প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৫
গত ৫২ বছরে দেশের আবাদি জমি ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান জনবহুল বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ((বিএআরসি) কর্তৃক বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত একটি কর্মশালায় এই তথ্য উপস্থাপন করা হয় (সূত্র : দৈনিক সমকাল, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। ১৯৭১ সন থেকে ২০২৩ সন পর্যন্ত কৃষিজমি শতকরা ত্রিশ ভাগ হ্রাস পেলেও এ সময়ে ধান, গম ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮ গুণ, ১৭ দশমিক ২৭ গুণ ও দুই হাজার ২৬৬ দশমিক ৬৭ গুণ। জমির গড় উৎপাদন বাড়ার কারণে কৃষিজমি কমার প্রভাব তেমন করে এখন পর্যন্ত অনুভব করা যায়নি। কর্মশালায় বিএআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আব্দুছ ছালাম বলেছেন, ‘জমি কমে যাওয়া খাদ্য উৎপাদনের জন্য চ্যালেঞ্জ। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য উত্তম কৃষিচর্চা (গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস) বাড়াতে হবে। আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য সাধারণত অভ্যন্তরীণ উৎসকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। কৃষিজ ও প্রাণীজ উপকরণের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার ও সংগ্রামী কৃষকরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে, এর ফলও পাওয়া গেছে। দেশে মিঠা পানির মাছ কমলেও চাষের মাছের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। হাঁস—মুরগি, ছাগল ও গরুর খামার বৃদ্ধি পেয়ে দুধ, ডিম ও মাংসের চাহিদার অধিকাংশ মিটাতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদনের একটি সর্বোচ্চ মাত্রা আছে, এর বেশি ফলানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কৃষিজ উৎপাদনশীলতা এখনও বিশে^র বহু দেশের তুলনায় কম। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর অনেক সুযোগ আছে। দেশে প্রতি বছর দেশে গড়ে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ বাড়ছে। এই বাড়তি মানুষের চাহিদা মিটাতে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার অনুসরণ ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। তবে সবার আগে আমাদের কৃষিজমির পরিমাণ যাতে আর না কমে সে দিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। বাড়াতে হবে মৎস্য ও পশু—পাখির উৎপাদন সক্ষমতা। যে কোনো উন্নয়ন কাজের জন্য কৃষিজমি বিনষ্ট করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এই ধরনের উন্নয়নের আগে প্রতি ইঞ্চি কৃষিজমি নষ্ট করতে শতবার ভাবতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন আছে তবে তা করতে হবে কৃষিজমির সর্বনিম্ন ব্যবহারের মাধ্যমে। দেশের গ্রামীণ আবাসিক মডেলকে ঢেলে সাজাতে হবে। একটি পরিবার ভেঙে যখন একাধিক পরিবার তৈরি হয় তখন কৃষিজমি নষ্ট করে একাধিক বাড়ি তৈরি করতে হয়। গ্রামীণ আবাসনের এই সনাতনি মডেল ত্যাগ করে বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের মাধ্যমে কৃষিজমি রক্ষা করার দিকে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
কৃষিজ উৎপাদনের উর্দ্ধমুখী ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে হবে। এখন দেশের কৃষকরা উৎপাদিত কোনো পণ্যেরই ন্যায্যমূল্য পান না। কৃষকের পরিবর্তে মধ্যসত্ত্বভোগী ফরিয়া ব্যবসায়ীরা অসাধু বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে বেশি মুনাফা লুটে নেয়। ঠিক এই সময়ে হাওরাঞ্চলে ধানের মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের চাইতেও কম। বহু কৃষক ধান বিক্রি করতে না পেরে হাহাকার করছেন। কৃষক যদি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পান তাহলে কৃষি কাজের প্রতি তাঁদের আগ্রহ কমে আসবে। এ জন্য ন্যায্যমূল্য পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে কৃষকরা এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। কৃষিপণ্যের বাজারকে গণমুখী করে গড়ে তোলতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহের যে যৎসামান্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকে তার সুফল কৃষকের পরিবর্তে মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ীরা ভোগ করেন। প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণমুখী মডেল অনুসরণের দিকে সরকার মনোযোগী হলে ফলপ্রসূ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
কৃষিকে কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসন থেকে মুক্ত করে প্রকৃত কৃষক ও প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের প্রাকৃতিক জলাশয় এখন যেভাবে মৎস্যশূন্য হয়ে পড়েছে তা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। বিশাল হাওরাঞ্চল বছরের প্রায় আট মাস জলমগ্ন থাকে। এই আট মাস হাওরে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের প্রচুর সম্ভাবনা আছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের মাছের সুনাম আবার ফিরে আসবে। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অবাধে যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তা আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপুল ক্ষতি করছে। এই বিষাক্ত আগ্রাসন থেকে রক্ষা করেই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। কেবল এগুলো নিশ্চিত করা গেলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অটুট থাকবে। এই নিরাপত্তাই আমাদের রক্ষাকবচ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন