অপরিকল্পিত পর্যটন টাঙ্গুয়ার গলার ফাঁস

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২১

গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন ও নৌযান চলাচলের কারণে হাওরের বাস্তুতন্ত্র, উৎপাদনশীলতা বিনষ্টসহ পরিবেশ—প্রতিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বর্ণিত সকল বিষয়াদিই সকলের জানা, কারণ এ নিয়ে এ যাবৎ অসংখ্যবার বিভিন্ন মহল থেকে কথা বলা হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে এক কদমও অগ্রসর হওয়া যায়নি। এই হাওরে প্রতিদিনই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এতে হয়তো প্রত্যক্ষ—পরোক্ষভাবে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কিছু বেড়েছে। কিন্তু সকলেই একমত যে, এই অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনের কারণে বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরসহ চলাচলের বিশাল এলাকা নানারূপে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ব্যবস্থাপনার সুন্দর নীতিমালা আছে, ওসব পর্যটনকেন্দ্রে কখনও নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। কারণ পরিবেশ—প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য ওইসব জায়গায় কঠোর ব্যবস্থাপনা কাঠামো স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। ওইসব পর্যটনকেন্দ্রে যাঁরা প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে যান তাঁরাও নিয়ম মানার ক্ষেত্রে অতিশয় সচেতন থাকেন। পর্যটন এলাকাগুলোকে কেউ সিগারেটের ছাই পর্যন্ত ফেলতে সাহস করেন না, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার বিষয়টি চিন্তারও অতীত। কিন্তু আমাদের টাঙ্গুয়ার হাওরে কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনা দাঁড় করানো যায়নি।

 

ফলে পর্যটকরাও যথেচ্ছভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কাজ করতে সামান্য দ্বিধা করেন না। টাঙ্গুয়ার হাওর বিশেষ করে জীববৈচিত্রের জন্য একদা বিখ্যাত ছিলো। এই হাওরটি দেশি জাতের মাছের অন্যতম প্রজননক্ষেত্র ও বিচরণস্থল ছিলো। এই হাওর একদা বিরল জাতের পাখ—পাখালি, বৃক্ষরাজি ও লতাগুল্মের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলো। কিন্তু এখন সব গেছে। এজন্য যে কেবল পর্যটন দায়ী তা নয়। টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে সরকার নানা সময় নানা ধরনের ব্যবস্থাপনাগত পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। এসব পরীক্ষা নিরীক্ষায় হাওরের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পরিবর্তে হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটেছে। সরকারি—বেসরকারি ব্যবস্থাপনার সময় বেপরোয়াভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে হাওরের মাছ, গাছ, পাখিসহ সকল সম্পদ। এখন এই হাওর কেবলই জলের মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন সমৃদ্ধির নামে এখন হাওরের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদে এই হাওর নিয়ে সরল সত্য বেরিয়ে এসেছে এলাকার একজন কৃষকের কণ্ঠে। লতিফ উদ্দিন নামের ওই কৃষক বলেন, ‘ধানের জমিতে এখন প্রায়ই প্লাস্টিকের বোতল, গ্লাস, প্লেট আর কাঁচের ভাঙা অংশ পাওয়া যায়। অনেক সময় ভাঙা কাঁচে পা কেটে যায়। এসব বর্জ্য জমির ক্ষতি করছে। আগের মতো ফলনও হয় না। যারা হাওরে ঘুরতে আসে তারা তো ঘুরে চলে যায়, কিন্তু আমাদের ক্ষতি করে যায়।’ এই কৃষকের সত্য উচ্চারণকে বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষণিক আনন্দ উপভোগের জন্য যারা এখানে বেড়াতে আসেন তাঁরা যে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপর নির্ভরশীল মানুষের সারা জীবনের ক্ষতি করে যাচ্ছেন তার পরিমাণ কি হিসাব করে দেখা হয়েছে কখনও ? পর্যটনের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক প্রবাহ সঞ্চারিত হয়, এই ক্ষতি তার বহু গুণ বেশি। কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছেন টাঙ্গুয়ায় কী পরিমাণ হাউসবোট বা জলযান ঢুকতে পারবে তার কোনো সমীক্ষা নেই, এমনকি দৈনিক কী পরিমাণ জলযান এই হাওরে ঢুকে তার হিসাবও কারও কাছে নেই। জানা যায়, ছুটির দিনে এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে  দুই শ’র বেশি সুরম্য হাউসবোট অবস্থান করে। ছোট নৌকার হিসাব আলাদা। এইসব নৌকা ট্যাকেরঘাটসহ হাওরের বিভিন্ন প্রান্তে রাত্রিযাপন করে। এই বিশাল সংখ্যক পর্যটকের মলমূত্র হাওরেই পতিত হয়। সাথে অসংখ্য প্লাস্টিক বর্জে্যর স্তুপ জমা হয় হাওরের বুকে। উচ্চ শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের অবাধ ব্যবহারে স্বাভাবিক জলজ বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব হিসাব করা খুব জরুরি। নামমাত্র একটি নীতিমালা আছে। কিন্তু তার যথাযথ কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে টাঙ্গুয়ার হাওরটি পর্যটনের মাধ্যমে যে ধরনের সমৃদ্ধি অর্জনের কথা ছিলো তা তো হয়ই নি। উল্টো একদা উৎপাদনশীল হাওরটি আজ মৃতবৎ হয়ে যাচ্ছে। 

 


টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশসহ হাওরের পুরনো কৃষিজ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারকে অবিলম্বে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। এই হাওরটি সুনামগঞ্জের সুপ্রাচীন অপরিবর্তিত ভূ—গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের অংশ। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। যথাযথ পরিচর্যা পেলে এই হাওর সারা দেশের কৃষিজ সমৃদ্ধির অংশ হতে পারে। মানুষের দ্বারাই ধ্বংস হয়েছে এই হাওর। মানুষ কীভাবে নির্মমভাবে প্রকৃতিকে হত্যা করতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওর তার জীবন্ত প্রমাণ। অথচ মানুষের হাতেই প্রকৃতির বিকশিত হওয়ার কথা। আমরা কি সেই বিকশমান মানুষের অংশ হতে পারবো ?

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার