প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩৭
করোনা মহামারির সময় সুনামগঞ্জ সদর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে যে আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন করা হয়েছিলো সেটিই গত জুন মাসের ১৪ তারিখ হাম—পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পুনরায় উদ্বোধন করা হলো। একই জিনিসের বারেবারে উদ্বোধন করে নিজেদের কৃতিত্ব নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যখন দেখতে পাওয়া যায়, দুই দুইবার সাড়ম্বরে উদ্বোধন করার পরও আইসিইউ ইউনিটটি ব্যবহার করা যায় না তখন আফসোস ও হতাশার অন্ত থাকে না। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সদর হাসপাতালের কথিত ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এখনও নিষ্ক্রিয় রয়েছে। ২০২৩ সনে করোনা মহামারির সময় যখন এই ইউনিট স্থাপন করা হয় তখন এখানে বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি বসানো হয়। এই মূল্যবান জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী বস্তুত অব্যবহৃত থাকতে থাকতে বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ এই যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে সরকারের বহু টাকা খরচ হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালটি প্রায় ২৬ লাখ জনসংখ্যার প্রান্তিক এই জেলার স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার প্রধান ভরসাস্থল। একটি আধুনিক হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) থাকা অত্যাবশ্যক। জটিল ধরনের রোগীর জীবন রক্ষার জন্য কৃত্রিমভাবে শ^াস প্রশ^াস বজায় রাখতে এই ইউনিট অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন আইসিইউ ইউনিট ছিল না তখনকার বিষয় আলাদা। কিন্তু যখন হাসপাতালে এই ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে তখন তা ব্যবহার করতে না পারার বেদনাদায়ক বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। হাসপাতালের জনৈক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইসিইউ ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখতে ৪ জন কনসালটেন্ট, ১০ জন মেডিক্যাল অফিসার, ১৬ জন নার্স ও ১২ জন ওয়ার্ডবয় প্রয়োজন হয়। কিন্তু আইসিইউ ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় এই জনবল সৃজন করা হয়নি। জনবল সৃজন করেই কী হবে, যদি পদায়ন না পাওয়া যায় ? যেখানে এই হাসপাতালের ৭৪ জন চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত থাকেন মাত্র ২০ জন, সেখানে আইসিইউ ইউনিটের জন্য বর্ধিত জনবল প্রত্যাশা করা তো কেবলই কাকস্য পরিবেদনা মাত্র। কার কাছে এই হাওর—জনপদের প্রান্তিক মানুষ নিজেদের কষ্টের কথা জানাবে ?
সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট, ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ বিভিন্ন ব্যবস্থাদি যুক্ত হওয়ার খবরে আমরা সবিশেষ আনন্দিত হই। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই কয়েকবার এ—সব সেবা চালুর পর আমরা জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে আনন্দিত চিত্তে সেবা সম্প্রসারণের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু বারবারই আমরা হতাশ হয়েছি। এই দেশটি বড় অদ্ভুত। গাড়ির আগে ঘোড়া জুড়ে দিতে আমরা বড়ই ওস্তাদ। এখানে ভবন হয়, যন্ত্রপাতি কেনা হয়; কিন্তু এগুলো কার্যকর করতে যে মানবসম্পদ দরকার পড়ে তা যেন সকলে বেমালুম ভুলে বসে থাকেন। সুনামগঞ্জের সকল হাসপাতালেই তীব্র জনবল সংকট বিদ্যমান। জনবল দেয়ার সক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের নাই থাকে, তাহলে অর্থহীন এইসব পদ সৃজন করে পরিহাস করা কেন ? মুদ্রার অপর পিঠটিও অন্ধকারে পরিপূর্ণ। সবেধন নীলমণি হয়ে যাঁরা আছেন, তাঁরাও সেবা দানে যারপরনেই অনাগ্রহী। শোনা যায়, এই সদর হাসপাতালে নাকি তিনজন এনেসথিয়া বিভাগের ডাক্তার আছেন, কিন্তু কখনও তাঁদের একসাথে দেখা যায় না, নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে এই তিনজন নাকি সপ্তাহে দুইদিন করে ডিউটি করেন। কর্মচারি ব্যবস্থাপনার যখন এই অবস্থা তখন জনবল আসলেই যে সেবার মান আকষ্মিক বেড়ে আকাশ ছঁুয়ে ফেলবে তাও বিশ^াস করতে কষ্ট হয়। আসল কথা হলো, সেবা খাতের সাথে জড়িত ব্যক্তিগণের দায়িত্ববোধ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও দরদি মনোভাব তৈরি না করা গেলে সবকিছুই অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়। স্বাস্থ্যখাতকে যেভাবে অতি বাণিজ্যিকিকরণ করার ব্যবস্থা করে ফেলা হয়েছে সেখানে সহসাই যে বিশাল পরিবর্তন ঘটে যাবে তা আমরা মনে করি না। তবে আমরা যদি উন্নয়নমুখী ধীর গতিও দেখতে পেতাম তাহলে স্বস্তি ছিলো।
আইসিইউ ইউনিটের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করবে। কিন্তু এর জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না। বিনা চিকিৎসায় রোগ জর্জরিত মানুষ মারা যাবে তাতেও কারও কিছু আসবে যাবে না। আবারও যন্ত্রপাতি কেনা হবে, দুইবারের জায়গায় তৃতীয় বারের মতো হয়তো এই আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধনের প্রচারণাপর্ব মহাসমারোহে চালানো হবে। কিন্তু তার সবই এই দেশের ভাগ্যাহত মানুষের জীবনে ন্যূনতম কোনো সুফল পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হবে। এমন নিদানকালের অবসান যে কবে ঘটবে, কে জানে। এরকই হচ্ছে, এরকমই চলতে থাকবে ? শেষ কথা হলো— সেবা—ব্যবস্থার কেবল উদ্বোধন নয় আমরা এর কার্যকারিতা দেখতে চাই।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন