প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৭:০২
কোটাসংস্কার আন্দোলন শুরুর পর হতে এক দফার দাবি পর্যন্ত ছাত্র—জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে জুলাই মাস থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে নির্বিচারে গণহত্যা পরিচালিত হয় নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে। স্বীকৃত তথ্য মতে এ সময়ে ৮ শ’ থেকে ১ হাজার মুক্তিকামী জনতাকে হত্যা করা হয়। আহত ব্যক্তির সংখ্যা অগণন। এইসব হত্যাকাণ্ডের সুবিচার বাঞ্ছনীয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন আদালতে এইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য যেসব মামলা দায়ের হচ্ছে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে তার অধিকাংশই কোনো চিন্তা—ভাবনা ও যথেষ্ট তথ্য—প্রমাণাদি ছাড়া দায়ের করা হচ্ছে। ফৌজদারি অপরাধের জন্য দায়ের করা মামলায় ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণাদি দিতে হয়। সম্প্রতি দায়ের করা মামলাগুলোয় এসব উপাদানের যথেষ্ট পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে বলে আইনজ্ঞদের অভিমত। তাঁরা বলছেন, দুর্বলভাবে মামলা দায়েরের কারণে বিচারিক পর্যায়ে এইসব মামলা প্রমাণ করা বেশ কঠিন হবে এবং অপরাধীদের অনেকেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। তাই মামলা করার আগে যথেষ্ট স্বাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে সুনির্দিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। গত সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে বিশেষ করে বিরোধী নেতা—কর্মীদের দমন করতে ঢালাওভাবে যেনতেন প্রকারে এরূপ মামলা দায়েরের ঘটনা আমরা জানি। ওইসব মামলায় জ্ঞাত আসামির চাইতে অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা বেশি থাকত। একটি বিশাল সংখ্যার ব্যক্তিদের অজ্ঞাত আসামি বানিয়ে আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করত বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এখন যেসব মামলা দায়ের করা হচ্ছে সেখানেও অজ্ঞাত আসামির আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি গণহত্যার সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত বিচার করার জন্য সঠিক পন্থায় মামলা দায়ের করতে হবে। মামলার আরজিতে যদি দুর্বলতা থাকে তখন এর সুযোগ গ্রহণ করে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে। অপরাধীকে এই ধরনের সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। তাই মামলা দায়েরের আগে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
হাজার শহিদের রক্তের বিনিময়ে এই অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। এই শহিদের রক্তঋণ বৃথা যেতে পারে না। একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত বিচার হওয়া প্রয়োজন। আইনি সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীর উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা। ক্ষমতার মসনদে বসে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করার যে নিষ্ঠুর নির্দেশনা দিয়েছেন পতিত সরকারের প্রধান ব্যক্তিসহ তার সহযোগীরা তা পৃথিবীর মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এক জঘন্য দৃষ্টান্ত। আমরা এই ধরনের নিষ্ঠুরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। এই বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যাতে একটিও মানবতাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সংঘটিত না হয় তা নিশ্চিত করা এই অভ্যুত্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য। কেবলমাত্র আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়াই পারে তা নিশ্চিত করতে। যাদের ক্ষমতার লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে হাজারখানেক প্রাণের বলিদান হলো সেই ক্ষমতালিপ্সু দানবদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাই দুর্বল মামলার কারণে যাতে মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধীদের কেউ রেহাই না পায় সেজন্য মামলা দায়েরকারী (বাদী), আইনজীবী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথেষ্ট সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বনের অনুরোধ আমাদের।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন