নদী লুট বন্ধে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান ও কঠোর আইন

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:০৯

‎জাদুকাটা, ধোপাজান ও মরা চেলা নদীতে অবৈধভাবে বালু—পাথর উত্তোলন ও পাড় কাটার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশাসনের অভিযান ও শাস্তির পরও বন্ধ হচ্ছে না নদী লুট। এই পরিস্থিতিতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিয়মিত আয়োজন ‘খবরনামা’য় এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট  মো. তৈয়বুর রহমান বাবুল এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ছদরুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জাদুকাটা, ধোপাজান ও মরা চেলা নদীর পাড় কাটার জন্য আসলে কারা দায়ী?
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: নদীগুলো খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এসব সম্পদের মজুত সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত তথ্য থাকার কথা। অথচ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়েছে। ইজারার শর্ত, সম্পদের মজুত এবং উত্তোলনের পরিমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। প্রচলিত আইন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অবৈধভাবে পাড় কাটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
‎
‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: সম্প্রতি নদীর পাড় কাটার ঘটনায় শ্রমিকদের সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাঁরা পেছনে থেকে এসব কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হন, তাঁদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দিনমজুরেরা দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরির জন্য কাজ করতে গিয়ে শাস্তির মুখে পড়ছেন। অথচ মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নদীর পাড় কাটা বন্ধ করা অনেক সহজ হবে।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। জরিমানা ও কারাদণ্ড ও দেওয়া হচ্ছে। তারপরও নদীর পাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না কেন?
‎
‎‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: প্রশাসনের অভিযানকে আমি স্বাগত জানাই। তবে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা—সংক্রান্ত প্রচলিত আইনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শাস্তির পরিমাণ সীমিত থাকলে অপরাধীরা তা উপেক্ষা করার সুযোগ পায়। একজন শ্রমিক শাস্তি পাওয়ার পর আর কাজে না গেলেও অন্য একজনকে সেখানে নেওয়া হচ্ছে। ফলে মূল অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
‎
‎শুধু অভিযান পরিচালনা করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহলে কি শুধু শ্রমিকদের শাস্তি দিয়ে নদী লুট বন্ধ করা সম্ভব নয়?
‎
‎‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: না, শুধু শ্রমিকদের শাস্তি দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। অনেক শ্রমিক জানেন না যে অবৈধভাবে পাড় কাটতে গিয়ে তাঁরা গ্রেপ্তার হলে শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। পেছনে থাকা ব্যক্তিরা তাঁদের কাজে লাগান। একজন শ্রমিক শাস্তি পেলে তাঁর জায়গায় আরেকজনকে নেওয়া হয়। তাই অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কি বালু—পাথর লুট চলছে বলে মনে করেন?
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ দেখা যায়। তবে বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে হবে না। আমার মতে, এখানে এমন একটি স্বার্থান্বেষী চক্র রয়েছে, যারা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে।
‎
‎অনেক সময় অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধিদের নাম ব্যবহার করেন। তাঁরা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসব কাজ চালিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা সবকিছু জানেন, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই কারা প্রকৃতপক্ষে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।

‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদী ও জনপদ রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু যখন কোনো এলাকায় ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। নদী ও খনিজ সম্পদ জনগণের সম্পদ। এগুলো রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে এবং অবৈধ উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
‎
‎এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সংগঠিত শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। নদী রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল তাঁদের সম্পদ দখল বা ধ্বংস করতে না পারে।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদীর পাড় কাটার কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্রে্যর কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে?
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: নদীর পাড় কাটার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জনপদের ওপর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জাদুকাটা নদীর প্রস্থ একসময় অনেক কম ছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। বর্তমানে নদীটির বিস্তৃতি অনেক বেড়েছে। তবে এ পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
‎
‎নদীর খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোথায় কতটুকু সম্পদ রয়েছে, কতটুকু উত্তোলন করা যাবে এবং কারা উত্তোলন করতে পারবেনÑএসব বিষয় রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় স্পষ্ট করা জরুরি। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অবৈধভাবে নদীর পাড় কাটার প্রবণতা কমানো সম্ভব।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?
‎
‎‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে এবং তাদের প্রচেষ্টাকে আমি সাধুবাদ জানাই। তবে প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আইনের সংশোধন, শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: এ ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনের অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নদীর খনিজ সম্পদ ঘিরে ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন মহলের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার।
‎
‎আমি এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতার কথা শুনেছিলাম, যিনি নদীর পাড় কাটা প্রতিরোধে কাজ করতে গিয়ে একাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন বলে দাবি করা হয়। তবে এ ধরনের অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, নদী রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনারা পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করছেন। নদী লুট বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
‎
‎‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: আমরা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। প্রচার—প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে নদীর পাড় কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানাচ্ছি। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
‎
‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদী লুট বন্ধ এবং নদী রক্ষায় এখনই কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
‎
‎‎তৈয়বুর রহমান বাবুল: জাদুকাটা, ধোপাজান ও মরা চেলা নদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি ও আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনার ব্যবস্থা থাকলে অবৈধ কর্মকাণ্ড কমতে পারে।
‎
‎একই সঙ্গে আইনের সংশোধন, শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অপরাধের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা জরুরি। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
‎
‎সাইফুল ইসলাম ছদরুল: আধিপত্যের বিপরীতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে তুলতে হবে। নদী ও খনিজ সম্পদ জনগণের সম্পদ। এগুলো রক্ষার দায়িত্বও জনগণের। কিন্তু বর্তমানে কিছু এলাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ ভয়ের কারণে নদী রক্ষার কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী হন না।
‎
‎সম্প্রতি জাদুকাটা নদী এলাকায় কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ও চাপের কারণে তা নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় নি বলেও আমার অভিজ্ঞতা আছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে নদী রক্ষায় আন্তরিক ব্যক্তিদের সোচ্চার হতে হবে। স্থানীয় জনগণের ঐক্য ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নদী লুটের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার