প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:১৯
একদিন পথ হারিয়ে আশ্রয় খুঁজেছিল ছোট্ট শারমিন। সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে কেটেছে তাঁর প্রায় ১২ বছর। সেই প্রতিষ্ঠানের আঙিনাতেই ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছে তাঁর। আনন্দের এই ঘটনা সামনে এনেছে আশ্রয়কেন্দ্রের শিশুদের ভবিষ্যৎ, অধিকার ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন। শিশুদের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বিতা এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনে তরুণীদের স্বাধীনতা নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’এর সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সরকারি শিশু পরিবারে ধুমধাম করে শারমিনের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজন আমাদের কী বার্তা দেয়?
গৌরী ভট্টাচার্য: একটি জেলায় সরকারি শিশু পরিবার রয়েছে, যা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শারমিন প্রায় ১২ বছর ধরে সেখানে ছিল। তাঁর বিয়েতে বিশিষ্টজন, প্রশাসন ও শিশু পরিবারের কর্তৃপক্ষ যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। শিশুরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে থাকলেও তারা একটি পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। তাদের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, এই আয়োজন তার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আশ্রয়কেন্দ্রের শিশুদের মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে বলে মনে করেন?
গৌরী ভট্টাচার্য: আমি ব্যক্তিগতভাবে শিশু পরিবারে যাই নি। তবে আশাবাদী যে সরকারি তত্ত্বাবধানে সেখানে শিশুদের বসবাস ও মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তারা সমাজের বাইরে নয়। একসময় তারা শিশু পরিবার থেকে বের হয়ে সমাজের মূল স্রোতে মিশবে এবং সমাজে অবদান রাখবে। তাই তাদের অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করা প্রয়োজন?
গৌরী ভট্টাচার্য: সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের আবাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে বলে আমি মনে করি। এখন পর্যন্ত শিশু পরিবার থেকে বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতার খবর আমার জানা নেই। আমাদের সমাজের একটি ভালো দিক হলো, অনেকে নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠান বা জন্মদিনে শিশু পরিবারের শিশুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন, তাদের খাবার দেন এবং পাশে দাঁড়ান। এই মানবিক তাগিদ সবার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে সমাজের মানুষের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিশুদের মানসিক বিকাশে স্নেহ, ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন কতটা জরুরি?
গৌরী ভট্টাচার্য: শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে স্নেহ—ভালোবাসা অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিশু মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু শুধু জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকেই যে স্নেহ পেতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। আমরা যারা সমাজে আছি, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর। ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থনের মাধ্যমে তাদের জীবনের শূন্যতা দূর করতে হবে, যাতে তারা মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
শিশু পরিবারের পাশে থাকা আমাদের সবার দায়িত্ব। সেখানে একটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে বলে আমি জানি। এটি চালু হলে সেখানে বসবাসকারী বয়স্ক নারীদের সঙ্গে শিশুদের একটি পারিবারিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। এতে শিশু ও বয়স্ক নারী—উভয়েই উপকৃত হবেন বলে আশা করি। আমি চাই, শান্তিনিবাস দ্রুত চালু হোক এবং শিশুদের জীবনে স্নেহ—ভালোবাসার পরিসর আরও বিস্তৃত হোক।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিশুদের স্বাবলম্বী করতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
গৌরী ভট্টাচার্য: শিশু পরিবারে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, নাচসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের প্রতিভা দেখেছি। তাদের এসব প্রতিভা বিকাশের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে শিশু পরিবারের মেয়েদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যেক মেয়ের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর জীবনসঙ্গী নির্বাচনে তরুণীদের স্বাধীনতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গৌরী ভট্টাচার্য: আমি সব সময় মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তরুণীদের স্বাধীনতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তরুণীকে ভাবতে হবে, নিজের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে গিয়ে যেন তাঁর জীবন বিপন্ন না হয়। জীবনসঙ্গীর যোগ্যতা, পারিবারিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎÑএসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিশু পরিবারে থাকা মেয়েদেরও বাস্তবতার আলোকে প্রস্তুত করতে হবে। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শারমিনের বিয়েতে মানুষের সহযোগিতা সমাজের জন্য কী দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে?
গৌরী ভট্টাচার্য: অনেক সময় শিশু পরিবারের শিশুদের পরিচয়কে আমরা সংকীর্ণভাবে দেখি। কিন্তু শারমিনের বিয়েতে যেভাবে প্রশাসন, বিশিষ্টজন ও অন্যরা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা আমাদের উদারতা ও মানবিকতার পরিচয় দেয়। একটি ছেলে ও মেয়ের জীবনে বিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। শারমিনের বিয়েটিও যেন তাঁর জীবনে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকে এবং তিনি সেই স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।
তবে শুধু শারমিনের পাশে দাঁড়ালেই হবে না। আমাদের সমাজে আরও অনেক শারমিন রয়েছে, যারা নানা কারণে পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। তাদের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। শারমিনের বিয়েতে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। এ ধরনের ভালো উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শিশু পরিবারের মেয়েদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কী করতে পারে?
গৌরী ভট্টাচার্য: শিশুদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো প্রয়োজন। কোনো বিপদের মুখে পড়লে তারা যেন নিজেদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে, সে জন্য তাদের সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের উন্নত শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিশু পরিবারের মেয়েদেরও সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে, যাতে তারা অবহেলার শিকার না হয় এবং নিজেদের যোগ্যতায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
অবহেলায় জীবন থেমে যায় না। সঠিক সুযোগ, সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেলে শিশুরাও সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তাদের জন্য সেই সুযোগ তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
গৌরী ভট্টাচার্য: আপনাদেরও ধন্যবাদ। আমি চাই, শিশুরা যেন তাদের অধিকার পায়, রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে এবং সমাজের কেউ যেন তাদের অবহেলার চোখে না দেখে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন