প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:২৮
শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামে জমির বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার জেরে প্রতিপক্ষের প্রায় ৩৫—৪০টি বসতবাড়িতে টানা তিন দিন ধরে ভাঙচুর ও লুটপাট হবার অভিযোগ উঠেছে। এসব বাড়ি থেকে গরু, ধান—চাল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, আসবাবপত্র, কৃষিযন্ত্র, মোটরসাইকেল, নৌকাসহ অন্তত অর্ধকোটি টাকার মালামাল লুট করে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। অনেকে গ্রামছাড়া হওয়ায় বাড়িতে থাকা পরিবারের লোকজন ও শিশুরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
গেল ৩১ অক্টোবর সকালে উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামসংলগ্ন পূর্ব পাশের একটি পতিত জমির দখল নিয়ে রূপ মিয়া ও আজব আলীর পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান মিয়া (৬৫) গুরুতর আহত হন। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেবার সময় পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে নিজগাঁও গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানান, সংঘর্ষের পর গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আজব আলীর পক্ষের অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে যান। এ সুযোগে রাতের আঁধারে তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, সংঘর্ষের পর থেকে টানা তিন দিন ধরে লুটপাটের ঘটনা ঘটছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, আজব আলীর পক্ষের এলিম উদ্দিনসহ প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, চাষাবাদের পাঁচটি পাওয়ার টিলার, দুটি মোটরসাইকেল, পানি তোলার পাঁচটি মোটর, ডিজেলচালিত ২০টি ইঞ্জিন, দুটি ধান মাড়াইকল, শতাধিক বস্তা বোরো বীজধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, ২০ মণ চাল, দুইটি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ পাঁচ লাখ টাকা, তিন ভরি স্বর্ণালংকার, নৌকা, আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
নিজগাঁও গ্রামের মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, রাতে এসে ঘরের দরজা খোলার জন্য অনেক লাথি দিয়েছে। ঘরের বেড়ায়ও লাথি মেরেছে, গালিগালাজ করেছে। কিন্তু ভয়ে আমরা দরজা খুলিনি। ঘরের বাইরে থাকা আমার দুই ছেলের দুইটি মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা নিয়ে গেছে।
মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, বাড়িঘরের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। তিন দিনের লুটপাটে আমরা এখন পথের ফকিরের মতো হয়ে গেছি। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি স্বর্ণ, ১৭টি গরু, নগদ পাঁচ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানির মোটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি ও ধান ভাঙানোর মেশিনসহ ঘরে যা ছিল সব নিয়ে গেছে। আমরা এখন চলব কীভাবে?
রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, তাঁর ও শাশুড়ির খাট—পালঙ্ক, আলমারি, হাড়িপাতিল, ধান—চালসহ ঘরের সব জিনিসপত্র এবং জমিতে পানি দেওয়ার পাম্প নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রান্নার চুলাগুলোও ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। ফলে রান্না করার মতো কোনো সরঞ্জাম তাদের ঘরে অবশিষ্ট নেই।
আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোনো বাড়িতেই পুরুষেরা নেই। খালি বাড়ি থেকে গরু—বাছুর, ধান—চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি খাওয়ার একটা গ্লাসও নেই। ৫০ কেয়ার (৩০ শতাংশে এক কেয়ার) জমির খড় ছিল, গভীর রাতে আগুন দিয়ে সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে বাড়িছাড়া এলিম উদ্দিনের বাড়ি দেখতে আসেন তাঁর ছোট বোন মাহমুদা আক্তার। তিনি বলেন, এমন ঘটনা আমরা জীবনেও দেখিনি। বাড়িতে থাকা মহিলাদের গালিগালাজ ও হুমকি দিয়ে সব লুটপাট করা হয়েছে। আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর রূপ মিয়ার লোকজন আমাদের ভাইদের পক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়ির কোনো কিছুই বাকি রাখেনি।
লুটপাটের শিকার পরিবারের পক্ষ থেকে আজব আলী অভিযোগ করে বলেন, সংঘর্ষের পর প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। আসবাবপত্র, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, গবাদিপশু ও মূল্যবান মালামাল নিয়ে গেছে। বর্তমানে তাদের পক্ষের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। বাড়িতে থাকা মহিলা ও শিশুরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ঘটনায় প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রূপ মিয়া। তিনি বলেন, জমিটি তাঁর বাবার নামে। তিনি নিজেও সেখানে মাটি ভরাট করেছেন। আজব আলীর লোকজনের হামলায় তাঁর চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান মারা গেছেন এবং ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন। তার নিজেরও বাম পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে।
লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে রূপ মিয়া আরও বলেন, আমাদের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘর লুটপাট করেনি। অন্যের জিনিসপত্র আনতে সবাইকে কড়া নিষেধ করা হয়েছে। তারা নিজেরাই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মালামাল সরিয়ে নিয়ে আমাদের অভিযুক্ত করছে। পুলিশকে বলেছি, যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, সংঘর্ষের পর রাতের আঁধারে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে কারা এসব করেছে, তা তারা নিশ্চিত নন। একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় অনেকেই তাকে জানিয়েছেন, বাড়িঘর থেকে ধান—চাল, পাওয়ার টিলার ও ইঞ্জিন লুট করে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আওয়াল বলেন, সংঘর্ষের দিনই তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ গ্রামে অবস্থান করেছেন। দুই পক্ষের লোকজন পরস্পরের আত্মীয় এবং একই গোষ্ঠীর। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি আর সেখানে যাননি। তাই ভাঙচুর ও লুটপাটের বিষয়টি সরেজমিনে না দেখে কিছু বলতে পারছেন না।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই কিছু ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতে লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে তারা শুনেছেন। তবে গ্রামের সব বাড়িতে পুলিশের পক্ষে একসঙ্গে যাওয়া কঠিন। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন