আশ্রয় থেকে সংসারে শারমিন

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৪

একসময় হারিয়ে গিয়েছিল পথ। চেনা ছিল না ঠিকানা, পাশে ছিল না আপনজন। চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে চলে এসেছিল সুনামগঞ্জের ছাতকে। সেখান থেকে শুরু হয় নতুন এক আশ্রয়ের খেঁাজ। সেই যে সরকারি শিশু পরিবারে ঠাঁই হলো, সেখানেই কেটে গেল জীবনের প্রায় ১২ বছর।

 


এত দিন যে প্রতিষ্ঠান ছিল তার আশ্রয়, সেই আঙিনাতেই এবার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো শারমিন আক্তারের। ধুমধাম করে বিয়ে হলো তাঁর। আনন্দ—উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠল সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবার। বিয়ের অতিথি হয়ে এলেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিশিষ্টজনেরা। দোয়া ও আশীর্বাদে নবদম্পতিকে ভরিয়ে দিলেন সবাই।
শারমিনের জন্ম ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। বাবার নাম জাকির মিয়া, মা হাছিনা বেগম। প্রায় ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালে ছাতক থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) থেকে তাঁর বাবা—মায়ের নাম জানতে পেরেছিল সরকারি শিশু পরিবার। তখন চট্টগ্রাম থেকে পথ হারিয়ে ট্রেনে করে ছাতকে এসেছিল ছোট্ট শারমিন।

 


ছাতক থানা পুলিশ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রথমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় সিলেটের একটি সেইফ হোমে। পরে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন, তাকে শিশু পরিবারে রাখা হবে। কিন্তু সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে তখন কোনো আসন খালি ছিল না। ফলে ২০১৫ সালের ১৬ মার্চ শ্রীমঙ্গল শিশু পরিবারে আশ্রয় হয় তাঁর।
সেখানে কেটে যায় দুই বছর। পরে আসন খালি হলে শারমিনকে নিয়ে আসা হয় সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে। এই প্রতিষ্ঠানের পাশের আব্দুল আহাদ ও শাহিদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সে। আশ্রয় থেকে বেড়ে ওঠা, শৈশব থেকে কৈশোর—জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কেটেছে শিশু পরিবারের স্নেহছায়ায়।

 

 

 

 

 

 


এখন শারমিনের বয়স ১৯ বছর। জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের পছন্দেই জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছেন তিনি।
শাল্লা উপজেলার পশ্চিম নিয়ামতপুর গ্রামের ইয়াকুব আলী ও নাছিমা আক্তারের ছেলে মুজাহিদুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয় শারমিনের। ২১ বছর বয়সী মুজাহিদুল সুনামগঞ্জ শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করেন। পরিচয় থেকে সম্পর্ক, আর সেই সম্পর্কের পরিণতি বিয়ে।

 


শারমিন ও মুজাহিদুলের বিয়েকে ঘিরে যেন নিজের ঘরের মেয়ের বিয়ের আনন্দে মেতে উঠেছিল পুরো শিশু পরিবার। সেখানে থাকা ৫৭ জন শিশু—কিশোরীর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে যোগ দেন এই পরিবারের সাবেক বাসিন্দারাও। তাঁদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য এখন প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন। সবার উপস্থিতিতে আনন্দঘন হয়ে ওঠে বিয়ের আয়োজন।


শিক্ষার্থী আসমা আক্তার, তানিয়া, সোনিয়া ও ফাতেমা আক্তার বললো, আমরা সরকারি শিশু পরিবারের নিবাসী। আমাদের বড় বোন শারমিন আপুর বিয়ে উপলক্ষে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে এমন আয়োজন এটাই প্রথম। তাই দিনটি আমাদের কাছে বিশেষ ও স্মরণীয়। আজকের সুন্দর আয়োজন, সাজসজ্জা এবং সবার উপস্থিতি আমরা খুবই উপভোগ করছি। শারমিন আপুর সঙ্গে আমরা এতদিন একসঙ্গে থেকেছি। আজ তিনি নতুন জীবনে পা রেখে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, এটা ভাবলে খুব কষ্ট হচ্ছে। আবার তাঁর নতুন জীবনের সূচনা উপলক্ষে আমাদের আনন্দও হচ্ছে। আমরা সবাই তার সুখী ও সুন্দর দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করি।

 


জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুর রশিদ বলেন, লায়ন্স ক্লাবের পক্ষ থেকেও এখানে এসেছি। এখানে এসে ভালো লাগছে। মা—বাবাহীন একজন মেয়েকে যেভাবে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আনন্দঘন পরিবেশে বিয়ের মাধ্যমে নতুন জীবনে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। 
জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক এবং আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি এ টি এম হেলাল বললেন, মা—বাবা, আত্মীয়হীন একজন মেয়ে আজ বিয়ের মাধ্যমে নতুন সংসারজীবনে পদার্পণ করছেন। তার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হতে পেরে ভালো লাগছে। আমি মনে করি, সমাজের প্রতিটি স্তরে যারা অভিভাবকহীন, অসহায় ও সহায়—সম্বলহীন অবস্থায় রয়েছেন, তাদের পাশে আমাদের সবার দাঁড়ানো উচিত। স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাড. নুরুল ইসলাম নুরুলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন জেলা যুবদলের দপ্তর সম্পাদক মো. শাহ আলম। তিনি বলেন, গরিব, এতিম ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে এমপি মহোদয়ের উদার মানসিকতা রয়েছে। তিনি আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। আমি নবদম্পতির সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন কামনা করছি।

 


বর মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামে। কনের যে বাবা—মা নেই, তা জেনেশুনেই আমি তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ থেকে আমার নিজের বাবা—মা’ই শারমিনের বাবা—মা হিসেবে থাকবেন। আমাদের নতুন দাম্পত্য জীবন যেন সুখের হতে পারে, সে জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই। কনে শারমিনও এসময় সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য সকলের দোয়া চান। 
সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. শামসুল হক বললেন, এতিম এই মেয়েটির নিজের কোনো বাবা—মা না থাকলেও, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সমাজের বিত্তবান ও সৌভাগ্যবান মানুষদের সহযোগিতায় সে আজ অভিভাবক বা বাবা—মা পেয়েছে। পিছিয়ে পড়া ও এতিম শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগটি সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয় একটি কাজ। 

 


সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক তাসলিমা আক্তার বলেন, সরকারি শিশু পরিবারে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত থাকার সুযোগ রয়েছে। এরপর একজন নিবাসীকে নতুন জীবনে এগিয়ে যেতে হয়। আমরা চাই, এখান থেকে চলে যাওয়ার পরও তারা যেন নিজেদের একা মনে না করে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। এই বিয়ের আয়োজন বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, এমপি মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে পেরেছি। 

 


জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, এ ধরনের একটি মহৎ ও মানবিক আয়োজনের সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে গর্বিত ও সম্মানিত মনে করছি। একটি নতুন জীবন শুরু করার এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নবদম্পতির জন্য আমার আন্তরিক শুভকামনা রইল। আমি দোয়া করি, শারমিন ও মুজাহিদ যেন সুখ, শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে একটি আনন্দময় দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারে। 

 


সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে ঘটা করে বিয়ের আয়োজন এবারই প্রথম। তাই এই আয়োজন শুধু একটি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রতিষ্ঠানটির জন্যও এক স্মরণীয় ঘটনা। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বলেন, কল্যাণ তহবিলের কিছু টাকা এবং নানা হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতায় এই আয়োজন করা হয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার