প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০৭
সংগৃহীত ছবি
বুকের যে কোনো অস্বস্তি, চাপ কিংবা হালকা ব্যথাকে গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা বদহজম মনে করে এড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে বলে মনে করছেন কলকাতার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি বিশ্ব হার্ট দিবস সামনে রেখে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই প্রথম দিকের লক্ষণগুলোকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করে থাকেন। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানো দেরি করে ফেলে, যা অনেক সময় মারাত্মক কিংবা প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
কিন্তু হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন উপসর্গ কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক সংকেতও হতে পারে। বিশ্ব হার্ট দিবসের পূর্ব মুহূর্তে চিকিৎসকরা বলেছেন, হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীরা প্রথম দিকের লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে চান না। প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা পেতে দেরি করার কারণে প্রাণ হারান। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ কম বয়সেও হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং সবসময় তীব্র বুকব্যথা দিয়ে তার প্রকাশ নাও হতে পারে।
সম্প্রতি চার্নকক হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান তপোব্রত দে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হার্টের ব্যথা এবং গ্যাস বা অ্যাসিডিটির অস্বস্তির মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় রোগীর পক্ষে সহজ হয় না। তিনি বলেন, হৃদযন্ত্রজনিত ব্যথা সাধারণত বুকের মাঝখান থেকে শুরু হয়ে বাঁ হাত ও কাঁধের দিকে ছড়াতে পারে। আবার সেই অস্বস্তি পেটের দিকেও নামতে পারে এবং চোয়ালেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ নড়াচড়ার সঙ্গে ব্যথা বাড়তে পারে।
এ কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হার্টের সামান্য সমস্যা তুলনামূলক হালকা উপসর্গ তৈরি করে থাকে। রোগী সেটিকে গুরুত্ব না দিলে পরে তা বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাকে পরিণত হতে পারে। তিনি বলেন, বিশেষ করে কম বয়সি রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় খুব স্পষ্ট হয় না। আবার কখনো ব্যথা ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, যাকে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বলা হয়ে থাকে। পরিবারে কম বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক তপোব্রত দে।
তিনি বলেন, এ ধরনের মানুষের ক্ষেত্রে রক্তনালিতে ব্লকেজ তৈরি হয়ে তা হঠাৎ ফেটে গিয়ে বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে। তার আগে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে।
তপোব্রত দে বলেন, ডায়াবেটিসের কারণে হৃদযন্ত্রের স্নায়বিক অনুভূতি কমে যেতে পারে। ফলে অন্য রোগীর তুলনায় ব্যথার মাত্রা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত মদপান এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব রক্তনালিতে দ্রুত ও অনেক সময় নীরবে ব্লকেজ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শুধু বিশ্রামের অবস্থায় করা পরীক্ষা সব ধরনের সমস্যা ধরতে নাও পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
এ কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে তার কার্ডিয়াক রোগীদের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী উপসর্গ উপেক্ষা করার পর আচমকা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন।
অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে হৃদ্রোগের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট উদয় শঙ্কর দাস। তিনি বলেন, তীব্র হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এসটিইএমআই এবং এনএসটিইএমআই— দুই ধরনের রোগী মিলিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স এখন ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।
এদিকে আরএন টেগোর হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি কনসালট্যান্ট অতনু সাহা জানিয়েছেন, অনেক রোগী প্রাথমিক সতর্কসংকেত দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় অনেক ক্ষেত্রেই তখন হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়।
তিনি বলেন, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমিভাব কিংবা ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা পেটের দিকে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে শুধু অ্যাসিডিটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আর নিয়মিত ব্যায়াম হৃদরোগের জন্য উপকারী হলেও, অতনু সাহা বলেছেন, শুধু ব্যায়াম করলেই হৃদরোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। কারও অজানা হৃদযন্ত্রের সমস্যা থাকতে পারে— এমনকি তিনি বাইরে থেকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেও। আবার দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করে হঠাৎ অত্যন্ত বেশি পরিশ্রম বা তীব্র ব্যায়াম শুরু করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে।
বিএম বিড়লা হার্ট হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও টিএভিআর বা টিএভিআই বিভাগের প্রধান জয় শোমের বলেছেন, হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গের আগেই তৈরি হতে শুরু করে। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি সাধারণ স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাতে এসে নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করলেও তার উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে বেশি শর্করা কিংবা অস্বাভাবিক লিপিড প্রোফাইল থাকতে পারে। তাৎক্ষণিক কোনো অস্বস্তি না থাকায় রোগী হয়তো এ রিপোর্টগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না।
তিনি বলেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগের ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ইঙ্গিত হতে পারে। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন এবং পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাসের মতো বিষয় নিয়মিত নজরে রাখলে ঝুঁকি অনেক আগে শনাক্ত করা সম্ভব।
সূত্র: যুগান্তর .কম
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন