প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:২২
একসময় শিশুদের খেলনা মানেই ছিল মাটির পুতুল. গরু, পাখি, ব্যাঙ, নৌকা, হাঁড়ি—পাতিলসহ নানা ধরনের খেলনা। এসব খেলনা কিনতে মেলা ও পূজা—পার্বণে শিশুদের বায়না, আনন্দ আর উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। পূজায় মাটির পাখি কেনার জন্য শিশুদের মধ্যে চলত প্রতিযোগিতা। ছোট ছোট নৌকায় তেল জ্বালিয়ে পানিতে ভাসানোর স্মৃতিও রয়েছে অনেকের শৈশবে। সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। শিশুদের হাতে এখন মাটির খেলনার বদলে জায়গা করে নিয়েছে মোবাইল ফোন ও প্লাস্টিকের খেলনা। এর প্রভাব পড়েছে বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কুমার সম্প্রদায়ের জীবিকায়। তবু পূর্বপুরুষের পেশা ও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছেন তারা।
.jpg)
শুক্রবার বিকালে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাটির তৈরি নানা ধরনের খেলনা ও সামগ্রী। ছোট—বড় গরু, পাখি, ব্যাঙ, হাতি, নৌকা, হাঁড়ি—পাতিল ও পুতুলসহ বিভিন্ন খেলনা নিয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষায় বসে আছেন বিক্রেতারা। কেউ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে খেলনা দেখছেন, কেউ আবার হাতে তুলে নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো দিনের স্মৃতিতে। শিশুদের কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে পছন্দের খেলনা। তবে দোকানগুলোতে খেলনার বৈচিত্র্য থাকলেও বিক্রেতাদের কথায় উঠে এসেছে আগের মতো বিক্রি না হওয়ার হতাশা। কেউ সন্তানদের শৈশবের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে কিনছেন মাটির খেলনা। আর বিক্রেতারা অপেক্ষায় থাকছেন, কখন কোনো ক্রেতা এসে কিনবেন তাদের হাতে তৈরি সামগ্রী।
প্রতিবছর কার্তিক মাসের শেষ দিকে ভোলাভোলী উপলক্ষে ষোলঘর পয়েন্ট এলাকায় মাটির খেলনার দোকান বসে। একসময় এখানে দোকানের সংখ্যা বেশি থাকলেও প্রতিবছর তা কমছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এবার সেখানে মাটির খেলনার প্রায় সাতটি দোকান বসেছে। এসব দোকানের বিক্রেতারা সবাই জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামের বাসিন্দা। একই গ্রামের এসব মানুষ প্রতিবছর এখানে এসে নিজেদের তৈরি মাটির খেলনা ও সামগ্রী বিক্রি করেন।
(1).jpg)
মৃৎশিল্পী ও বিক্রেতা কিটু চন্দ্র পাল (৩৮) জানান। তার কাছে মাটির খেলনা বিক্রি শুধু জীবিকা নয়, এটি পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা পেশা। বাবা—দাদা ও পূর্বপুরুষদের হাত ধরে যে কাজ শুরু হয়েছিল, তিনিও সেই কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ক্রেতাদের পছন্দ, কমেছে মাটির জিনিসের চাহিদা।
কিটু চন্দ্র পাল বলেন, আগে মাটির জিনিসের বিক্রি অনেক বেশি ছিল। এখন প্লাস্টিকের খেলনা ও অন্যান্য সামগ্রী বাজারে আসায় মাটির জিনিসের চাহিদা কমেছে। তারপরও প্রতিবছর এই সময়ে খেলনা তৈরি করে মেলায় নিয়ে আসি। বিক্রি কম হলেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। যত দিন মানুষ মাটির জিনিস কিনবেন ক্রেতারা, ততদিন এই কাজ চালিয়ে যাবো।
তিনি জানান, মাটির তৈরি গরু, পাখি, ব্যাঙ, হাতিসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও সামগ্রী তৈরি করেন নিজ হাতেই। মাটির এসব জিনিস তৈরির কাজ তাঁরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এখনো বিভিন্ন ধরনের খেলনা বানান। কিন্তু আগের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, সেই অনুপাতে বিক্রি বা লাভ বাড়েনি। কোনো দিন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ হলে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এভাবে সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
.jpg)
এই পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কণ্ঠে রয়েছে আরও বেশি হতাশা। নিজের ছেলে—মেয়েরা লেখাপড়া করছে, কিন্তু তারা মাটির জিনিস তৈরির কাজে আসতে আগ্রহী নয়। তদের পূর্বপুরুষেরা এই কাজ করেছেন, তারাও করছেন; কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর এই পেশায় থাকবে না। ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা মৃৎশিল্পের ধারাবাহিকতা একসময় থেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাটির খেলনা কিনতে আসা ক্রেতা সুশেন চন্দ্রের কাছে এসব খেলনা কেবল মাটির তৈরি সামগ্রী নয়, শৈশবের এক টুকরো স্মৃতি। ছোটবেলায় বাবা—মায়ের কাছে বায়না ধরে মাটির হাঁড়ি—পাতিল, গরু, নৌকাসহ নানা ধরনের খেলনা কিনতেন তারা। বিভিন্ন এলাকা থেকে মৃৎশিল্পীরা খেলনা নিয়ে এলে শিশুদের মধ্যে সেগুলো কেনার জন্য আগ্রহ তৈরি হতো। বাবা—মায়ের হাত ধরে দোকানে গিয়ে পছন্দের খেলনা বেছে নেওয়ার সেই দিনগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে তার।
পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে সুশেন চন্দ্র বলেন, কার্তিক পূজার সময় মাটির পাখি কেনার জন্য শিশুদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলত। পূজার দিন সকালে কার আগে কে একটি পাখি কিনতে পারবে, তা নিয়ে কত আনন্দই না হতো! আবার ছোট ছোট নৌকা তৈরি করে তাতে তেল জ্বালিয়ে পানিতে চালাতেন তারা। এসব ছোট ছোট আনন্দই ছিল শৈশবের বড় পাওয়া। এখন সেই খেলনা ও আনন্দের দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না।
সুশেন চন্দ্র বলেন, মোবাইল ফোনের প্রতি শিশুদের আসক্তি বাড়ায় মাঠে খেলাধুলা ও ঐতিহ্যবাহী খেলনার প্রতি আগ্রহ কমছে। শিশুরা এখন ঘরে বসে মোবাইল ফোনে সময় কাটায়। এতে তারা শুধু মাটির খেলনা থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে না, হারিয়ে ফেলছে শৈশবের অনেক আনন্দ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও। আমি চাই, আগের দিনের মতো মাটির খেলনা আবার শিশুদের হাতে ফিরে আসুক। নতুন প্রজন্মও জানুক, একসময় মাটির তৈরি এসব খেলনা ঘিরেই কত আনন্দময় স্মৃতি তৈরি হতো।
আরেক ক্রেতা কৃষ্ণ বর্মনও এসেছেন সন্তানদের জন্য মাটির খেলনা কিনতে। তিনি বলেন, ছোটবেলায় নিজেরাই এসব খেলনা কিনতেন। এখন সন্তানদের জন্য কিনতে এসেছেন। ছেলে ইতোমধ্যে পাঁচটি মাটির গরু কিনেছে। পছন্দ হলে আরও খেলনা কেনার ইচ্ছা রয়েছে। তার এই আগ্রহে বোঝা যায়, মাটির খেলনার প্রতি মানুষের টান একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং অনেকের কাছে তা এখনো শৈশবের স্মৃতি ও আনন্দের প্রতীক।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন