প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১২
মরমি কবি দেওয়ান হাসন রাজার গান ও দর্শন আজও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে। ‘লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার’—এমন কালজয়ী গানের স্রষ্টার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাসভবন ও মিউজিয়াম দেখতে ছুটে আসছেন বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা। দুর্গাপূজার লম্বা ছুটিতে পরিবার—পরিজন নিয়ে এখানে আসছেন সময় কাটাতে—হাসন রাজাকে জানতে। মরমি কবির ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, ব্যক্তিগত সামগ্রী, ছবি, গান ও বংশপরিচয়ের তথ্য দেখে আনন্দিত হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। তবে তাদের কারও কারও মতে, ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও প্রদর্শনব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে মিউজিয়ামটি হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসনরাজা মিউজিয়ামে আসছেন বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থী। কেউ মরমি কবির ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র ও ব্যক্তিগত সামগ্রী দেখছেন, কেউ পড়ছেন তাঁর জীবন ও বংশপরিচয়সংক্রান্ত তথ্য। আবার কেউ স্মৃতিচিহ্নগুলোর ছবি তুলছেন। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও কুমিল্লা, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পরিবার—পরিজন নিয়ে এসেছেন অনেকে।
১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দেওয়ান হাসন রাজা। ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর গান ও মরমি দর্শনে ফুটে উঠেছে জীবন, জগৎ, আত্মোপলব্ধি ও আধ্যাত্মিকতার নানা দিক। সহজ ভাষায় রচিত তাঁর গান বাংলার লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সৃষ্ট গান আজও লোকসংগীতপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত।
হাসন রাজার সেই জীবন ও সৃষ্টির স্মৃতি ধরে রাখার অন্যতম স্থান এই মিউজিয়াম। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে কবির ছবি, গান, বংশপরিচয় এবং ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। দর্শনার্থীদের কাছে এসব নিদর্শন কেবল পুরোনো স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং মরমি কবির জীবন ও ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানার সুযোগ।
কুমিল্লা থেকে আসা দর্শনার্থী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, মরমি কবি হাসন রাজার বাড়ি দেখার জন্যই এতো দূর এসেছি। এত দিন বইপত্র ও গানে ওনার সম্পর্কে জেনেছি। এবার বাস্তবে কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। এতে ভালো লেগেছে এবং আসাটা সার্থক হয়েছে বলে মনে করছি।
তবে সংগ্রহশালার সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ভেতরের কিছু জায়গা আরও পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। প্রবেশমূল্য হিসেবে ৩০ টাকা নেওয়া হলেও, সেই অনুযায়ী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মান আরও উন্নত করা উচিত। এতে দর্শনার্থীরা আরও ভালোভাবে ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারবেন এবং পর্যটকের সংখ্যাও বাড়বে।
ঢাকা থেকে পূজার ছুটিতে সুনামগঞ্জ ঘুরতে আসা দর্শনার্থী আফরিন বলেন, হাসন রাজার বাড়িতে এবারই প্রথম এসেছি। কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং যেসব বাদ্যযন্ত্র দিয়ে তিনি গান গাইতেন, সেগুলো নিজের চোখে দেখে ভালো লেগেছে।
তবে আমার প্রত্যাশা ছিল, ঐতিহাসিক বাড়িতে আরও বেশি স্মৃতিচিহ্ন ও তথ্য দেখতে পাবেন। আফরিন বলেন, হাসন রাজা সম্পর্কে আগে থেকে যতটা ধারণা ছিল, সেই তুলনায় এখানে আরও বেশি কিছু দেখার প্রত্যাশা করেছিলাম। কবির জীবন, গান ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও নিদর্শন এবং তথ্য প্রদর্শন করা হলে দর্শনার্থীরা তাঁকে আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারতেন।
আফরিন আরও বলেন, পূজার ছুটিতে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরেছি। এর মধ্যে জাদুকাটা, নীলাদ্রি লেক, শিমুল বাগান ও বারেক টিলা রয়েছে। এবার শহর ঘুরতে এসে হাসনরাজা মিউজিয়াম দেখতে এসেছি। জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বম্ভরপুর থেকে আসা মোহাম্মদ বদরুল আলম বলেন, এখানে হাসন রাজার জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ, ছবি, গান ও বংশপরিচয়সহ বিভিন্ন তথ্য দেখতে পেয়েছি। এ ছাড়া কবির ব্যবহৃত হারমোনিয়াম, একতারা, হুক্কা এবং তাঁর স্ত্রীর ব্যবহৃত কলসিসহ বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এসব দেখে হাসন রাজার জীবন ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগেও আমার এখানে আসা হয়েছে, সেই তুলনায় এখন কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। হাসন রাজার স্মৃতিগুলো আবার দেখতে, তাঁকে নতুন করে স্মরণ করতে এবং কিছুটা বিনোদনের জন্য বারবার এখানে আসতে ইচ্ছে করে। এবার সঙ্গে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। স্ত্রীও হাসন রাজার স্মৃতিচিহ্ন দেখার ব্যাপারে আগ্রহী।
মিউজিয়ামের পরিবেশ সম্পর্কে মোহাম্মদ বদরুল আলমের স্ত্রী মোছা. নাজমা বেগম বলেন, এখানকার পরিবেশ খুব শান্ত ও সুন্দর। জায়গাটিকে ছোটখাটো একটি পার্কের মতো মনে হয়েছে। তিনি হাসন রাজার ভক্ত হওয়ায় বারবার এখানে ছুটে আসতে মন চায়। জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করতে সৌন্দর্যবর্ধন, উন্নত মানের ফুলের গাছ লাগানোসহ কিছু উন্নয়ন করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে এবং জায়গাটি আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
দর্শনার্থীদের এসব প্রত্যাশার বিষয়ে হাসন রাজার বংশধর দেওয়ান গনিউল সালেউদ্দিনের ছেলে দেওয়ান মাহদীন রাজা চৌধুরী বলেন, মিউজিয়ামে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন দর্শনার্থী আসেন। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও বিদেশ থেকেও অনেকে আসেন। পরিবার—পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে হাসন রাজার জীবন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা হওয়ায় কেউ কেউ তা বেশি মনে করছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিকিটের মূল্য ৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০ টাকা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ সহজে হাসন রাজার বাড়ি ও সংগ্রহশালা পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন এবং মরমি কবির জীবনদর্শন সম্পর্কে জানতে পারবেন।
দেওয়ান মাহদীন রাজা চৌধুরী আরও বলেন, মিউজিয়াম পরিচালনা, কর্মীদের বেতন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত খরচ রয়েছে। প্রবেশমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়। অতীতে কম প্রবেশমূল্যের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত লোকজনের সমাগমের কারণে পরিবেশ ও নিরাপত্তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। বর্তমানে পরিবারবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিশুদের কাছ থেকে টিকিট নেওয়া হয় না। আবার পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বিবেচনায় ছাড় দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, মিউজিয়ামের কার্যক্রম এখনো চলমান। সংগ্রহশালাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং সংস্কারকাজের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য আরও সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন