প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৫
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল নিয়ে অভিযোগ—অতৃপ্তির অভাব নেই। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৯০০ থেকে হাজার রোগীকে সেবা দিতে গেলে যে সমস্যার অন্ত থাকবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তদুপরি চিকিৎসকের বহু পদ শূন্য। ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার অবস্থা সুনামগঞ্জ জেলার সর্ববৃহৎ এই চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রটির। চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা ত্যক্ত—বিরক্ত, ক্ষুব্ধ—বিক্ষুব্ধ হন; রোগীর স্বজনরা মাঝেমধ্যেই হৈ—হল্লা করেন। কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত এই হাসপাতালটিরই বা কী করার আছে ? সেবাসংক্রান্ত সমস্যাদির সাথে বহুলশ্রম্নত একটি বিপত্তির নাম লিফট। আটতলা ভবনের উপরের দিকের ফ্লোরে রোগী ও স্বজনসহ চিকিৎসাকর্মীদের লিফট ছাড়া যাওয়া কষ্টকর। অথচ হাসপাতালের স্বয়ং আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ভয়ে এই লিফটে উঠেন না। তিনি সিঁড়ি বেয়ে যখন যে ফ্লোরে যাওয়া দরকার যান। এই যখন অবস্থা তখন হাসপাতালে থাকা লিফটের কার্যক্ষমতা কেমন তা বুঝতে আর কিছু বাকি থাকে ? ২০১২ সনে আটতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এই ভবনের মাধ্যমেই আগের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু ২০১২ সন থেকেই হাসপাতালের লিফটের সমস্যা। প্রায়ই বিকল থাকে উপরে উঠার এই যন্ত্রটি। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন দিলেই কি কেউ সুলোচন হতে পারে কেউ ? অবস্থা তথৈবচ বলেই ১০০ শয্যার হাসপাতালও ২৫০ শয্যার মানে উঠতে পারেনি। এর উপর রয়েছে প্রায় তিন গুণ অতিরিক্ত রোগীর চাপ। হাসপাতালের আরএমও বলছিলেন, হাসপাতালে ৯ শ’ রোগী ভর্তি থাকলে গড়ে প্রতিজনের সাথে ৩ জন স্বজন থাকলে হাসপাতালে প্রতিদিন দুই হাজার ৭০০ লোকের চাপ থাকে। সকলেই লিফটে চড়তে চান। দু’তলা বা তিন তলা অব্দিও কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠার কষ্ট করতে রাজি নন। স্বভাবতই লিফটের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ে। যন্ত্র তো। বিকল হতেই পারে। তার উপর যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে যা হয় এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সরকারি কাজ প্রক্রিয়া ও বিধি মেনে করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু অসুস্থ রোগী ও স্বজনরা এই দীর্ঘসূত্রিতা বুঝবেন কেন ? চটজলদি সেবা ও সুবিধা দেখতে চান সকলে। এই হাসপাতাল না সেবা দিয়ে এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে, না পারছে পরিচ্ছন্ন রাখতে পরিবেশ, না পারছে সদা—সর্বদা লিফট সচল রাখতে। গণপূর্ত বিভাগের অভিমত, লিফটগুলো এখনও অকেজো ঘোষণার উপযুক্ত না হলেও তার দ্বারপ্রান্তে। ২০২২ সনের বন্যার সময় লিফটগুেলো পানিতে ডুবেছিলো। তখনই নাকি মহাসর্বনাশ হয়েছে এই যন্ত্র—সিিঁড়র। ২০২২ সনের বন্যা এখন অতীত। কিন্তু এর চিহ্ন রেখে যাওয়া লিফট এখনও মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে বর্তমান।
নিয়ম অনুসারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। প্রায়শঃই নষ্ট থাকা লিফটের মেরামতের বিষয়ে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনামগঞ্জের খবরকে বলছিলেন, ‘গেল সোমবার ও মঙ্গলবার আলাদা আলাদাভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে নতুন লিফটের বরাদ্দ ও মেরামত বাবদ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে’। এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে...। যে লিফট বছরের পর বছর ধরে যথাযোগ্য সার্ভিস দিতে পারছে না সেই লিফট মেরামতের জন্য মাত্র ‘গেল সোম ও মঙ্গলবার’ চিঠি দেয়া কেন ? এই হচ্ছে সরকারি কাজের প্রক্রিয়াগত বাস্তবতা। কোথায় কখন জরুরিভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দরকার তারও কোনো পূর্বশর্ত নেই। এই লিফট বন্ধ হয়ে নাকি অনেক সময় লোকজনের আতঙ্কের কারণ হয়। বিদ্যুৎচালিত লিফট। বিদ্যুৎ বন্ধ হলে (যা এখনকার নৈমিত্তিকতা) জেনারেটর চালু করে আটকে পড়া লিফট চালু করতে ৮/১০ মিনিট সময় নাকি লেগে যায়। এই সময়টুকু লিফটে আটকে থাকা লোকজনের অনেকেরই ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যায়। হওয়ারই কথা। চিন্তা করুন— আটকে পড়াদের দলে যদি কোনো মুমূর্ষু রোগী, সন্তানসম্ভবা মা থাকেন তখন পরিস্থিতি কেমন হতে পারে ? অথবা মনে করুন একজন চিকিৎসাকর্মী অতি প্রয়োজনীয় কোনো উপকরণ নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে যাচ্ছিলেন, তিনি ৮/১০ মিনিট আটকে থাকলেন; তখন অপরেশনের রোগীর কী পরিণতি হতে পারে ?
সদর হাসপাতালে এখন যে দু’টি লিফট আছে সেগুলোর পরিবর্তে নতুন লিফট লাগানো যেমন জরুরি তেমনি আরও অন্তত দু’টি ক্যাপসুল লিফটের ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সমান আবশ্যক। হাসপাতালটি আমাদের সুস্থ্য থাকার অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠানটি নিজে নিরোগ থাকুক সবদিক থেকে; এটি সকলের কামনা। যাঁরা প্রতিষ্ঠানকে সুস্থ্য রাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত তাঁরা যদি ঘুমিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের এই আর্তনাদ বাতাসে বারেবারেই মিলিয়ে যাবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন