প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:২২
প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয় ও সেবার লক্ষ্যে সুনামগঞ্জে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫ শয্যার ‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি। জনবলের পদ সৃজন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবন ও চিকিৎসা—ব্যায়ামের বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আশ্রয়প্রত্যাশী অসহায় প্রবীণরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিনিবাস দ্রুত চালুর করণীয় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোনাওয়ার আলী। সঞ্চালনায় ছিলেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ দিবসের মূল বার্তা কী? আমাদের সমাজে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
ডা. মোনাওয়ার আলী: আমার মনে হয়, প্রবীণদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তা এখনো যথাযথভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না। এ বিষয়ে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। প্রবীণদের জন্য আইন ও বিভিন্ন সুযোগ—সুবিধা থাকলেও সেগুলো বাস্তবে যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, প্রবীণ ভাতা ও চিকিৎসাসুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শান্তিনিবাস তিন বছরেও চালু হয়নি। একজন প্রবীণ অধিকারকর্মী ও চিকিৎসক হিসেবে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
ডা. মোনাওয়ার আলী: বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সরকারের একটি পরিকল্পিত প্রকল্প ছিল। এখানে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রবীণদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে ভবনটি পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হলে প্রবীণদের মধ্যেও একটি ইতিবাচক বার্তা যেত।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জনবলের পদ সৃজন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি চালু হচ্ছে না বলে জানা গেছে। দ্রুত চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী করা উচিত?
ডা. মোনাওয়ার আলী: বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে হবে। শান্তিনিবাসে কী কী পদ প্রয়োজন, সেগুলো দ্রুত সৃজন ও পদায়নের জন্য জোর তদবির করতে হবে। একটি প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পর শুধু জনবলের কারণে বছরের পর বছর পড়ে থাকা উচিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে জনগণকেও এ দাবিতে এগিয়ে আসতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবন, চিকিৎসা ও ব্যায়ামের সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় এখন কী করা প্রয়োজন?
ডা. মোনাওয়ার আলী: সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের রয়েছে। ভবন ও সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেলে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি চালু করতে আবারও অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে। অনেক সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিষ্ঠানটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শান্তিনিবাস চালু হলে আশ্রয় নেওয়া প্রবীণদের জন্য কী ধরনের সেবা থাকা প্রয়োজন?
ডা. মোনাওয়ার আলী: প্রবীণদের চিকিৎসা, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা ও দৈনন্দিন পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অনেক প্রবীণ আছেন, যাদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে তারা শান্তিপূর্ণভাবে জীবন কাটাতে পারবেন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের বাস্তব চিত্র কেমন?
ডা. মোনাওয়ার আলী: সুনামগঞ্জে অনেক প্রবীণ আছেন, যারা জীবিকা নির্বাহের জন্য রিকশা চালান, শ্রমিকের কাজ করেন কিংবা দিনমজুরের কাজ করেন। কারও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতেও জড়িয়ে পড়ছেন। এ ধরনের অসহায় প্রবীণদের জন্য শান্তিনিবাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
ডা. মোনাওয়ার আলী: অন্যান্য দেশে প্রবীণদের জন্য আইন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নও করা হয়। আমাদের দেশেও আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয় না। এমনকি অনেক সময় নবীনরা প্রবীণদের সরিয়ে আগে নিজেদের কাজ করার চেষ্টা করেন। প্রবীণদের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত, তা আরও বাড়াতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রবীণদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কী ভূমিকা থাকা উচিত?
ডা. মোনাওয়ার আলী: সরকারকে প্রবীণদের বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রচলিত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরও উদ্যোগ নিতে হবে। প্রবীণদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘও এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সবশেষে শান্তিনিবাস দ্রুত চালুর বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
ডা. মোনাওয়ার আলী: প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি প্রতিষ্ঠান তিন বছর ধরে পড়ে থাকা উচিত নয়। প্রবীণদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত জনবল সৃজন ও পদায়নের মাধ্যমে শান্তিনিবাস চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ভবন ও সরঞ্জামসহ সরকারি সম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন