শৈলশহর শিলংয়ের স্মৃতির সরণি বেয়ে আমার ছেলেবেলার পূজা

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৫৭

ছেলেবেলার দুর্গাপূজার কথা মনে পড়লেই মনটা ফিরে যায় পাহাড়ঘেরা শৈলশহর শিলংয়ে। জীবনের শৈশব থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত আমার পূজার দিনগুলি কেটেছে এই সুন্দর শহরেই। সময়ের স্রোতে কত কিছুই না বদলে গেছে, কত চেনা মুখ হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে, কত পুরোনো ঠিকানা আজ স্মৃতির পাতায় বন্দি! তবু দুর্গাপূজা এলেই মনের মধ্যে ভিড় করে আসে সেই দিনগুলির কথা—নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো, পছন্দের খাবারের স্বাদ, মণ্ডপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর বিসর্জনের দিনের বাঁধনহারা আনন্দ। আর ছিল পূজা মণ্ডপে বন্ধুদের সঙ্গে বসে  সিলেটিতে নির্ভেজাল আড্ডা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আজও সেই সব স্মৃতি মনের গোপন কোণে অমলিন হয়ে আছে।

দাদা-বৌদির সংসারেই আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল ছিল না, তবে অভাব-অনটনের মধ্যেও সংসার মোটামুটিভাবে চলে যেত। কিন্তু দুর্গাপূজা ছিল অন্য রকম। সারা বছরের সাধারণ জীবনযাত্রার মধ্যে পূজা নিয়ে আসত একরাশ আনন্দ আর উৎসবের আবেশ। পূজা মানেই নতুন জামাকাপড়, ভালো-মন্দ খাওয়াদাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আর অফুরন্ত হাসি-আনন্দ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও দাদা চেষ্টা করতেন আমাদের সবার মুখে হাসি ফোটাতে।

পূজার মাসে দাদার মাইনে হলেই শুরু হয়ে যেত আমাদের কেনাকাটার পালা। সবাই মিলে বেরিয়ে পড়তাম বাজারে। দাদা তাঁর সাধ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের পছন্দ ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে জামাকাপড় কিনে দিতেন। নতুন জামাকাপড় কেনার আনন্দই ছিল আলাদা। তবে আমাদের কেনাকাটার তালিকা শুধু জামাকাপড়েই সীমাবদ্ধ থাকত না। পূজার গানের রেকর্ড কেনা হতো, সঙ্গে কেনা হতো শারদীয়া 'দেশ' ও 'প্রসাদ'। বৌদির বিশেষ পছন্দ ছিল সিনেমার পত্রিকা 'প্রসাদ'। তখনকার দিনে নতুন গানের রেকর্ড আর শারদীয়া পত্রিকা হাতে পাওয়া ছিল পূজার আনন্দেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের মতো হাতের মুঠোয় সবকিছু পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। তাই নতুন রেকর্ড কিংবা পত্রিকা কেনার আনন্দও ছিল অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি আন্তরিক।

কেনাকাটা শেষ হলে আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল—পেটপূজা। আমাদের পছন্দের দুটি জায়গা ছিল ‘নিউ ইন্ডিয়া রেস্টুরেন্ট’ এবং ‘দিল্লি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। চাইনিজ খাবার খেতে হলে 'নিউ ইন্ডিয়া', আর মিষ্টি খেতে হলে 'দিল্লি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার'। বৌদি মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতেন। তাই কেনাকাটার পর অধিকাংশ সময়ই আমাদের গন্তব্য হতো দিল্লি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখানকার জিলিপি আর বেসনের লাড্ডু ছিল বিখ্যাত। বিশেষ করে জিলিপির স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। জিলিপির এমন স্বাদ আর কোথাও পাইনি। সেই পুরোনো স্বাদ অটুট আছে কি না, জানি না। কিন্তু স্মৃতির পাতায় তার স্বাদ আজও অমলিন। কিছু কিছু স্বাদ বোধ হয় শুধু জিভে নয়, হৃদয়ের গভীরেও থেকে যায়।

 স্কুলজীবনে আমরা যে পাড়ায় থাকতাম, তার কাছেই ছিল পোলো বাজারের মাতৃমন্দিরের পূজা। স্কুলে পূজার ছুটি শুরুর আগের দিনে বন্ধুদের সঙ্গে বসে তৈরি হতো পূজার পরিকল্পনা। কোথায় কোথায় যাব, কোন কোন মণ্ডপ দেখা হবে, কখন বেরোব—সবকিছুরই একটা খসড়া তৈরি হয়ে যেত। আমাদের সবার মিলনস্থল ছিল সেই মাতৃমন্দির।

সপ্তমীর দিন আমরা পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম প্যান্ডেল হপিংয়ে। বিকেল চারটে থেকে রাত নটা পর্যন্ত গোটা শহর চষে বেড়াতাম। শিলংয়ের এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে কী যে আনন্দ ছিল, তা আজকের দিনে বোঝানো কঠিন। তখন না ছিল মোবাইল ফোনের ঝক্কি, না ছিল ছবি তুলে মুহূর্তকে ধরে রাখার এত আয়োজন। ছিল শুধু নিজেদের মতো করে বাঁচার আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, হাসি আর একসঙ্গে কাটানো অমূল্য সময়।

প্যান্ডেল ঘোরা শেষ হলে শুরু হতো খাওয়াদাওয়ার পালা। পাঁচ বন্ধুর পকেটে যার যত টাকা থাকত, সব এক জায়গায় জড়ো করা হতো। তারপর সেই সম্মিলিত অর্থের হিসেব কষে ঠিক করা হতো কী খাওয়া যাবে। আমাদের পছন্দ অবশ্যই ছিল চাইনিজ খাবার। আজকের দিনে এই সামান্য ঘটনাটিকে হয়তো খুব সাধারণ বলেই মনে হবে, কিন্তু তখন বন্ধুদের সঙ্গে পকেটের শেষ কটা পয়সা মিলিয়ে খাওয়ার মধ্যেও যে আনন্দ ছিল, তার তুলনা হয় না। খাবারের দাম কিংবা কে কত টাকা দিল, তা নিয়ে কোনও বড়ো হিসাব-নিকাশ ছিল না। ছিল একসঙ্গে আনন্দ করার সহজ, সুন্দর মানসিকতা।

অষ্টমী ও নবমীর দিন অবশ্য ছিল পরিবারের জন্য। বাড়ির সবাই মিলে পূজা দেখতে বেরোতাম। সেই দুদিনও খাওয়াদাওয়ার কোনও কমতি থাকতো না। একদিকে বন্ধুদের সঙ্গে উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে পরিবারের সঙ্গে একান্ত সময়—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই পূজা হয়ে উঠতো আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় অধ্যায়গুলির একটি।

শিলংয়ের দুর্গাপূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, প্রতিদিন মায়ের সন্ধ্যারতির পর বিভিন্ন মণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। পূজা শুধু মায়ের দর্শন আর অঞ্জলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না; সন্ধ্যার পর মণ্ডপগুলি হয়ে উঠত গান, নাটক, নাচ এবং যাত্রাপালার আসর। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনোদনের এমন সুন্দর সমন্বয় পূজার আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিত।

একবার আমরা তিন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, পুলিশ রিজার্ভের পূজায় যাত্রাপালা দেখতে যাব। কিন্তু রাত করে যাত্রা দেখা বাড়ি থেকে একেবারেই অনুমোদিত ছিল না। অগত্যা বৌদির শরণাপন্ন হলাম। বৌদি শেষ পর্যন্ত দাদাকে রাজি করিয়ে দিলেন, আর আমাদের যাত্রা দেখার স্বপ্নও পূরণ হলো।

শিলংয়ের পুলিশ রিজার্ভের পূজায় প্রতি বছর নবমীর রাতে কলকাতা থেকে আসা যাত্রাদলের পালা অনুষ্ঠিত হতো। অধিকাংশ সময়ই অভিনীত হতো ঐতিহাসিক যাত্রাপালা। সেই সময় যাত্রা ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। মঞ্চ ঝলমল করা আলো, কড়া মেকআপ, উচ্চস্বরে সংলাপ, মাঝে মধ্যে নৃত্য আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হতো। সেবার কোন যাত্রাপালা দেখেছিলাম, আজ আর মনে নেই। কিন্তু এটুকু মনে আছে, রাত বারোটা পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে যাত্রা দেখেছিলাম। কাহিনির নাম ভুলে গেছি, কিন্তু সেই রাতের উত্তেজনা আর আনন্দ আজও স্মৃতিতে জেগে আছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কুলজীবন পেরিয়ে কলেজে প্রবেশ করলাম। সেই সময় আমাদের বাসস্থানও বদল হলো। আমরা চলে এলাম মতিনগর এ জি কোয়ার্টারে। সেখানেও পাড়ার নিজস্ব দুর্গাপূজা ছিল। এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের আরও একটি স্বর্ণালি অধ্যায়।

মতিনগর এ জি কোয়ার্টারের পূজার প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রতিদিন সন্ধ্যারতির পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত টানা চার দিন ধরে চলত নানা ধরনের অনুষ্ঠান। ষষ্ঠীতে আগমনী, সপ্তমীতে বিচিত্রানুষ্ঠান, অষ্টমীতে বড়োদের ঐতিহাসিক নাটক আর নবমীতে আমাদের দলের হাসির নাটক। প্রতিটি দিনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে পাড়ার মানুষের মধ্যে থাকত প্রবল উৎসাহ ও আগ্রহ।

বিশেষ করে নবমীর দিন আমাদের দলের হাসির নাটক দেখার জন্য পাড়ার লোকজনের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নাটক মঞ্চস্থ করার আগে কত প্রস্তুতি, কত আলোচনা, কত মহড়া—সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক অন্য রকম আনন্দ। মঞ্চে ওঠার আগে মনে হতো, সব সংলাপ ঠিকমতো বলতে পারবো তো? দর্শকদের হাসাতে পারবো তো? আর নাটক শেষ হলে দর্শকদের হাসি, হাততালি ও প্রশংসা যেন সমস্ত পরিশ্রমকে সার্থক করে দিত। এই অভিজ্ঞতাগুলোই  জীবনের অমূল্য সম্পদ। 

আজ ভাবলে মনে হয়, পাড়ার সেই পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না; তা ছিল সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মিলেমিশে থাকার এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে ছোটো-বড়ো, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই কোনও না কোনওভাবে যুক্ত থাকতেন। কারও দায়িত্ব ছিল মণ্ডপ সাজানো, কেউ ব্যস্ত থাকতেন অনুষ্ঠান পরিচালনায়, কেউ প্রসাদ বিতরণে,কেউ নাটকের মহড়ায়, আবার কেউ দর্শকাসনে বসে শিল্পীদের উৎসাহ জোগাতেন। পূজা আমাদের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতো।

দশমী এলেই মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠতো। চার দিনের আনন্দ, হৈ-হুল্লোড়, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, রাত জেগে অনুষ্ঠান দেখা—সবকিছুর যেন অবসান ঘটতে চলেছে। মা দুর্গার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে মনেও নেমে আসতো একরাশ বিষাদ। কিন্তু আমাদের মতো তরুণদের কাছে দশমীর আরেকটি দিকও ছিল—বাঁধনহারা আনন্দ।

আমরা নেচে-গেয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় যোগ দিতাম। ঢাকের আওয়াজ, মানুষের উচ্ছ্বাস, সবার সম্মিলিত কণ্ঠে আনন্দধ্বনি—সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে উঠত উৎসবমুখর। ভাসান থেকে ফেরার সময় আমরা সমবেত কন্ঠে গাইতাম "মারে ভাসাইয়া জলে/ কী ধন লইয়া যাইমু ঘরে/ঘরে গিয়া মা বলিবো কারে/ও মা কোথায় যাবো..."এটা ছিল আমাদের সমবেত বিলাপ। মায়ের বিদায়ের কষ্ট থাকলেও তরুণ প্রাণের উদ্দীপনায় সেই দিনটি হয়ে উঠত স্মরণীয়।

বিসর্জন শেষে আবার ফিরে আসতাম প্যান্ডেলে। সেখানে শান্তিজল নেওয়ার রীতি ছিল। পাড়ার সবাই একত্রিত হতেন মণ্ডপে। আমরা প্রত্যেকের হাতে হাতে অপরাজিতা দিতাম। তারপর পুরোহিতমশাই মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, আর আমরা সবাই তাঁর সঙ্গে সমবেত কণ্ঠে মন্ত্র পড়ে হাতে অপরাজিতা ধারণ করতাম। তারপর সবাই মিলে বুঁদে নিমকি জিলিপি খেয়ে শুরু হতো বিজয়ার প্রণাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়। আমরা বড়োদেরে প্রণাম করতাম আর সমবয়সীদের সঙ্গে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করতাম।সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুত আবেগ কাজ করত মনে। উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও সবার সঙ্গে সবার সম্পর্ক যেন আরও একবার নতুন করে বাঁধা পড়তো ভালোবাসা ও শুভকামনার বন্ধনে।

এরপর পড়াশোনার পর্ব শেষ হলো। চাকরিসূত্রে শিলচরে চলে গেলাম। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষের সঙ্গে। ধীরে ধীরে বদলে গেল জীবনযাত্রা, বদলে গেল পূজা কাটানোর ধরনও। কিন্তু শৈলশহর শিলংয়ের সেই দিনগুলির স্মৃতি আজও আমার কাছে অমূল্য।

এখন পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, তখনকার আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন ছিল না। সামর্থ্য সীমিত ছিল, কিন্তু আনন্দের কোনও সীমা ছিল না। দাদার স্নেহ, বৌদির ভালোবাসা, নতুন জামাকাপড় কেনার উত্তেজনা, শারদীয়া পত্রিকার পাতায় ডুবে থাকা, দিল্লি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের জিলিপি, পাঁচ বন্ধুর একসঙ্গে প্যান্ডেল ঘোরা, পুলিশ রিজার্ভে রাত জেগে যাত্রা দেখা, মতিনগর এ জি কোয়ার্টারের নাটকের মহড়া আর দশমীর বিসর্জন—সব মিলিয়ে আমার পূজা ছিল এক আনন্দময় জীবনের প্রতিচ্ছবি।
সংগৃহিত
 

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার