরিহার্য। তাঁর লেখায় নারীকে অবহেলা করার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তিনি মনে করতেন, নারীকে শিক্ষার বাইরে রেখে কোনো সমাজই উন্নতি করতে পারে না। নজরুলের শিক্ষাভাবনায় বিদ্রোহী চেতনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তিনি অন্যায়, শোষণ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং শিক্ষার মাধ্যমে এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষা মানুষকে কেবল অনুগত করে তোলার জন্য নয়; বরং তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তোলার জন্য।
নজরুলের শিক্ষাভাবনা ছিল বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। তাঁর দৃষ্টিতে শিক্ষা মানে কেবল জ্ঞানার্জন নয়; বরং আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা, মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, প্রগতিশীল ও মানবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রবন্ধ ও লেখায় ছড়িয়ে থাকা চিন্তাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—তিনি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যা মানুষকে জ্ঞানীই নয়, বরং মানবিক, সাহসী, স্বাধীনচেতা ও ন্যায়পরায়ণ করে তোলে। নজরুলের মতে, সুশিক্ষার প্রথম শর্ত হলো মানবিকতা। শিক্ষা এমন হতে হবে, যা মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, ভালোবাসা, ন্যায়বোধ ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে।
তিনি জোর দিয়েছেন এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, যেখানে ধনী—গরিব, নারী—পুরুষ, ধর্ম—বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে। তাঁর মতে, বৈষম্যমূলক শিক্ষা কখনোই সুশিক্ষা হতে পারে না । নজরুল মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বিরোধিতা করে বলেন, শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রশ্ন করা, যুক্তি করা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা তৈরি করাই সুশিক্ষার অন্যতম শর্ত।
তিনি ব্রিটিশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থাকে সমালোচনা করে বলেন—এ ধরনের শিক্ষা মানুষকে পরনির্ভরশীল করে। তাই তিনি এমন শিক্ষার পরামর্শ দেন, যা আত্মমর্যাদাবোধ জাগায় এবং জাতীয় চেতনাকে শক্তিশালী করে।
নজরুল মনে করতেন, শিক্ষা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়—কাজের দক্ষতা অর্জন, আত্মনির্ভরশীলতা এবং জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার ক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর মতে, সুশিক্ষা মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করবে। সব ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, নারীকে শিক্ষিত না করলে সমাজের উন্নতি অসম্ভব। তাই সুশিক্ষার বিকাশে নারী—পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নজরুলের মতে, শিক্ষা মানুষকে কেবল বাধ্যগত করে তুলবে না; বরং অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেবে। এই প্রতিবাদী চেতনা সুশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কাজী নজরুল ইসলামের মতে, সুশিক্ষা এমন এক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে কেবল জ্ঞানসম্পন্ন নয়, বরং মানবিক, স্বাধীনচেতা ও ন্যায়নিষ্ঠ করে তোলে। তাঁর পরামর্শগুলো অনুসরণ করলে একটি উন্নত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব। তিনি মনে করতেন শিক্ষার্থীদের “যন্ত্রের মতো” করে তোলে। তারা তথ্য মনে রাখতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞানের গভীরতা বুঝতে পারে না বা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। ফলে শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায় কেবল পরীক্ষায় পাশ করার একটি উপায়, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়। এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনি কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত— চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি করা, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখানো, নতুন কিছু সৃষ্টির অনুপ্রেরণা জাগানো । কিন্তু মুখস্ত বিদ্যা এই লক্ষ্যগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করে এবং তাদের মধ্যে কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা নষ্ট করে দেয়। নজরুল মনে করতেন, যেখানে প্রশ্ন নেই, সেখানে প্রকৃত শিক্ষা নেই। কাজী নজরুল ইসলামের শিক্ষাদর্শনের মূল প্রোথিত রয়েছে বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী স্বদেশি আন্দোলনকালে।
স্বদেশি আন্দোলন শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে কতিপয় জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠন, মানসিক শক্তির বিকাশ, জাতীয় ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও দেশীয় অর্থনীতি সম্পর্কে জ্ঞানদান ছাড়াও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মোট প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ চারটি। প্রকাশিত এই চারটি প্রবন্ধগ্রন্থের প্রবন্ধসহ বিভিন্ন সময় পত্র—পত্রিকায় তাঁর যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, সব মিলিয়ে মোট প্রবন্ধের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫টির অধিক। এছাড়া রয়েছে রাজবন্দির জবানবন্দি নামে একটি ভাষণ, ২২টি অভিভাষণ, ০৯টির অধিক ভূমিকা ও গ্রন্থালোচনা।
গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধসমূহ বিষয় ও বক্তব্য বিচারে সমকালের জীবন—প্রতিবেশের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে শাশ্বত আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম একটি উপনিবেশিত দেশের অধিবাসী হয়েও আদ্যোপান্ত ছিলেন উপনিবেশবিরোধী। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবকে কাটিয়ে জাতীয় বিশেষত্ব বহুল শিক্ষা ও সংস্কৃতি—চর্চার পথ উন্মুক্তকরণে তাঁর চিন্তা ও সর্বাত্মক প্রয়াস কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। স্বদেশি ও অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ গৃহীত হয়, তাতে নজরুল ইসলাম সর্বৈব সমর্থন প্রদান করেননি। কারণ তিনি মনে করতেন, শুধু আন্দোলনের সমর্থনে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ অদূরদর্শিতার পরিচায়ক। জাতীয় জীবনের প্রয়োজনে অনেক আগেই এ ধরনের উদ্যোগ গৃহীত হওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন, দেশীয় ইতিহাস ঐতিহ্য ও সৃষ্টিশীলতা—চর্চার পরিবর্তে বিজাতীয়—বিদ্যার অন্ধ অনুকরণে এবং তা থেকে লব্ধজ্ঞান দেশীয় ঐতিহ্যকে অপসারিত করে এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে ব্যক্তির রুচি—পছন্দ ও মানসিকতার যোগ সৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।য়ইতিহাস—ঐতিহ্য—সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শিক্ষা তাঁর পরম কাঙ্ক্ষিত হলেও বিদেশি শিক্ষাকে ঢালাওভাবে বর্জনের পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। দেশীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিংবা দেশীয় চেতনা বা বোধের পরিপন্থি নয়, এমন ধরনের বিদেশি শিক্ষা উপাদান তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। যেটুকু প্রয়োজনীয় ও গ্রহণযোগ্য তা দেশি হোক বা বিদেশি ভাল—মন্দ জ্ঞান—এর কষ্টিপাথরে তাকে যথার্থরূপে যাচাই করে নেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।বিভিন্ন সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ও অভিভাষণে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী বিদেশি শিক্ষাব্যবস্থাকে বাতিল করে ‘জাতীয় শিক্ষা’ বিষয়ক ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন নজরুল। এ সকল রচনায় তিনি দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে আমাদের জাতিসত্তা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে তাদের ইতিহাস—ঐতিহ্যকে আমাদের মনে—প্রাণে প্রোথিত করে দিচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা’ বাস্তবায়নে পূর্বের ভুল—ত্রুটি শুধরে নিয়ে সঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার দিক—নির্দেশনা প্রদান করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধে নজরুলের তৎকালীন ‘জাতীয় শিক্ষা’—ভাবনার স্বরূপ ও প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘অনুকরণ—প্রবণতা’ নয় বরং মৌলিক চিন্তাসৃষ্টির প্রণোদনার কথা লিখেছেন। ওই সময়ে বঙ্গদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রাচ্যশিক্ষার কথা বললেও আদতে তারা ‘টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলতলায় বাসা’ বাঁধারই উপক্রম করেছিল। পরিবর্তন এসেছিল শুধু নামে। যেন অনেকটা ‘বিলাতি শিক্ষার ট্রেডমার্ক উঠাইয়া স্বদেশী মার্কা লাগাইয়া দেওয়ার মতো।’ এসব ‘হনুকরণ’ প্রবণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নজরুল কিছুতেই স্বদেশি বা জাতীয় শিক্ষা বলে মানতে রাজি ছিলেন না। নজরুলের মতে, ‘এসবই ইংরেজি কায়দা—কানুনকে যেন মাথায় পগ্গ ও পায়ে নাগরা জুতা পরাইয়া এদেশি করা; অথবা সাহেবকে ধুতি ও মেমকে শাড়ি পরাইয়া বাবু ও বিবি সাজানো গোছ।’ আমরা কেবল অন্য সংস্কৃতিকে কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীদের মননে মনের অজান্তে বপণ করে তাদের সহিংস করে তুলছি আমাদের শেকড় ও আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে । পরিশেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের মতে মুখস্ত বিদ্যা শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্যকে ব্যাহত করে। তিনি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল তথ্য মুখস্থ না করে, বরং তা বুঝে, বিশ্লেষণ করে এবং সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করতে পারে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন