মুক্তমত

মহান অভিনেতা নানা পাটেকর স্মরণে

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫০

১৯৯৬ সাল লন্ডনের অনিশ্চিত প্রবাসী জীবনের হাজারো গল্পের একটি প্রিয় গল্প। বৃটেনের দক্ষিণ পূর্বে এসেক্স কাউন্টির শহর কলচেষ্টার। যার প্রতিটি জনপদ আর শহরের কেন্দ্রস্থল মুখরিত থাকতো বৃটেনের প্যারাসুট রেজিমেন্টের স্কটিশ বংশোদ্ভুত দীর্ঘদেহী সৈনিকের দল। 

 


সেই শহরের চার্চ স্ট্রিটের বনেদী ও পুরাতন ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট কারী ইন্ডিয়াতে প্রবাসী জীবনের ২য় চাকুরী শুরু করি ১৯৯৬ সনের প্রথম থেকে। আবাসন রেস্তোরার ২য় তলায়। মালিক ছিলেন দুজন। একজন সিলেটের বনেদী পরিবারের সন্তান, উনাদের বাসা সিলেটের আম্বরখানায়। মালিকের ছোট ভাই সিলেটের প্রবীণ লীগ নেতা। যিনি এক সময় উপজেলা চেয়ারম্যানও ছিলেন। অঞ্জনই উনারই আপন ভাগিনা। দুজনই আমাকে স্নেহ করতেন সম্মান করতেন। 

 


শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ছিলো। শুক্র ও শনিবার রাতে ভারতীয় স্বাদের মশলাজাত সুস্বাদু খাবার বিশেষ করে চিকেন টিক্কা মশল্লা নামের খাবার খেতে নানা বয়সী ইংরেজ গ্রাহকদের লাইন লেগে যেতো। নিচ তলায় সুপরিসর ফ্লোরের দুই অংশে বসানো প্রতিটি টেবিল সন্ধা থেকে গ্রাহকদের হৈ—হুল্লোড় আর পরিবেশশকদের দৌড়ঝাঁপে পুরো রেস্তেঁারা মুখরিত থাকতো। ওয়েটারদের মধ্যে জগন্নাথপুর নিবাসী আশরাফ ভাই যিনি শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি ভীষন সহকর্মী বান্ধব ছিলেন। সবাইকে সমান ভাবে দেখভাল করতেন। আরেকজন সিনিয়র ওয়েটার ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব খান মামা। করাচী শহরের বাশিন্দা সব সময় হাস্যজ্জ্বল থাকতেন পাশাপাশি মজার মজার গল্প বলতেন। 

 


সহকর্মীদের মধ্যে প্রধান শেফের দেশের বাড়ি বিশ্বনাথ। ভীষন স্বাদযুক্ত ইংলিশদের পছন্দের ডিস তৈরীতে উনি ছিলেন ম্যাজিকম্যান। তান্দুরী শেফ ছিলেন বড্ড সাদাসিধে ও  চলন ও বলনে সাদা মনের একজন স্বল্পভাষী দেশি ভাই। মালিক দুজনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পুরো রেস্টুরেন্টের সকল কর্মচারীদের মধ্যে সদা ভ্রাতৃত্ব আচরন বজায় খাকতো। একে অন্যের যে কোন আপদ বিপদে সহযোগিতার হাত এগিয়ে দিতেন। 

 


রেে¯ঁÍারার উপরের তলায় ছিলো সকল কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা। আর গল্প পরিবেশনার মূল সূত্র এখানে। নীচতলার ফ্লোর থেকে উপরে ২য় তলার উঠার সিঁড়ির ডান পাশে প্রথম রুমেই ছিলো আমার বেড। জানালার পাশে আমি আর অপর পাশের দেয়াল ঘেসে থাকতেন আরো একজন। যিনি এসেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যর দেশ সৌদী আরব থেকে বৈধ ভিসা নিয়ে। নব্বই দশকের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যর তেল সম্মৃদ্ধ দেশের ধনী পরিবার প্রধান ইউরোপ বেড়াতে আসার সময় নিজ পরিবার সদস্যদের সঙ্গে বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এশিয়ান অভিবাসীদের বিশেষ করে বাংলাদেশীদের রিয়াল প্রদানের চুক্তিতে লন্ডন নিয়ে আসতেন। সেই পথ ধরে আগত  আসা দেশি ভাই ইংরেজী ভাষার কোন প্রাথমিক জ্ঞান ছাড়াই কালো কোট আর কালো টাই পরিধান করে সাহস করে নেমে গেলেন কমিওয়েটারের কাজে। 

 


ভাষার স্বল্পতা নিয়ে লন্ডনে আসা সেই দেশি ভাইয়ের নিজের বিশ্বাস ছিলো শক্ত। প্রায় বলতেন মামু, সৌদী আরব এসে ওদের ভাষা শিখেছি মাত্র ৩ মাসে। আর ইংরেজী ভাষা শিখা তো কোন কঠিন কাজ হবে না আমার জন্য।  তবে আমি সেই রেস্টুরেন্টে ছিলাম আরো ছয় মাস। সেই দেশি ভাই কিন্তু বেশি দূর এগুতে না পারলেও পরিচিত এক আত্মীয়াকে বিবাহ করতে পেরেছিলেন। 

 

 


থাকার রুমের এক পাশে টেবিলের উপর রাখা ছিলো বেশ বড় পর্দার একটি টিভি ও ভিসিআর। টিভিতে স্থানীয় চ্যানেল থেকে প্রচারিত খবরসহ নানা প্রতিবেদন দেখা যেতো। তবে ভিসিআর চালানোর জন্য ছবির ক্যাসেট কিনতে হতো ব্লকবাস্টার নামের একটি দোকান থেকে। তবে অনেক পরিচিত সহকর্মী কিম্বা স্বজনদের নিকট থেকে সংগৃহিত ভিডিও ক্যাসেটে সেই সময়ের জনপ্রিয় হিন্দী নয়তো ভারতীয় বাংলা ছবি দেখতাম কাজের শেষে। আর সেই সময়কালে সবচেয়ে অধিকবার দেখা যে ভারতীয় সিনেমা আমাকে একরকমের নেশাগ্রস্ত করেছিলো সেই ছবিটির নাম ছিলো ইশওয়ান্ত। ১৯৯৭ সালে তৈরী সিনেমার পরিচালক ছিলেন অনিল মাথো। ছবিটি আমি কমপক্ষে শতবার দেখেছি। আর শতবার মানে বার বার দেখার একটি মাত্র কারণ বহুল জনপ্রিয় সেই সিনেমার নায়ক ছিলেন উপমহাদেশের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকর। যার বাস্তবধর্মী অভিনয় দেখে আমি সেই চিত্রশিল্পী ও অভিনেতার শক্ত ভক্ত হয়ে পড়ি। যা আজ ২৯ বছর পরেও সমান সম্মান প্রদর্শন ও ভালবাসায় সেই শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকরকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও অভিবাদন। ১৯৫১ সালে জন্ম নেয়া প্রকৃতির সন্তান, সহজিয়া জীবন দর্শনে বিশ্বাসী শিল্পী নানা পাটেকর চলে গেলেন ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর। 


বিদায় হে মহান শিল্পী।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার