প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৪
দফায় দফায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর পর এখনও সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতাদের বাড়তি দাম দিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের নিকট থেকে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এলপিজি’র এই অস্থির বাজারে এখন নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে এলপিজি ব্যবসায়ীদের দুই দিন বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা। গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান সোমবার ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁদের দাবির সমর্থনে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়ার ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি হলো— সিলিন্ডার প্রতি বর্তমান কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাধ্যমে এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা দান, সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির সিলিন্ডার সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কর্তৃক রিফিল করা, চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করা, ন্যায্য পরিবহন ভাড়া প্রদান প্রভৃতি। গত ৪ অক্টোবর সরকার আরেক দফা মূল্য বৃদ্ধি করে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাজারে এই মূল্যে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ভোক্তাদের কিনতে হয় ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত মূল্যের চাইতেও ৪ থেকে ৬ শ’ টাকা বেশি দাম দিয়ে ভোক্তাদের তা কিনতে হয়। এখন পরিবেশক বা ডিলারদের দাবিমতে কমিশন বাড়ানো হলে আরেক দফা মূল্য বৃদ্ধি এবং খুচরা বাজারে ততোধিক বেশি দাম দিয়ে সিলিন্ডার কেনার বাস্তবতা তৈরি হবে। কয়েকদিন আগে বাজার থেকে এলপিজির সিলিন্ডার গায়েব হয়ে গিয়েছিলো। দাম বাড়ানোর জন্য সরকারকে চাপ দেয়ার লক্ষেই এই কারসাজি করা হয়েছিলো। এখন আরেকটি নতুন কারসাজি করার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে। তাই এলপিজির বাজার সহনশীল পর্যায়ে রাখার জন্য সরকারকে বিকল্প চিন্তা—ভাবনা নিয়ে এগোতে হবে। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর কবল থেকে অপরিহার্য এই নিত্যপণ্যের বাজারকে মুক্ত করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের দাবি যৌক্তিক নাকি অযৌক্তিক— এই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, তাঁরা সরকারকে চাপে ফেলতেই বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কমিশন বাড়ানোসহ অন্যান্য দাবি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে ব্যবসায়ী নেতারা আলাপ—আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারতেন। তা না করে তাঁরা বাজার অস্থির করার অসৎ উদ্দেশ্যে মেতেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের যে দাম এখন ১৮৩৭ টাকা সেই সিলিন্ডারের দাম ভারতের কলকাতায় ১০৪৪ টাকা, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় তা ১৪০০ টাকা। এমনকি তীব্র মূল্যস্ফিতি ও দুর্বল অর্থনীতির দেশ পাকিস্তানে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে খরচ করতে হয় বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫০০ টাকার কম। এ সকল দেশও এলপিজি বাইরে থেকেই আমদানি করে বিক্রি করে। বাংলাদেশের নিকটবর্তী এইসব দেশ যদি কম দামে ভোক্তাদের গ্যাস দিতে পারে তাহলে বাংলাদেশ তা পারছে না কেন ? এই গুরুতর প্রশ্নের উত্তর মেলানো অতিশয় কঠিন। জানা যায়, বাংলাদেশের খুচরা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে যেভাবে সিলিন্ডার কিনতে হয় ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা পাকিস্তানে সে রকম নয়। ওইসব দেশে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত মূল্যেই খুচরা বাজারে এলপিজি কেনা যায়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যে অতিশয় মুনাফাখোর এবং দেশের বাজার ব্যবস্থা যে খুব বেশি গণবিমুখ এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বাজারের এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসন কমাতে হলে সরকারের বিকল্প আমদানি ও সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
এলপিজির ব্যবসায়ীরা যে দাবিনামা সামনে রেখে বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন, সরকারকে কালবিলম্ব না করে সেখানে হস্তক্ষেপ করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এছাড়া পাশ^র্বর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির অতিরিক্ত মূল্য এবং খুচরা পর্যায়ে সরকারি দামে এলপিজি না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে তা নিরসনে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই। দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজির উপর নির্ভরশীল। এই গ্রাহকদের পরিবারকে বিবেচনায় নিলে ভূক্তভোগী জনসংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি। এতো বিশাল সংখ্যক মানুষের জীবনে নিত্যদুর্ভোগ তৈরিকারী অস্থির এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা না করা গেলে তা হবে পরিহাসের শামিল। অর্থগৃধ্নু অসৎ ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরা না গেলে আমজনতার দৈনন্দিন দুর্ভোগের দায় সরকারের ঘাড়েই চাপবে— এ কথাটি মনে রাখা আবশ্যক।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন