প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৮
# রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর। মাজার জিয়ারত
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের বড় সৌন্দর্য বলে মন্তব্য করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। এই সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সৌন্দর্য। দেশের অগ্রযাত্রায় এই সম্প্রীতি ও ঐক্য ধরে রাখতে হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করেছে, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সেই পথে বাধা এসেছে। এবার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই অবহেলায় গণতন্ত্র হারানো যাবে না।’ এ মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন—সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তা রক্ষা করাই দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, গত ১৫—১৬ বছর দেশের ইতিহাসে একটি জটিল সময় গেছে। ওই সময়ে গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক নেতা—কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন—সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। সেই ত্যাগের বিনিময়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ এসেছে। বহু ত্যাগ—তিতিক্ষা, রক্তপাত ও আমাদের সন্তানদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছি। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি সুযোগ আমরা পেয়েছি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। এখন সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব হচ্ছে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার জাগিয়ে তোলা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা।
শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হয়। সংসদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে সেই মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। সংসদকে কার্যকর করা, সংসদ যেন ঠিকমতো কাজ করে, সেই চেষ্টা করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে যে দ্বিমত রয়েছে, তা আলাপ—আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।
আগামী দিনের রাজনৈতিক দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অতীতে তাঁরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। এখন দেশের পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনের লড়াই হচ্ছে দেশকে পুনর্গঠন করা, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য আবাস নির্মাণ করা।
রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে সরকার ও বিরোধী দল থাকবে। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে সবাইকে একমত হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আসুন, আমাদের যে সাধারণ বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়গুলোতে আমরা একমত হই। একমত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।’
সিলেটের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি বহুবার সিলেটে এসেছেন। অতীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গণতন্ত্রের আন্দোলনেও সিলেটের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
সিলেটের মানুষের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন অতিথিপরায়ণতা ও শান্তিপ্রিয়তা রয়েছে, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ঐতিহ্যও রয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য সিলেটের মানুষ অতীতেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
সিলেটের গুণী ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, সুফি সাধক শাহ আবদুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বহু কৃতী মানুষের জন্ম ও কর্মের সঙ্গে সিলেটের সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধেও সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় প্রকল্প সামনে এসেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে তিনি আশা করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য নিজেদেরও উদ্যোগী হতে হবে। কেউ এসে সবকিছু করে দিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা না করে নিজেদের সামর্থ্য ও ঐক্যকে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, আমরা যদি নিজেদের দাবি নিজেরা আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের জন্য করে দিয়ে যাবে না।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছ। সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনীকে সংবর্ধিত করা হয়। অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি—পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতি সকালে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরে সার্কিট হাউসে গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন। এরপর তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)—এর মাজার জিয়ারত করেন। সফরসূচি অনুযায়ী, মাজার জিয়ারত শেষে রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউসে ফিরে যান। পরে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে নগরভবন প্রাঙ্গণে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেন। রাতে তিনি ঢাকায় ফেরেন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন