স্বৈরশাসক ফিরে আসার পথ বন্ধ করা প্রসঙ্গে 

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ, ২০২৫ ০৮:০৫

গত কয়েকদিন আগে (১৯ মার্চ ২০২৫) পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম ছিল :‘স্বৈরশাসক ফিরে আসার সমস্ত পথ বন্ধ করতে হবে : অ্যাড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের’ ও  ‘শেখ হাসিনা পরিবারের ৩৯৪ কোটি টাকা জব্দ’। এই দুইটি সংবাদশিরোনামের প্রথমটিতে বিবৃত ‘স্বৈরশাসক’  ও দ্বিতীয়টির মর্মার্থে বিধৃত ‘একটি পরিবারের আর্থিক সঞ্চয় ৩৯৪ কোটি টাকা’ এই দুইটি প্রপঞ্চ বা সমাজবাস্তবতাবাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত সমাজসাংস্থিতিক পরিসরে বাস্তব হয়ে উঠেছে এবং বিগত দেড়—দুই দশকেএবংবিধ আর্থসামাজিক বিন্যাসগত বাস্তবতাদেশের সিংহভাগ বেসরকারি মানুষের কাছেসহ্যাতীত হয়ে উঠে স্বৈরশাসন উৎখাতে অভ্যুত্থান সংঘটনে পর্যবসিত হতে পারে, তা প্রতিপন্ন হয়েছে।ইতিহাসের এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, এমনকি এবংবিধ ঐতিহাসিকতার বিরুদ্ধে গিয়ে কারও পক্ষে দ্বিমত প্রকাশেরও কোনও অবকাশ নেই।আসলে ইতিহাস তার নিজের পথে চলবেই, কোনও বাঁধাই মানবে না এবং প্রতিপন্ন হবে যে, পরিবর্তনই একমাত্র অপরিবর্তনীয় সত্য। 

উক্ত বাস্তবতার যৌক্তিকতাকে প্রতিপন্ন ও প্রতিষ্ঠিত করে এমন কীছু তথ্য সন্নিবেশন করছি। তথ্যগুলো ইদানিংকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনামস্বরূপ মুদ্রিত হয়েছে। এখানে তাৎপর্যবহুল শিরোনামগলো তুলে দিচ্ছি : (১) প্রকল্পে ১৫ বছরে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা লুটপাট (প্রথম আলো \ ১ ডিসেম্বর ২০২৪), (২) যুক্তরাজ্যে হাসিনা—ঘনিষ্ঠদের বিপুলসম্পদের সন্ধান (প্রথম আলো \ ১ ডিসেম্বর ২০২৪), (৩) সাবেক এমপি একরামুলের শতকোটি টাকার সম্পদ (সমকাল \ ২৯ সেপ্টম্বর ২০২৪), (৪) রহস্যে ঘেরা মহারোজের অঢেল সম্পদ (সমকাল \ ৭ অক্টোবর ২০২৪), (৫) দেনাদার থেকে বিপুল সম্পদের মালিক (খবরের কাগজ \ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪), (৬)্ঋণের টাকায় ‘দুবাই সাম্রাজ্য’ (সমকাল \ ৩ মার্চ ২০২৫), (৭)বাগমারার রাজাকারপুত্র আ.লীগ নেতা জিল্লুর দেড় দশকে অঢেল টাকার মালিক (যুগান্তর \ ২২ মার্চ ২০২৫), (৮) অবসরে গিয়েও অফিস নিয়ন্ত্রণ শতকোটি টাকার মালিক কর্মচারী (আজকের পত্রিকা \ ৫ নভেম্বর ২০২৪)। একটু সচেষ্ট হলে এবংবিধ ছোটবড় হাজারটা উদাহরণ হাজির করা  যেতে পারে, যেগুলোর নির্গলিতার্থ হয় বা হবেএখানে রাজনীতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই বেসরকারী মানুষের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় এবং যাবতীয় আর্থনীতিক প্রককল্প ও উন্নয়নকর্ম আসলে অবাধে সম্পদ লুণ্ঠনের কৌশল ভিন্ন অন্য কীছু নয়। 

দৃষ্টান্তগুলোর মাত্র দুটিতে লুণ্ঠনকৃত টাকার পরিমাণের উল্লেখ আছে, বাকিগুলোতে টাকার পরিমাণটা অনির্ধারিত কিন্তু  ‘বিপুল’ অথবা ‘অঢেল’।এই ‘বিপুল’ ও ‘অঢেল’ অর্থে টাকার পরিমাপে কতো ? তার কোনও পরিসংখ্যান নেই।চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ছাত্রজনতার  ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন’ আসেলে সম্পদ লুণ্ঠনযজ্ঞের পরিসরে হরিলুটের মতো ঘটনার বিরুদ্ধে একটি অনিবার্য উত্থান. তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এর একমাত্র সাফল্য ক্ষমতায় ‘প্রতারক গণতান্ত্রিক’ শক্তির বদলে ‘অভ্যুত্থানসঞ্জাত অগণতন্ত্রিক’ সরকার আসীন হওয়ার পরিবর্তনটুকু অর্জন। এ ছাড়া বৈষম্যনিরসনে সচেষ্ট অথবা সমাজপরিসরে অরাজক অবস্থার নিরসনমুখি অন্য কোনও পরিবর্তন আপাতত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। রবং ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলার অবনতি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে এবং দেশসমাজের সামগ্রিক অবস্থাকে আরও সঙ্গীন ও নাজুক করে তোলেছে, শান্তি ও নিরাপত্তা সর্বত্র বিঘ্নিত হচ্ছে। যত্রতত্র সংঘটিত হচ্ছে, চাঁদাবাজি, দখলচ্যূতি, সন্ত্রাস, রাহাজানি,  চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, লুট, অপহরণ, গুম, হত্যা ও ধর্ষণ। তাছাড়া প্রশাসনিক দুর্নীতি তো আছেই। রাজনীতি হয়ে উঠেছে আপাদমস্তক প্রতারক, বিশ্বঘাতক ও অন্তর্ঘাতী ।  সার্বিক বিবেচনায় গণঅভ্যুত্থানোত্তর সময়ে অবস্থারআশানুরূপ কোনও বিশেষ উন্নতি তো ঘটেই নি, বরং বলা যায় অবনতি ঘটেছে, পরিবর্তন এটুকুই।

গত বছরের শেষ দিকে (১ ডিসেম্বর ২০২৪) দৈনিক প্রথম আলোর একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘আইনশৃঙ্খলা্ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, ব্যবসায়ীরা বিপদে’। এখনও সে পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয় নি, বরং অবনতি হয়েছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এটাই পরিবর্তনগত বাস্তবতা। এই তো ক’দিন আগে, গত বুধবারে  (দৈনিক সংবাদ : ১৯ মার্চ ২০২৫) প্রকাশিত একটি  সংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রংপুরে আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, ক্যামেরা ভাংচুর’। এবংবিধ ঘটনার উদাহরণ এখন কেবল বেড়েই চলেছে, দেশের সর্বত্র প্রতিনিয়ত ঘটছে, বিভিন্ন প্রকার—প্রকারান্তরে এবং এইসব ঘটনার নিহিতার্থ একটাই, জুলাই—আগস্টগণঅভ্যুত্থানোত্তর সময়ে মানুষ যে নৈরাজ্যিকতা থেকে  রেহাই পেতে চেয়েছিলেন তাঁদের সে প্রত্যাশা পুরনহয় নি।
সমাজপরিসরে উপিরিউক্ত নৈরাজ্যিক এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না এবং অস্বীকার করার চেয়ে নির্বোদ্ধিতা বোধ করি আর কীছু হতেও পারে না।এই অবস্থা জুলাই—আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগেও ছিল এখনও আছে এবংবিভিন্ন ঘটনায় প্রতিপন্ন হচ্ছে যে, সমাজসাংস্থিতিক পরিসরে নৈরাজ্যিকতার বিস্তৃতিআরও বাড়ছে অব্যাহত গতিতে। তাই যে কেউ অনায়াসে বলতেই পারেন যে,বিদ্যমান নৈরাজ্যিকতার অনিবার্যঐতিহাসিক পরিণতিআগস্ট—আন্দোলন এবং সে আন্দোলনোত্তর রাজনীতিক—আর্থনীতিক পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বেকার নৈরাজ্যিকতা একটু তারতম্যসহ প্রকটিত হয়ে জনমনে অনিশ্চয়তার মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছ।
একটু সচেষ্ট হলেই উক্ত নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিরহাজারটা প্রমাণ হাজির করা যাবে জুলাই—আগস্ট আন্দোলনোত্তরসাম্প্রতিক কালে গণমাধ্যমান্তরে প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদন থেকে।এই লেখায় সংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনামস্বরূপ ইতিপূর্বে যে উদাহরণগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে সেগুলো ছিল ক্ষমতার ছত্রছায়ায় প্রশ্রয়ে লুঠেরাদের সম্পদ লুণ্ঠন সংক্রান্ত, এবার নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি কতোটা ব্যাপকতা পেয়েছে তার প্রমাণ হাজির করতে কয়েকটিসংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনাম তুলে দিচ্ছি : (১) ‘আমার ঘরডা ভাইঙ্গা দিল, আমি অনে কই থাহুম’, (২) জগন্নাথপুরে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক,(৩) সর্বত্র এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি : নতুন আতঙ্কের নাম ‘মব জাস্টিস’, (৪)রাজধানীতে ছিনতাই, অস্ত্রবাজি, খুনোখুনি : ‘চোখ বুজলেই পাই গুলির আওয়াজ’, (৫) তিন বছরের কাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও,(৬) ভবন সম্প্রসারণ হয়নি জনবলসংকটও মেটেনি, (৭) চিকিৎসকসংকটে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা, সমাধানের দাবি, (৮)আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রূপগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ : গুলিতে নিহত১, (৯) দিরাইয়ে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি : উদ্ধার হয়নি রণভূমির অস্ত্র, (১০) শান্তিগঞ্জে নদী তীরের মাটি কেটে অবাধে বিক্রি, (১১) চোরাচালানে ৪০ ‘বুঙ্গারঘাট’, (১২) সড়কের জায়গায় উচ্ছেদ দখলের খেলা, (১৩)শক্ত হাতে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করুন, (১৪) তিন জেলায় পাঁচ শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, (১৫) গণপিটুনিতে মন্নুজানের ভাগনে নিহত। জুলাই—আগস্ট অভ্যুত্থানপূর্বকালে দেশে এবংবিধ নৈরাজ্যিক ঘটনা ঘটে নি এমনটি নয়,  আকসার ঘটেছে এবং জানা কথা সমাজে এমনটা  ঘটেই থাকে, ঘটবেই। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্বাপরঅরাজক অবস্থা বলতে গেলে একই, ব্যতিক্রমবাদে বিশেষ কোনও তারতম্য পরিলক্ষিত হয় না।  বাস্তবে এসব ঘটনা আগে সংঘটিত হয়েছে, এখন হচ্ছে এবং হবে, অর্থাৎ অতীতের মতো হতে পারে অনেক কীছুই, তার কোনওটারই কমতি বোধ করি হবে না। এটাই সত্যিকার অর্থে এখানকার সমজবাস্তবতা।সবচেয়ে বড় কথা এতে করে দেশের বিদেশনির্ভরতা কিংবা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য তিরোহিত হচ্ছে না, বরং নতুন করে নির্ভরতার স্থানান্তর ঘটেছেবা ঘটছে মাত্র। পত্রিকান্তরে ইদানিং ভারতীয় আধিপত্যেরবিরোধিতার তীব্রায়ণ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যদিও এই বিরোধিতা মার্কিন আধিপত্য সম্পর্কে কৌশলগত কারণে  নীরবতা অবলম্বন করছে। অপরদিকে কারও কারও ধারণা এই যে, বাংলাদেশের মূর্তনির্দিষ্ট ভূরাজনীতিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে ভারত—মার্কিনযৌথ আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই একমাত্র ভবিতব্য। 

‘স্বৈরশাসক’  ও ‘একটি পরিবারের আর্থিক সঞ্চয় ৩৯৪ কোটি টাকা’ এই দুইটি প্রপঞ্চ বা সমাজবাস্তবতার কথা বলছিলাম, এরা পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংশ্লিষ্ট, একটি অন্যটির উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ পরিপূরক। এই দুটি প্রপঞ্চ একটি মূর্তনির্দিষ্ট আর্থনীতিক নিয়মের ঐতিহাসিক পরিণতি। এই পরিণতিকে প্রতিরোধ করতে হবে অথবা ‘স্বৈরশাসক ফিরে আসার সমস্ত পথ বন্ধ করতে হবে’ বলা যতোটা সহজ, প্রতিরোধ করে দেখানো ততোটা সহজ নয়। এই করে দেখানোটা একটা রাজনীতি এবং সে রাজনীতিটা প্রগতিশীল রাজনীতি। এই সমাজব্যবস্থা এখনও আপাদমস্তক প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারক এবং যেখানে এখন সবকীছু নষ্টদের দখলে চলে গেছে সেখানে প্রগতিশীল রাজনীতি করা প্রকৃতপ্রস্তাবে নিজেকে বিপদাপন্ন করার নামান্তর। এই সত্যটি জেনে নিয়ে কেউ কেউ একটু বাহবা পাওয়ার বাসনায় স্বৈরশাসককে প্রতিরোধ করার দিবাস্বপ্নে বিভোর হতে কার্পণ্য করেন না এবং প্রকারান্তরে কাজে না হলেও অন্তত কথায় প্রগতিশীল হতে পছন্দ করেন।

ইংরেজি ÔDespotismÕ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘স্বৈরতন্ত্র’। একজন বলেছেন, ‘প্রাচীন আমলে কথাটির অর্থ ছিল পরিবার অথবা ক্রীতদাসদের মালিক বা প্রভু। কথাটি ক্রীতদাস সদৃশ জনগণের একছত্র শাসকের প্রতি এবং বর্তমানে যথেচ্চাচারী স্বৈরতন্ত্রী সরকারের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়, বিশেষে করে যে—সরকার কার্যত কোনও আইন, বিরোধী পক্ষ অথবা প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না।’ (সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলিকাতা, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা : ৩৫০-৩৫১)পৃথিবীর ইতিহাসে বার বার ভিন্ন ভিন্ন দেশে এবম্প্রকার স্বৈরাচারিতাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে, স্বৈরশাসনের প্রবণতাকে বিনাশ করতে বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু কালচক্রের  আবর্তে পড়ে প্রতিবিপ্লব হয়েছে এবং যথারীতি আবার স্বৈরশাসন ফিরেওএসেছে। রাশিয়া ও চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব হয়ে গণতান্ত্রিকতা চর্চার পরিসরে একধরণের স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই বিপ্লব কিংবা প্রতিবিপ্লব এক শ্রেণির মানুষই করেছে অন্য শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং প্রকারান্তরে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, পৃথিবীতে মানুষই মানুষের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছে উৎপাদিত সম্পদের উপর  ব্যক্তিগত মালিকানা উদ্ভবের কাল থেকে আজ পর্যন্ত। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এই উত্থানের মূলে কাজ করে মানুষের চরিত্রে বদ্ধমূল হয়ে থাকা উদ্বৃত্তশ্রম আত্মসাতের প্রবণতা এবং এই প্রবণতাকে সার্থক করে তোলে প্রতিষ্ঠিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকাঠামো, যে ব্যবস্থাকাঠামোটি আসলে সম্পদ আত্মসাতের একটি অনুকূল সমাজসাংস্থিতিক পরিসর মাত্র।

এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার এখানে অবকাশ নেই। কেবল বলি রাষ্ট্রশাসনের পরিসরে স্বৈরশাসকের আবির্ভাবকে বন্ধ করতে হলে সমাজপরিসরে জায়মান উদ্বৃত্তমূল্য আত্মসাৎ অর্থাৎ শ্রমশোষণ অথবা এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে শোষণের আর্থনীতিক প্রক্রিয়াকে প্রতিরোধ করতে হবে। তা হলেই কোনও ব্যক্তি বা পরিবার এককভাবে ৩৯৪ কোটি টাকার মালিক হতে পারবে না এবং স্বৈরশাসক হওয়ারও সম্ভাবনা একেবারেই দূরিভূত হয়ে গণতান্ত্রিকতা ফিরে আসবে। ভুলে গেলে চলবে না, সঞ্চিত সম্পদ পুঁজি হয়ে উঠে সমাজশাসনের ক্ষমতার উদ্ভব ঘটায় এবং স্বৈরশাসনের পথ উন্মুক্ত ও  নিষ্কণ্টক করে ।

আদিম সমাজে স্বৈরাচার ছিল না, দাস সমাজে স্বৈরাচারের আবির্ভাব সূচিত হয়। কারণ দাসসমাজটা বিকশিত হয়েছে শোষণভিত্তিক শ্রম সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে. তাই সমাজের ধরণটা হয়েছে একেবারেই  জবরদস্তিমূলক অর্থাৎ কর্তৃত্বপ্রবণ অথবা স্বৈরাচারী, যেটা আদিম সমাজে ছিল না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আদিম সমাজের পরবর্তী পর্যায়ে ধীরে ধীরে শ্রম সম্পর্কের উদ্ভব ঘটেছে এবং মানুষেরা মালিক ও শ্রমিক এই দুই শ্রেণিতে ভাগ হয়ে গিয়ে দাসতান্ত্রিক সমাজের সূত্রপাত করেছে।অর্থাৎ দাসতান্ত্রিক সমাজে শ্রমিকরাই ছিল দাস। যৎকিঞ্চৎ ভিন্নতা ব্যতিরেকে এখনও পর্যন্ত, এই পুঁজিবাদের শেষ পর্বে এসেও, সমাজ সেই শ্রমিক মালিকের সম্পর্ক নিয়েই টিকে আছে এবং যথারীতিশোষণভিত্তিক শ্রম সম্পর্কের নিয়মানুসারে মালিক স্বাভাবিকভাবেই স্বৈরাচারী হয়ে থাকে।  
বলা হচ্ছে, ‘স্বৈরশাসক ফিরে আসার সমস্ত পথ বন্ধ করতে হবে’। খুব ভালো কথা । এর চেয়ে ভালো কথা তো হতেই পারে না। কিন্তু কথা হলো ‘স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ বন্ধ করা’র কৌশলটা আগে আবিষ্কার করা ও তারপর কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা চাই। অন্যথায় শুধু কথায় তো আর চিড়া ভিজবে না।স্বৈরাচার নির্মূলের এবংবিধি বৈপ্লবিক ভাষণের অবতারণা নতুন কোনও ঘটনা নয়। অনুসন্ধানে হয় তো দেখা যাবে যে, ইতিপূর্বে অনেকেই অনেকবার এমন কথার অবতারণা করেছেন এবং তাঁদের কথা অন্তিমে অন্তঃসারশূন্যতা প্রসব করেছে। এর একটা ঐতিহাসিক কারণও আছে। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিতএই সমাজটাসভ্যতাটা তার শহর, যন্ত্রপাতি, পারমাণবিক অস্ত্র, আন্তর্জালিকতা, মহাকাশযান নিয়ে যতোটাই উন্নত কিংবা অগ্রগতি লাভ করুক না কেন, প্রকৃতপ্রস্তাবে সেটা আগেকার সমাজসভ্যতা বা সামগ্রিক অর্থে পুরনো সংস্কৃতির দাস ও মালিকদের সংস্কৃতিরই ধারবাহিকতা মাত্র। শ্রমিক ও পুঁজিপতি মানে দাস ও দাসমালিকের পুঁজিবাদী বিবর্তন। একদা দাসের শ্রম আত্মসাৎ করে বেঁচে থাকতো মালিক। এখন শ্রমিকের শ্রম আত্মসাৎ করে বেঁচে থাকে পুঁজিপতি। স্থানকালপাত্র সবই বদলেছে কিন্তু শ্রম আত্মসাতের প্রক্রিয়ার মর্মগত কোনও পরিবর্তন ঘটে নি। উদ্বৃত্তশ্রম তথা উদ্বৃত্তমূল্য  শোষণের কোনওপরিবর্তন ঘটে নি, পরিবর্তন ঘটেছে কেবল সমাজ কাঠামোর এবং পরিবর্তিত সমাজকাঠামোর ভেতরে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণের, মানুষ কর্তৃক মানুষ শাসনের নিয়ম কার্যকর থেকে গেছে এবং এই নিয়মের উপরভর করেই দেশ শাসনের ক্ষমতায় স্বৈরাচারের উদ্ভব ঘটেছে এবং ঘটছে। এতে শাসক হিসেবে হাসিনা ও খালেদার  মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সুতরাং মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ বন্ধ না করা গেলে স্বৈরাচারের আবির্ভাবকেও ঠেকানো যাবে না। এই সহজ কথাটা বুঝতে হবে। 
সুনামগঞ্জ \ ২৩ মার্চ ২০২৫।
 

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার