প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৮
তাহিরপুরের শান্তিপুরে দীর্ঘদিন ধরে বালু লুটের অভিযোগ এবং সর্বশেষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে লুট করে আনা বালু স্তূপ করে রাখার ঘটনা নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় আলোচনা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শান্তিপুরের বালু লুটের চিত্র, এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তকরণ, প্রশাসনের ভূমিকা, পরিবেশ ও হাওরের উপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বালু লুট বন্ধে করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ পরিবেশরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শান্তিপুরের নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বালু লুটের অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই লুট করে আনা বালু স্তূপ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন আপনি। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: শান্তিপুরে যেভাবে বালু লুট হচ্ছে, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এই নদীর সঙ্গে অনেকগুলো হাওর জড়িত। নদীটি যদি এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসে, তাহলে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে গিয়ে মাটিয়ান হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ আশপাশের ছোট—বড় হাওরগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বালু ও পলি পড়ে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে লুট করে আনা বালু স্তূপ করে রাখার ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে এভাবে লুট করা বালু স্তূপ করে রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক। এত বড় একটি উপজেলার প্রধান কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে বালু রাখা হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের জন্যও প্রশ্ন তৈরি করে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শান্তিপুরে এর আগেও বালু লুট বন্ধে বাঁশের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে আপনি জানিয়েছেন। এবার সেটি না দেওয়ার কারণ কী?
ফজলুল করিম সাঈদ: গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে শান্তিপুরে একটি মতবিনিময় সভা হয়েছিল। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আমতলের পাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া হবে। ওই বাঁশের বেড়ার কারণে তখন বালু লুট অনেকটাই বন্ধ ছিল। এবারও একইভাবে বাঁশের বেড়া দেওয়ার জন্য আমি ইউএনও ও ওসির সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছি। কিন্তু একজন আরেকজনের কাছে যেতে বলেছেন। কার্যকরভাবে বেড়া দেওয়া হয়নি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহলে এখানে কোনো ধরনের গাফিলতি বা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে আপনি মনে করছেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: থাকতে পারে। কারণ বারবার বলার পরও যখন বলা হয় ‘দিচ্ছি’, ‘দেখছি’, তখন মানুষের সন্দেহ তৈরি হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যদি বলা হয়, ‘আমি কী করব?’—এটা মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বালু লুটের সঙ্গে কারা জড়িত বলে আপনি মনে করেন? এ বিষয়ে আপনাদের কাছে কোনো তথ্য আছে?
ফজলুল করিম সাঈদ: সব জায়গার মতো তাহিরপুরেও একটি অসাধু চক্র থাকতে পারে, যারা বালু লুটের সঙ্গে জড়িত। তারা রাজনৈতিক আশ্রয়—প্রশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করে এবং সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে লুটপাট চালিয়ে যেতে চায়। তবে কারা জড়িত, তা বের করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যও বলেছেন, অন্যায়কারীদের ছাড় দেওয়া হবে না এবং নিজের লোক হলেও ছাড় দেবেন না। তাহলে রাজনৈতিক আশ্রয়—প্রশ্রয়ের অভিযোগের সঙ্গে বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
ফজলুল করিম সাঈদ: আমার সংসদ সদস্যের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, তিনি বালু লুট বন্ধের ব্যাপারে আন্তরিক। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়—প্রশ্রয় নিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে চায়। সেই চক্রকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে যে বালু রাখা হয়েছে, সেটি তো দিনের বেলায় প্রকাশ্যে রাখা হয়েছে। তাহলে কারা বালু রেখেছে, তাদের শনাক্ত করা কি কঠিন?
ফজলুল করিম সাঈদ: এটি তো প্রকাশ্য ঘটনা। দিনে বালু রাখা হয়েছে। আশপাশের মানুষ দেখেছে কারা রেখেছে। প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রয়েছে। তারা চাইলে জড়িতদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জানতে চাই—বালু লুট বন্ধে প্রশাসনের এখন কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?
ফজলুল করিম সাঈদ: প্রথমে প্রশাসনকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। তারা শোষকের পক্ষে, নাকি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে—এটি স্পষ্ট করতে হবে। সদিচ্ছা থাকলে বালু লুট বন্ধ করা কোনো কঠিন বিষয় নয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বাস্তবে কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব?
ফজলুল করিম সাঈদ: প্রশাসনকে এলাকায় গিয়ে মানুষকে নিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সচেতনতামূলক সভা করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মেম্বার—চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দিতে হবে। প্রশাসনের অধীনে পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ বিভিন্ন জনবল ও সোর্স রয়েছে। এগুলো কাজে লাগিয়ে কার্যকর বেরিকেড তৈরি করা হলে বালু লুট বন্ধ করা সম্ভব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন