প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬ ২২:০২
সুনামগঞ্জ পৌর শহরে মাঝারি বৃষ্টিপাতেই অনেক এলাকায় দুর্বিষহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। নদীর পানি বিপদসীমার নীচে, হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা বিদ্যমান; তারপরেও শহরের পাড়া—মহাল্লায় পানির ে¯্রাত। কিছু এলাকার ঘর—বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। তীব্র সমস্যায় পড়েন মানুষ। দৈনন্দিন জীবন বাধাগ্রস্ত হয় বহুভাবে। নোংরা পানিতে রোগ জীবাণু ছড়ায়। ঘরে পানি ঢুকে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ায়। বহুদিন ধরে এমন হয়ে আসছে।
কিন্তু এর কোনো কার্যকর সমাধান নেই। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত শহরে ২৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির ফলে তলিয়ে যায় শহরের শান্তিবাগ, নতুনপাড়া, কাজির পয়েন্ট, নবীনগর, পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের অংশবিশেষ, মল্লিকপুরের অংশবিশেষ, জামতলাসহ শহরের বহু এলাকা। শনিবার জলাবদ্ধতার শিকার পৌরশহর পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম নূরুল। পৌরসভার প্রশাসক ও প্রকৌশলীরা ছিলেন তাঁর সাথে। সংসদ সদস্য জরুরিভিত্তিতে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পৌর কর্তৃপক্ষ যথারীতি আশ^াস দিয়েছেন। কিন্তু এই আশ^াসে আস্থা রাখার মতো পৌর শহরের ভুক্তভোগী মানুষ পাওয়া যাবে খুব কম। কারণ এরকম আশ^াস ও প্রতিশ্রম্নতি অতীতে বহুবার দেয়া হয়েছে। সমস্যা যখন তীব্রতা ধারণ করে তখন সামান্য কিছু কাজ করা হয়, তারপর বছরব্যাপী চুপচাপ। এরকম নামমাত্র কাজে শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হিসেবে সুনামগঞ্জের পরিচিতি ঐতিহাসিক। কয়েক দশক আগেও এই শহরে এখনকার মতো জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না। কারণ তখন পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক উপায়গুলো সচল ছিলো। তখন শহরে ছিল না কোনো পাকা ড্রেন। কিন্তু পানি আটকে থাকতো না। শহর বেষ্টন করে থাকা খাল দিয়ে দ্রুত পানি চলে যেত হাওর কিংবা নদীতে। এখন সেই খাল আর নেই। এগুলো দখল—ভরাটে বিলীন হয়েছে। প্রাকৃতিক খালের বদলে পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছে অপ্রশস্ত ও অগভীর পাকা ড্রেন। ক্রমাগত শহর বড় হয়েছে। শহরে বাসা—বাড়ি ও ঘরের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে মানুষ। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা তৈরি হয়েছে। পৌরসভার রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু একইসাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নাগরিক দুর্ভোগ। শহরের ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা হয় না, এই অভিযোগ বহু পুরনো। যখন পরিষ্কার করা হয় তখন ড্রেনের সামান্য অংশে কিছু কাজ করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। এই ভরাট হয়ে যাওয়া ড্রেন পানি টানতে পারে না। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে কিছু বৃষ্টি হলেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। আমাদের শহরকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করতে হলে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি আগের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের উৎসগুলোকে অবমুক্ত করার চিন্তা করতে হবে। নতুবা শহরের জনদুর্ভোগ সময়ের ব্যবধানে কেবল বাড়বেই।
শহরের অন্যতম প্রধান খাল কামারখাল। এই খালটি এখন ভরাট হয়ে গেছে। ভরাট খালের উপর নির্মিত হয়েছে সরু ও অগভীর ড্রেন। এই খাল যে পরিমাণ পানি ধারণ ও নিষ্কাশন করতে পারতো তা ছোট্ট ড্রেনের পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। অন্য প্রধান খালগুলো সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। শহরের কামারখালসহ অন্য বড় খালগুলো উদ্ধারের জন্য মাঝে—মধ্যেই কিছু তৎপরতা দৃশ্যমান হয়। কয়েক বছর আগে ঘটা করে কামারখালের কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিলো। তখন বলা হয়েছিল সম্পূর্ণ খাল খনন করে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু কোথায় কী। আবারও সবকিছু থেমে গেছে। কেন এবং কী কারণে এই খাল উদ্ধারের কাজ বারবার থেমে যায় তা আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে আমাদের প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে।
সুনামগঞ্জ শহরকে একদা আদর করে ভিলেজ টাউন ডাকা হতো। অর্থাৎ শহরের সুবিধা নিয়েও গ্রামীণ প্রকৃতির এক সুন্দরতম জনপদ ছিলো এই শহর। স্বপ্ন ও ভালোবাসার এই শহর আজ বয়স্ক ব্যক্তিদের নিকট কেবলই অতীতের বিষয়বস্তু। জলাবদ্ধতা, যানজট, ঘিঞ্জি আবাসিক এলাকা আর অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এই শহরে বসবাস করা অনেকটা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার মতো। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখন কেবলই সভা—সেমিনারে উচ্চারিত মূল্যবান উপদেশ। বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই কোথাও। কেবল সুনামগঞ্জ নয়, সারা দেশের শহরগুলোর এখন একই দশা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো আবশ্যক। এজন্য দরকার সৃজনশীল চিন্তা, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার কৌশল অবলম্বন, সার্বক্ষণিক তৎপরতা এবং আন্তরিকতা। পৌরসভাকে এজন্য যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমরা আশা করি সুনামগঞ্জ সদর—বিশ^ম্ভরপুর আসনের সংসদ সদস্য শনিবার শহরের জলাবদ্ধতা দূরিকরণে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন