প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৩০
রাশিয়ায় মানবপাচারের মাধ্যমে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেয়ার কয়েকটি ঘটনা ইতোপূর্বে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। এ সব ঘটনায় কয়েকজন বাংলাদেশির নির্মম মৃত্যু ঘটেছিলো। মানবপাচারকারীরা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে এঁদের রাশিয়া পাঠিয়েছিলো উন্নত কর্মসংস্থানের কথা বলে। বাংলাদেশের কর্মহীন তরুণ—যুব সম্প্রদায় নিজের জীবন গঠন ও পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে দলে দলে বিদেশ যাওয়ার জন্য উন্মুখ। মানুষের এই বিপুল চাহিদাকে ব্যবহার করে অনেক প্রতারকচক্র বিদেশে মানুষ পাঠিয়ে তাঁদের সুখস্বপ্ন হত্যার পাশাপাশি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। গতকাল দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটেলিয়ান (এসআরবি) রাশিয়ায় মানব পাচারের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণামূলক ঘটনা সামনে এনেছে। সংবাদ—তথ্য অনুসারে জানা যায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবলে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের ৩টি প্রতিষ্ঠান ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়া পাঠায়। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকুরি দেয়ার নাম করে তাঁদের রাশিয়া পাঠানো হয়। প্রতি জনের নিকট থেকে নেয়া হয় ১০ লাখ টাকা। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের নির্ধারিত কাজে না পাঠিয়ে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করে দেশটি। এই ৩০ ব্যক্তির যুদ্ধ করার মতো শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা ছিলো না, তারপরেও রাশিয়া কেন এঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালো ? এর উত্তরে এসআরবি জানিয়েছে, মূলত এই ব্যক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে শিকার বা টোপ হিসেবে মোতায়েন করা হয়। তাঁদের অবস্থান লক্ষ্য করে শত্রুপক্ষ কর্তৃক হামলা করলে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার জন্যই নাকি বাংলাদেশিদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কী জঘন্য ও সাংঘাতিক যুদ্ধ কৌশল, ভাবতেই গা শিউড়ে উঠে। এই ৩০ জনের দলের ২০ জনই নাকি এরকম টোপ বা শিকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণে ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি। বিাকদের অনেকে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। জীবিতদের মধ্যে দু’জন আহত অবস্থায় দেশে ফিরে আসলে এই নির্মমতার কথা জানা যায়। নিরীহ বেসামরিক ব্যক্তিদের নিশ্চিত জীবন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে ভিন্ দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে যে মানবপাচারচক্র এই ধরনের কর্মকাণ্ড করছে তারা মানবতার কলঙ্ক, ঘৃণ্যতম অপরাধী। এই ধরনের মানবপাচারচক্রকে নির্মূল করা সরকারের আবশ্যকীয় দায়িত্ব। এ ঘটনায় ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে মিজানুর রহমান ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
উপরের ঘটনাটি কেবল একটি দলের। এ রকম কতো চক্র কতো মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে তার বাস্তব তথ্য পাওয়া বেশ দুরূহ। তবে একেবারে অসম্ভব নয়। বাংলাদেশ থেকে যাঁরা বাইরে যান তাঁরা দেশের ইমিগ্রেশন পার হয়ে পাসপোর্ট—ভিসা নিয়েই যান। কারা মানুষকে বিদেশ পাঠায় তাও সরকারের অগোচরে থাকার কথা নয়। এমন নয় যে কেউ বিমানবন্দর বা নির্দিষ্ট ইমিগ্রেশন এলাকাকে ফাঁকি দিয়ে হুট করে রাশিয়া চলে যেতে পারেন। যেহেতু বিমানে চড়েই মানুষ বিদেশ যায় সেহেতু অন্তত দেশ ছাড়ার শেষ ধাপ বিমানবন্দরে এই লোকগুলোর যাবতীয় তথ্য যাচাই—বাছাই করা বাঞ্ছনীয় ছিলো। যাঁরা বিদেশ মানুষ পাঠায় তাঁদেরও সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিদেশ পাঠানো লোকজনের যাবতীয় তথ্য দাখিল করার কথা। এইসব প্রতিষ্ঠান কাকে কোন্ উদ্দেশ্যে বিদেশ পাঠাচ্ছে সরকারের তা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করার দায়িত্ব। দেশের নাগরিকের নিরাপদ বিদেশযাত্রা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তা যে হচ্ছে না ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ঘটনা থেকে তা প্রমাণ হচ্ছে। ইউরোপে ঢুকতে যেয়ে বিপদসঙ্কুল নৌপথে অহরহ প্রচুর বাংলাদেশির মৃত্যু ঘটছে। এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছে মানব—ব্যবসার আরেক লাভজনক মৃত্যুউপত্যকা।
রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশিদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করার এই অমানবিক অপরাধের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। নিরীহ বিদেশি বেসামরিক নাগরিকদের এভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা আরেক ধরনের যুদ্ধাপরাধ। শক্তিধর রাষ্ট্র হলেই যে যাচ্ছেতাই করা যাবে তা বিশ^বাসীর কাম্য না হলেও বাস্তবে বৈশি^ক মাতব্বররা কী ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড করছে উপরের ঘটনা তার জ¦লন্ত উদাহরণ। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সোচ্চার হওয়া দরকার। পাশাপাশি যে চক্র এইভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ পাঠিয়ে ক্রমাগত বর্বরতার নিকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি করছে তাঁদের বিরুদ্ধে দরকার কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ। আমাদের নাগরিকরা বিদেশ যাবেন উপযুক্ত কাজ করার জন্য, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধের টোপ হতে নয়। ঝঁুকিবহুল বিদেশ যাত্রার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও অতিমাত্রায় সচেতন থাকতে হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন