প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪১
ঘুষের টাকার ভাগ—বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে তাহিরপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন ও অফিস সহকারি সাইফুল ইসলামের মধ্যে হাতাহাতি বা ঘুসাঘুসির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। বিষয়টি আমাদের সরকারি দপ্তরসমূহের বেপরোয়া দুর্নীতি ও দুর্বিনীত অনিয়মের বহিঃপ্রকাশ। ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) দপ্তরাধীন উত্তর বীরনগর সততা মহিলা উন্নয়ন সমিতিকে ২২ হাজার টাকার একটি চেক দেয়া হয়। এই টাকার ভাগ নিতে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সমিতিতে গেলে সদস্যরা ভাগ দিতে অস্বীকার করেন। সমিতির সদস্যরা তখন অফিস সহকারির বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ারও অভিযোগ করেন। পরে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অফিসে এসে অফিস সহকারির সাথে বিতণ্ডায় লিপ্ত হন, যার পরিণতিতে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মহিলা বিষয়ক অফিসের দীর্ঘদিনের ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়ম—দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলো। বলাবাহুল্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমঝোতার ভিত্তিতে ঘুষের লেনদেন হলেও অবস্থাদৃষ্টে বুঝা যায়, তাহিরপুরের মহিলা বিষয়ক কার্যালয় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। উত্তর বীরনগর সততা মহিলা উন্নয়ন সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা প্রদত্ত চেকের তিন ভাগের এক ভাগ অফিসকে দেয়ার জন্য বলেন। সমিতির সদস্যরা তাতে রাজি হননি। কেন রাজি হবেন ? সদস্যরা সম্ভবত ফেরৎযোগ্য ক্ষুদ্রঋণ হিসেবেই এই টাকা এনেছিলেন। ঋণ নিয়ে যদি তার এক তৃতিয়াংশ ঘুষ দিতে হয় তাহলে সদস্যরা নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন করবেন কীভাবে আর ঋণের টাকা ফেরৎই দিবেন কীভাবে ? ঘুষের বিনিময়ে মহিলা বিষয়ক কার্যালয় যে ঋণ দিয়ে যাচ্ছে তা ফেরৎ পাওয়া কঠিন বিষয় বটে। মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই সমিতিতে ইতোপূর্বে ২১ জন মহিলাকে ২৫ হাজার টাকা করে ঋণ দেয়া হয়েছিলো। তখন অফিস সহকারি প্রতি সদস্যার নিকট থেকে ১ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন, বলেন তিনি। তবে তখন তিনি স্বয়ং এই ২১ মহিলার কাছ থেকে কতো টাকা নিয়েছেন সেই গোমর ফাঁস করেননি। জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুনামগঞ্জের খবরকে জানান, বর্ণিত কর্মকর্তা ও অফিস সহকারির বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে। একাধিকবার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হয়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা—কর্মচারির বিরুদ্ধে এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ দেয়ার পরও ব্যবস্থা গ্রহণ না করার দৃষ্টান্ত সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা—কর্মচারিকে যে চরম বেপরোয়া করে তুলেছে তাতে সন্দেহ নেই। বুঝা যায় দুর্নীতির এই চক্র কেবল একটি উপজেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শিকড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাহিরপুর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘুষের টাকার ভাগ—বাটোয়ারা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদটি অতি দ্রুত আমলে নিয়ে এর দৃষ্টান্তমূলক প্রতিকার আবশ্যক। সরকারি ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের আদায় হার হতাশাজনক। এই পরিস্থিতির জন্য যে কর্মকর্তা—কর্মচারিদের দুর্নীতিগ্রস্ততা সরাসরি দায়ী সে বিষয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারিদের কারণে সরকারের ভালো ভালো কর্মসূচি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ খঁুটির জোরে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সরকারি প্রকল্পগুলো যে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরাতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যর্থ হচ্ছে তা অনেকটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। সরকারকে এই জায়গায় নজর দিতে হবে। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিতে না পারলে ব্যর্থতার এই বৃত্ত কেবল বাড়বেই। সাথে সাথে পরিপুষ্ট হতে থাকবে দুর্নীতিবাজরা।
সরকারি অফিসের দুই পদধারীর মারামারিতে লিপ্ত হওয়া সরকারি কর্মচারি আইন অনুসারে গুরুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এটি ফৌজদারি অপরাধও বটে। পাশাপাশি এখানে যেহেতু দুর্নীতির প্রত্যক্ষ উপাদান আছে সেহেতু এটি দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধেয় বিষয়ও বটে। সুতরাং এখানে তড়িৎ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও দুদকের জরুরি তৎপরতা কাম্য। জেলার উপপরিচালক ওই কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো সত্ত্বেও কেন কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না তাও সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার। বিষয়টি কেবল নির্দিষ্ট অফিসের ছোট্ট একটি ঘটনার নিষ্পত্তি নয়, বরং এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো সরকারি দপ্তরসমূহের ঘুষ—সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা প্রদানে সরকারের তৎপরতা কাম্য। নতুবা বহু গভীরে দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষের যে শিকড় গেঁথে গেছে তা উৎপাটন করা কখনও সম্ভব হবে না।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন