প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৩
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সুনামগঞ্জে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানপত্র দাখিলের অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে জারিকৃত এই নিয়োগপত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় মেধাক্রমের সামনের দিকে থাকা ১২০ জনের কপাল ভেঙেছে। সর্বশেষ যাচাইকালে অযোগ্য হয়েছেন তাঁরা, এমনটাই জেনেছেন বাদ পড়া হতভাগ্যরা। এরা চাকুরি পাবেন কি—না, এটি এখনো প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ জানাতে পারে নি। এই তালিকা থেকে বঞ্চিতরা মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা মনে করছেন, এভাবে বাদ পড়ে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকুরি পাওয়ার সকল দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে তাদের।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত মানুষের গ্রাম হিসেবে পরিচিত জয়কলস ইউনিয়নের মির্জাপুরে বাড়ি মনোজ কান্তি দাস—এর। বাবা মনোরঞ্জন দাস দর্জি ছিলেন। মারা গেছেন তিনি। সিলেটের এমসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন বেশ আগেই। চাকুরির বয়স সীমাও শেষের দিকে।
মনোজ বললেন, একমাত্র সন্তান হলেও সিলেটে রেখে পড়াশোনা করানোর সামর্থ ছিল না বাবার। আমি ওখানে ছাত্র পড়িয়ে নিজের খরচ চালিয়ে বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়েছে। এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ হয়েছিল, ওখানে থাকলে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া লাগবে, এজন্য থাকি নি, মেসে থেকে পড়াশোনা করেছি। আমার স্বজনদের কেউ কোনদিন রাজনীতি করে নি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার ১৮ দিনের মাথায় বাবা মারা গেছেন। বাবার ইচ্ছা ছিল আমি যেন সরকারি চাকুরি পাই। আমার চাকুরি হয়েছে শুনে বাবা যারপর নাই খুশি হয়েছিলেন, এখন শুনি সর্বশেষ যাচাইয়ে আমি অযোগ্য হয়েছি। আমার নিয়োগপত্র আসবে না।
একই উপজেলা ও ইউনিয়নের ফতেহ্পুর গ্রামে বাড়ি সামন্ত কুমার দাস এর। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ও মৌখিকপর্বে উত্তীর্ণ হবার পর নিজের ফেসবুক আইডিতে সামন্ত লিখেছিলেন, ‘নতুন পরিচয় সহকারী শিক্ষক (প্রাথমিক)।’ বৃহস্পতিবার রাত দশটার দিকে আবার একই আইডিতে সামন্ত লিখেছেন, ‘নিয়োগপত্র নেবার লিস্টে আমার নাম নেই, আমার নামে নিয়োগপত্র আসবে না। কেন? এ কেমন প্রহসন?’ রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্সে পড়–য়া সামন্ত এই প্রতিবেদককে বললেন, আমার বাবা হিরেন্দ্র কুমার দাস শিক্ষক ছিলেন, মারা গেছেন বছর খানেক আগে। রাজনীতির ধারে—কাছে যাই নি কোনদিন। কোন মামলা নেই। কাগজপত্রেও কোন সমস্যা নেই। নিয়োগপত্র কেন আসলো না জানতে চেয়েছিলাম শিক্ষা অফিসে, তারা বললেন—‘সর্বশেষ যাচাইকালে বাদ পড়েছি।’ আমি এখন কী করবো, ভবিষ্যতেওতো আমার সরকারি কোন চাকুরি হবে না। চাকুরির বয়সও তো শেষের দিকে, এখন কার কাছে যাব?
এই ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামে বাড়ি চাকুরি বঞ্চিত জয় তালুকদার এর। সিলেটের এমসি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা জয়ের বাবা অনিভূষণ তালুকদার ২০১৬ সালে মারা যাবার পর দুই ভাই, দুই বোনের পরিবারের ভরসা বড় ছেলে জয়। টিউশনি করেই সংসারের ঘানি টানছে সে। জয় বললেন,‘এভাবে বাদ পড়লে, সরকারি চাকুরিতো আর হবেই না।’
সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জের সহকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হয় বছরের শুরুতেই ২ জানুয়ারি। জেলা সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৪ হাজার ৪৮৯ জন নিয়োগ প্রত্যাশী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন দুই হাজার ১৫৯ জন। ২৮ জানুয়ারি থেকে দুই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন দুই হাজার ৯৯ জন। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬৩৭ জন। এরমধ্যে ২০ জন পরীক্ষার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন নি অফিসে। পরে উত্তীর্ণ ৬১৭ জনকে নিয়োগ প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠায় জেলা শিক্ষা অফিস কতৃর্পক্ষ। কিন্তু সর্বশেষ যাচাই—বাছাইয়ে এই তালিকার ১২০ জন নিয়োগপত্র পাওয়া থেকে বাদ পড়েছেন।
সুনামগঞ্জে বাদ পড়াদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিরাই ও ছাতক উপজেলার বাসিন্দা বলেও শিক্ষা অফিসের একজন কর্মচারী নিশ্চিত করেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বললেন, অধিকতর যাচাইয়ে আরও অনেকেরই হয়তোবা চাকুরি হবে, অর্থাৎ পরে নিয়োগপত্র পাবে। তবে আপাতত হতাশায় পড়বেন এরা। ওই কর্মকর্তা বললেন, এতে অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আর্থিক কেলেংকারিতেও জড়াতে পারেন।
সরকারি চাকুরি প্রত্যাশীদের নানা বিষয়ে যাচাই করার দায়িত্বে থাকা একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা বললেন,‘নিয়োগ প্রত্যাশীর নাম—ঠিকানা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মামলা আছে কী—না, এগুলোই রিপোর্টে উল্লেখ করে থাকি আমরা। আরেক কর্মকর্তা বললেন, যৌন হয়রানি, যৌতুক কিংবা ইভ—টিজিংয়ের মামলা বা বাড়িঘরের ঠিকানাও যাচাই করেছেন তারা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বললেন, সুনামগঞ্জে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬১৭ জনের মধ্যে ১২০ জনের যোগদানপত্র আপাতত দেওয়া হচ্ছে না। উর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন