লৈঙ্গিক সম্পর্ক ও ধর্ষণপ্রবণতা প্রসঙ্গে  

প্রকাশিত: ০৪ মে, ২০২৫ ০৭:০৫

প্রসঙ্গটা যদি ধর্ষণ হয়, তবে বলতেই হয়, এখানে লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নির্মম অত্যাচার ও দুর্নীতির চর্চা অব্যাহত, অপ্রতিরোধ্য ও প্রতিকারহীন। তার সিংহভাগ ঘটে লোকচক্ষুর অন্তরালে এবং এই ক্ষেত্রের বাড়াবাড়িটা মাঝেমধ্যে দন্তব্যাদন করে সর্বসমক্ষে যৌনসংস্কৃতির প্রসূন প্রস্ফোটনে কসুর করে না। ধর্ষণের শিকার ছোট্ট মেয়ে আসিয়ার মৃত্যুতে দেশে তোলপাড় শুরু হয়, পত্রপত্রিকায় তুমুল উষ্মার অগ্নিবৃষ্টি ঘটে। কিন্তু যথারীতি লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদ্ভূত ধর্ষণ জায়মান থেকেই যায়, মূলোৎপাটন কীছুতেই হয় না এবং একটি সর্বাস্তৃত অবক্ষয় বিরাজ করে দেশমানচিত্রের সর্বত্র।  এই অবক্ষয় নিয়ে গত ২৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে পত্রিকান্তরে ‘নারী ও শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ’ শিরোনামে সংবাদপ্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, তাতে লেখা হয়েছে-- “প্রচলিত বৈশি^ক ও জাতীয় আর্থসামাজিক অবস্থায় পূর্বের ধারাবাহিকতায় অবক্ষয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে নারীর উপর শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তা আরও তীব্রতর হয়ে উঠেছে। ,,, সা¤্রাজ্যবাদ ও তাদের এ দেশীয় দালাল, লুটপাটকারীরা স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বলির শিকার করে নারী ও শিশুদের। সা¤্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনায় নয়া ঔপনিবেশিক এ দেশকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করতে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রক্রিয়ায় নারী-শিশু ও জনগণের উপর ভয়ংকরভাবে আঘাত করা হচ্ছে।” এই প্রতিবেদনটিতে লৈঙ্গিক সম্পর্কের বিস্তারকে অন্দর-বন্দরের সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গভীরে গলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন যেনো মনে হয়, প্রসারণটা একটু বেশি হয়ে গেছে। 

এইসব সুবিস্তৃত কাÐকারখানার ভেতরে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’-এর আইন সহায়তামূলক কার্যক্রমের কার্যকারিতা ও সমাজে তার ইতিবাচক প্রভাবের কারণে ধর্ষণ ঘটনায় মামলা দায়ের হয় এবং হচ্ছে, সংখ্যায় কম হলেও। অদূর অতীতে এবংবিধ লৈঙ্গিক সম্পর্কসঞ্জাত লজ্জাকর ঘটনা চাপা পড়ে যেতো, এখন ক্ষেত্রবিশেষে  তার ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন একজন ধর্ষিতা কিশোরী ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’-এর অধীনে সরকারি আইনি সহায়তা নিয়েছেন, যিনি ইতোমধ্যে এক সন্তানের জননী। তাঁকে নিয়ে একজন (তিনি সৈয়দা শিরীন আখতার : অ্যাডভোকেট, জর্জকোর্ট, সিলেট) দৈনিক প্রথম আলোর (২৮ এপ্রিল ২০২৫, পৃষ্ঠা : ১৬) পাতায় একটি বয়ানভাষ্য পেশ করেছেন। শুরুতেই বলেছেন, “সদ্য কৈশোর পেরোনো মেয়েটি আমার চেম্বারের দরজায় দাঁড়ানো। রোগা, ছিপছিপে গড়নের শ্যামলা রঙের মেয়েটি। নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, তার নাম নয়নতারা ( ছদ্মনাম)। তার সঙ্গে পাঁচ ছয় বছরের একটি মেয়ে। আমাকে জানাল, জেলা লিগাল এইড অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে।” ক’বছর আগে মেয়েটি ধর্র্ষিত হয়েছিল। মেয়েটিকে ধর্ষণের ঘটনার বয়ান দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “নয়নতারাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু জিজ্ঞাসা করে জানলাম, তার বাবা ছোট বেলায় মারা গেছেন, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তার বয়স যখন ১৩, তখন তার মা তাকে পাশের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেন। গৃহকর্তার যুবক ছেলে নয়নতারাকে উত্যক্ত করতে থাকে; কিন্তু নয়নতারা লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারে না। নানা প্রলোভনে ছেলেটি নয়নতারার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এক পর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে মা টের পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে সব কিছু খুলে বলে। নয়নতারার মা যুবকটির মা বাবার কাছে বিচার নিয়ে গেলে তারা উল্টো নয়নতারা ও তার মাকে বকাঝকা করে বিদায় করে দেন। নয়নতারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছেও বিচার পায় না। নয়নতারার মা মেয়েকে নিয়ে কোর্টে এসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয় নি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। অথচ নয়নতারার কোলে রয়েছে একটি জীবন্ত শিশু।”

পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি না পাওয়া সন্তানের জননী নয়নতারার এই মাতৃরূপের মূর্তনির্দিষ্ট জীবনবাস্তবতা প্রমাণ করে ধর্ষণ  মানবযৌনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ, কারণ এই লৈঙ্গিক সম্পর্কের বাস্তবতাটি পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর সাধারণ অধিকার প্রতিষ্ঠার বিকৃত ও নির্মম রূপ। লৈঙ্গিক সম্পর্ক কিংবা মানবযৌনতার একটি নির্দিষ্ট ক্রমবিবর্তন আছে এবং অনুমিত হতেই পারে যে, লৈঙ্গিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধর্ষণচর্চার ইতিহাসটাও সেই ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোত, কালচক্রের পাকে পড়ে সেটির রূপ বদলে যায় এবং ইতোমধ্যে অনিবার্যভাবে বদলে গেছে। সমাজ আদিম গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে দাসতন্ত্র, দাসতন্ত্র থেকে সামন্ততন্ত্র ও  সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিতন্ত্রের পরিক্রমা শেষে যথারীতি তার বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায় সা¤্রাজ্যবাদে পৌঁছে গেছে অর্থাৎ পুঁজিবাদ নিঃশেষ হয়ে সমাজটা অনিবার্যভাবে একটা নতুন সামাজিক আর্থনীতিক গঠনরূপ লাভ করবে। ইতিহাসের অনিবার্য ভবিতব্য এটাই। আমরা এখন পুঁজিতন্ত্রের মরণোন্মুখ সামাজিক অর্থনীতিক গঠনরূপের পরিসরে বাস করছি। উক্ত প্রত্যেক তন্ত্রযুগেই লৈঙ্গিক সম্পর্ক সামাজিক আর্থনীতিক গঠনরূপের সঙ্গে তাল রেখে বলা বাহুল্য বদলে গেছে। বহুমাত্রিক মানবযৌনতার অথবা লৈঙ্গিক সম্পর্কের  সার্বিক স্বরূপালোচনা এখানে সম্ভব নয় এবং আমি তেমনবিধ সবজান্তা কেউ নই। সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্রের পরিসরে গৃহাভ্যন্তরস্থ নারীকর্মীদের ক্ষেত্রে আলোচনা সীমিত রাখাই আপাতত সমীচীন বোধ করছি। সামন্তযুগে নয়নতারার মতো গৃহকর্মী নারীর অস্তিত্ব ছিল। তখন সামন্তরাজা-জমিদার কিংবা অভিজাত ধনকুবেরদের প্রাসাদ-বাটির অন্দরে তাঁরা কেমন ছিলেন একটু খতিয়ে দেখা যাক। তা হলেই বুঝা যাবে নয়নতারার সঙ্গে যা কীছু হয়েছে সেটা উদ্ভট কীছু নয়, বরং যথারীতি সমাজ থেকেই উদ্ভূত একটি সামাজিক চর্চাগত বাস্তবতা, যেটাকে সমাজ আপাত দৃষ্টিতে লোকদেখানোভাবে মেনে নিতে পারছে না, কার্যত নারীর উপর সাধারণ যে অধিকার গোপন রয়েছে সেটাকে আইনসম্মত করে নেওয়ার সফলতার ভÐামিতে পুরুষ বুঁদ হয়ে আছে। একালের মানুষেরা লৈঙ্গিক সম্পর্কসঞ্জাত ব্যভিচারকে, যা ধর্ষণ ও দলবদ্ধধর্ষণ আকারেওপ্রকটিত, বাইরে লোকদেখানোভাবে মেনে নিতে পারছে না বটে, কিন্তু লজ্জার সুবাসিত রুমাল দিয়ে সযতেœ আবৃত করে ভেতরে ভেতরে মনের কোণে গোপনে লালন করছে এই ব্যভিচারকেই, মনমন্দিরের অন্দরে লুকিয়ে রাখা এই ব্যভিচার বাঙালির প্রিয় ভÐামি-- তার সহজ সৌখিনতা। আসলে মানবজাতির স্বাভাবিক লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্বিচার যৌনচর্চার বিষয়টি এখন ‘লজ্জা’র আবরণে ঢাকা পড়ে ‘ব্যভিচার’ হয়ে উঠেছে মাত্র এবং বলা বাহুল্য বাঙালি সযতেœ তা লালন করে চলেছে। তার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস-এর লেখায়, পুঁজিবাদী সমাজে বুর্জোয়া (সম্পত্তির মালিক) শ্রেণির লৈঙ্গিক সম্পর্ক তথা যৌনজীবনের বয়ান পেশ করতে গিয়ে তাঁরা বলেছেন, “সামান্য বেশ্যার কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া হল, মজুরদের স্ত্রী-কন্যা হাতে পেয়েও আমাদের বুর্জোয়ারা সন্তুষ্ট নয়, পরস্পরের স্ত্রীকে ফুঁসলে আনাতেই তাদের পরম আনন্দ।” (কমিউনস্ট পার্টির ইশতেহার \ কার্ল মার্কস ফ্রেডারিক এঙ্গেলস রচনা-সংকলন, প্রথম খÐ, প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭২,  পৃষ্ঠা ; ৪৩।) এই বক্তব্যের নির্গলিতার্থ পুঁজিবাদী  সমাজের বুর্জোয়াদের লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্বিচার যৌনাচারকেই আভাসিত করে। যে-কোনও সচেতন পাঠকের পক্ষে বুর্জোয়াদের একপতিপতিœ বিবাহের দৃশ্যমান ধারার তরঙ্গাভ্যন্তরে ফল্গুধারার মতো বহমান উক্ত নির্বিচার যৌনাচারের ধারাকে পরকীয়া ও ধর্ষণের জায়মানতার মধ্যে প্রত্যক্ষ করা খুব সাধ্যাতীত কীছু একটা হবে বলে মনে হয় না। 
সুদূর অতীতে একদা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তির পরে সে-সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্র্ণয় করা অনিবার্য হয়ে উঠে। এই অনিবার্যতা স্ববীর্যসঞ্জাত সন্তানের অপরিহার্যতাকে আমন্ত্রণ করে  প্রকারান্তরে লৈঙ্গিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে  একপতিপতিœ বিবাহের প্রচলন ঘটে। বিবাহ সম্পর্কে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস বলেন, “প্রথমে লোকে ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহিত হয়ে যেত বিপরীত লিঙ্গের গোটা সমষ্টির সঙ্গে। সমষ্টি-বিবাহের পরবর্তী ধাপগুলিতে বিবাহের পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে এলেও সম্পর্কটা সম্ভবতঃ আগের মতোই ছিল। জোড়বাঁধা বিবাহে মায়েরা সাধারণতঃ ছেলেমেয়েদের বিয়ে ঠিক করত এবং এখানেও গোত্র সংগঠনে ও উপজাতির মধ্যে কী ধরণের নতুন কুটুম্বিতা সূত্রে দম্পতির প্রতিপত্তি বাড়বে সেই বিচারই ছিল নির্ধারক। এবং পরে যখন সাধারণ সম্পত্তির তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রাধান্য এবং উত্তরাধিকারের স্বার্থে পিতৃ অধিকার ও একপতিপতিœ প্রথা প্রতিষ্ঠিত হল, তখন বিবাহ সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক বিচার-বিবেচনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল।” (পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি \ রচনা-সংকলন, দ্বিতীয় খÐ,  প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭২, পৃষ্ঠা : ২৩৪।) 
পিতৃ-অধিকার প্রতিষ্ঠিত সামন্তযুগে যে-নারীরা গৃহকর্মের কাজ করতেন তাঁরা ছিলেন দাসী অথবা ক্রীতদাসী-- ব্যতিক্রম বাদে সাধারণত দাসের নয় দাসীর কন্যাসন্তান তাঁরা। তাদের পিতৃপরিচয় বলে কীছু ছিল না। তাঁদের মা ছিলেন, নানি ছিলেন, তারও উর্ধে পরনানি কেউ হয় তো ছিলেন, কিন্তু এই নারীদের কারও স্বামী ছিলেন না বলে তাঁদের কারও বাবা, দাদা, দাদি বলে কেউ ছিল না।  কিন্তু সন্তান ছিল, যেমন সন্তান আছে নয়নতারার। রাজা-জমিদার বা তার স্বজন-আত্মীয় পুরুষদের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে তাদের বীর্যে দাসীর গর্ভে যে সন্তানের  জন্ম হতো সেই সন্তানকে  পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হতো না, যেমন নয়নতারার সন্তানকে দেওয়া হয় নি। শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের জমিদারের ধর্ষণের শিকার গর্ভবতী কাজের মেয়ে হুরমতির গভের্র সন্তানকে জমিদার স্বীকৃতি দেয় নি, বরং জনসমক্ষে এই অবৈধ গর্ভধারণের জন্য হুরমতিকে জমিদার নিজেই বিচার করে শাস্তি দিয়েছিল, তামার পয়সা গরম করে তার কপালে কলঙ্ক চিহ্ন এঁকে  দিয়ে। রাজার প্রাসাদের দাসী, সংশপ্তক উপন্যাসের জমিদারের ঘরের কাজের মেয়ে হুরমতি এবং প্রতিবেশী মধ্যবিত্তের ঘরের কাজের মেয়ে নয়নতারা তাঁরা সকলেই ধর্ষিতা। ভিন্ন ভিন্ন সময় ও সমাজসাংস্থিতিক পরিসরে তাঁদের জীবন অতিবাহিত হলেও শ্রেণিবিভক্ত সামাজের শ্রমশোষণের নিয়মানুবর্তিতার নিরিখে নির্ণিত তাঁদের সামাজিক মর্যাদাগত অবস্থান ধর্ষিতার অতিরিক্ত কীছু নয় কখনওই, তাঁরা তাঁদের সন্তানের পিতার স্বীকৃতি পাওয়া থেকে বঞ্চিতই থাকেন। এই অর্থে সকল ধর্র্ষিতার সামাজিক অবস্থান একই, স্থানকালের ব্যবধান যতোই থাক। 
একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পুরুষকে তৃপÍ করার যোগ্যতা নারীর  শরীরে থাকে। সামন্তযুগে সামন্তদের গৃহে নিয়োজিত গৃহকর্মী নারীর সে-শরীরিক যোগ্যতাসমৃদ্ধ সময়ের আগাগোড়া সবটুকু ব্যয়িত হয়েছে কেবল ধর্ষণচর্চায়। গৃহকর্মী নারী হয় তো কে তাঁর পিতা মায়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, কিন্তু জীবনে কোনও দিন বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারেন নি। সামন্তযুগের গৃহকর্মী নারীরা দাসী অথবা ক্রীতদাসী ছিলেন, পুঁিজবাদী যুগের গৃহকর্মী নয়নতারা স্বাধীন, তিনি শ্রমিক বটে কিন্তু দাসী বা ক্রীতদাসী নন। তফাৎ এইটুকুই। অবশ্য আর একটা তফাৎ আছে, হুরমতির সময়ে ও তার আগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল’ কিংবা ‘লিগাল এইড’ ছিল না, নয়নতারার পুঁজিবাদী সময়ে  সেটা আছে। সামন্তবাদ অতিক্রম করে পুঁজিবাদে পদার্পণ করে শ্রমজীবী নারী তাঁর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে পারার এইটুকু জায়গা পেয়েছেন, কিন্তু ধর্ষিত হওয়ার নিষ্ঠুরতাকে প্রতিহত করতে পারার কোনও অব্যর্থ অস্ত্র এখনও তাঁর হস্তগত হয় নি। পুঁজিপতি উদ্বৃত্তমূল্য শোষণের লোভে, কিংবা সোজাকথায়, মুনাফা অর্জনের লোভে  বিশ^জুড়ে শ্রমজীবী  মানুষকে সকল মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে, নয়নতারা তার ব্যতিক্রম নন। সামন্তগৃহের নারীকর্মী ধর্ষণজাত সন্তানের পিতৃপরিচয় যেমন পান না, পুঁজিপতির গৃহের নারীকর্মী  নয়নতারাও ধর্ষণজনিত তাঁর সন্তানের পিতৃপরিচয় থেকে বঞ্চিত হন। 
সামন্তযুগের গৃহকর্তারা গৃহকর্মী নারীর সঙ্গে যে-ধরণের শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলতেন, এখনও এই  পুঁজিবাদীযুগের গৃহকর্তারা গৃহকর্মী নারীর সঙ্গে  হুবহু একই সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই একটি বিষয়ে কোনও ব্যতিক্রম কার্যকর নয়। এখানে এই বয়ান পেশ করার কারণ এই যে, সমন্তবাদী সময়ে সামন্ত পরিবারগুলোর দাসীদের সঙ্গে এমনটাই চলতো। সেটা চলতো প্রকাশ্যে ও সমাজসম্মত প্রক্রিয়ায়। কিন্তু নয়নতারার সঙ্গে গৃহকর্তার যুবক ছেলের শারীরিক সম্পর্কটি সমাজসম্মত নয়, সমাজকর্তৃক অবৈধ বলে ঘোষিত ।  সামন্তযুগের দাসীরা ছিলেন ঘনকন্নার সকল কাজ করার পাশাপাশি পুরুষদের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে তাদেরকে তৃপ্ত করার কাজে নিয়োজিত কামিনী বিশেষ। আগেই বলেছি, দাসীদের গর্ভজাত সন্তানের পিতৃত্বের দায়ভার স্বীকার করা হতো না বলে  উত্তরসূরি হওয়ার অধিকারবঞ্চিত হয়ে সে সন্তানকে বেঁচে থাকতে হতো, দুর্বিষহ অপমানের বেদনা বহন করে। তাঁদের অভিযোগ করার কোনও জায়গা কিংবা কোনও সামাজিক সংস্থা ছিল না, এখন যেমন আছে এবং নয়নতারা যথারীতি অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ করলেই অধিকার পাওয়া খুব একটা সহজ নয় যদিও, বিভিন্ন রকমের প্রতিবন্ধকতা আছে। 

নয়নতারা একজন কন্যাশিশু। তিনি পুরুষ কর্তৃক অপহৃত হন নি, হতে পারতেন। যেমন এই দেশে কন্যাশিশুরাসহ নারীরা প্রায়ই অপহৃত হয়ে ধর্ষিত হয়ে থাকেন এবং আদালতে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগও দায়ের হতে দেখা যায়। সামন্তযুগে কিন্তু এমন অভিযোগ পেশের কোনও অবকাশ ছিল না, এখন যেমন আছে। এমন কি অদূর অতীতেও এমনটি হতো না। বড়জোর গ্রামীণ পঞ্চায়েতে বিচার-সালিস বসতো, ভোক্তভোগী নারীকে প্রকারান্তরে পতিতা বা বেশ্য বলে দাগিয়ে দেওয়া হতো, ধর্ষক পুরুষটির মানসম্মানের কোনও অবনতি হতো না। এ কারণেই বোধ করি, বাংলা বা সংস্কৃতে বেশ্যার কোনও লিঙ্গান্তর নেই। 

প্রসঙ্গক্রমে এখানে একজন কন্যাশিশু অপহরণের অভিযোগ সংক্রান্ত সংবাদভাষ্য তোলে ধরছি। পত্রিকান্তরে (দৈনিক সুনামকণ্ঠ, ২৮ এপ্রিল ২০২৫, পৃষ্ঠা : ১) বলা হয়েছে, “অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম (১৩) জামালগঞ্জের একটি মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী। মাদ্রাসায় আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই ছাত্রীটিকে উত্ত্যক্ত করতো সাইফুল আলম। গত বৃহস্পতিবার বাড়ি যাওয়ার পথে কিশোরীটিকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে সারাদিন রেখে রাতে ভীমখালি ইউনিয়নের কলকতখাঁ গ্রামে সাইফুলের বন্ধু বদরুলের বাড়িতে নিয়ে যায় এবং রাতে কিশোরীটিকে ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে শুক্রবার সকালে সাইফুল মেয়েটিকে তার গ্রামের বাড়ি ফেনারবাক ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে ভিকটিমের বড়বোন বাদী হয়ে জামালগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১৩, তারিখ ২৬/৪/২০২৫ইং।”

এবংবিধ নিত্যকার পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনীতিক ও আর্থনীতিক অপকর্মের সঙ্গে তাল রেখে এমনকি ধর্ষণচর্চাও বাড়ছে, যাকে কেউ কেউ বাড়াবাড়ি বলতে কসুর করছেন না। পত্রিকায় (খবরের কাগজ, ২৯ এপ্রিল ২০২৫, মঙ্গলবার, পৃষ্ঠা : ১১) সংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে, “মার্চে নির্যাতনের শিকার ৪৪২ নারী ও কন্যাশিশু”। বলা হয়েছে, “এ বছরের মার্চ মাসে ৪৪২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছ্ েএর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১২৫ কন্যাশিশুসহ ১৬৩ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮ কন্যাশিশুসহ মোট ৩৬ জন, দুজন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। দুজন কন্যাশিশু ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া ৫৫ জন কন্যাশিশুসহ ৭০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। গতকাল সেমাবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া বেগম শান্তি।” এবংবিধ তথ্য প্রমাণ করে যে, দেশে ধর্ষণচর্চা বেড়েছে. যাকে বাড়াবাড়ি বলাই যায়। কারও কারও মতে সম্প্রতি ধর্ষণচর্চা মহামারির আকারে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও কেউ এই অভিমতকে অস্বীকার করে বলে দিতেই পারেন-- মহামারি নয়, তবে ততোটা না বাড়লেও কমে নি যে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এবং একটু বিশ্লেষণপ্রবণ হয়ে এও বলে দিতে পারেন যে, আসলে সমাজে আগে যেমন ধর্ষণ ছিল এখনও তেমনটাই আছে। আনাচে-কানাচে, আড়ালে-আবডালে প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর ধর্ষণরূপ এই নির্যাতন। লোকচক্ষুর আগোচরে যে-গুলো হচ্ছে, সে-গুলো তো কোনও হিসেবই আসছে না, লোকে জানতে পারছে না। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল’ কিংবা ‘লিগাল এইড’-এর মতো আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের প্রসারের পরিসরে যোগাযোগ মাধ্যমের প্রযুক্তিগত সুবিধাবিস্তারের কল্যাণে ধর্ষণের ঘটনার সংবাদগুলো জনসমক্ষে বেশি প্রচার লাভ করছে। এই কারণে মনে হচ্ছে যে, পুরুষতান্ত্রিকতার আধারে ধর্ষণপ্রবণতা সম্প্রতি মহামারি আকারে পর্যবসিত হয়েছে। এই যুক্তি মেনে নিলেও সমাজে জায়মান পুরুষতান্ত্রিকতারআধারে ধর্ষণপ্রবণতার শক্তিধর অভিঘাতাকে স্বীকার করে নিতেই হয়, কোনও  যুক্তিতেই অস্বীকার করা যায় না। 

বেশ কয়েক বছর আগে জেলার বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার ভারত সীমান্তলগ্ন শাহ আরেফিনের মোকামের আশেপাশের কোথাও দিনদুপুরে সংঘটিত একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও আন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়ের্ছিল। তরুণীটি তার তরুণ বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। পাঁচছয় জন তরুণ মিলে তরূণীর বন্ধুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে তরুণীর সঙ্গে অপকর্মটি করে। বিচারে অপরাধীদের শাস্তিও হয়েছিল। সারা দেশের পরিসরে সংঘটিত  এবংবিধ দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পরিসংখ্যান নিলে সংখ্যাটা একবারে কম হবে বলে মনে হয় না, বাড়বাড়ি পর্যায়ের বিশাল হয়ে যেতে পারে। বলতে চাই, আসলে ধর্ষণপ্রবণতা যেমন ছিল তাই আছে। অর্থাৎ বর্তমান সমাজের পক্ষে ধর্ষণের ঘটনাগুলো স্বাভাবিক, এগুলো ঘটতো, ঘটছে এবং ঘটবেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটাকে কারও কারও কাছে বাড়াবাড়ি বলেই মনে হচ্ছে।

 নারীর প্রতি প্রতিহিংসামূলক ঘটনার পুনরাবৃত্তিত, যা অহরহ ঘটেই চলেছে, এবংবিধ লৈঙ্গিক সম্পর্ককে কোনও অবস্থাতেই  কোনও বিবেকবান মানুষের পক্ষেই বরদাস্ত করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থার প্ররিপ্রেক্ষিতে বলতেই হয় যে, আমরা এমন এক লৈঙ্গিক সম্পর্কসম্পন্ন সমাজে বাস করি, যেখানে জানমালের কোনও নিশ্চয়তা তো নেইই, এমনকি ‘মেয়ে মানুষ’ নামে দাগিয়ে দেওয়া মানুষের তথাকিথিত ‘সতিত্ব’ রক্ষারও কোনও উপায় নেই। প্রকারান্তরে মুক্তযৌনতার দেশে পর্যবসিত হয়ে গেছে এই দেশ। এখানে অপ্রাপ্ত বয়সের মেয়েরাও পুরুষের যৌনাগ্নির তাপে দগ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সমাজ কথায় ধর্ষণবিরোধী হলেও কাজে ধর্ষণবিরোধী হতে পারছে না। আসলে আমাদের সমাজটাই পুরুষের ধর্ষণপ্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্র, আইন প্রয়োগে নিয়োজিত সংস্থা, ধর্মপ্রাণ মানুষেরা, সমাজপতি ও তার চেলাচামুÐারা কেউই ধর্ষণের বিরুদ্ধে তৎপর নয়। বরং সালিশ কিংবা নিষ্পত্তি বিচার ইত্যকার কার্যপ্রহসনাদির মাধ্যমে ধর্ষককে রক্ষার উপায়সংস্কৃতির চর্চা চলছে দেশের সর্বত্র। কারণ ধর্ষক একজন পুরুষ। আপাতত গণমাধ্যমের সম্প্রচার অন্তত তাই বলে। যেখানে বিশে^র কোনও কোনও দেশের মতো ধর্ষণ সমাজস্বীকৃত নয়, অথচ ধর্ষণ প্রতিনিয়ত চলছে এবং ধর্ষকের শাস্তি ব্যতিক্রম বাদে প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন এই সমাজ ব্যবস্থাটিকে ভÐদের আখড়া বলে দাগিয়ে দিতেই ইচ্ছে করে এবং বলতে ইচ্ছে করে, এখানে আসলে নিষিদ্ধতার আড়ালে  ধর্ষণ একটি সমাজস্বীকৃত বিষয়। বাঙালি প্রকাশ্যে ধর্ষণকে ঘৃণা করে কিন্তু অন্তরে সে নিজেই উৎকৃষ্ট ধর্ষক। বাঙালির এই ভÐামির কোনও তুলনা হয় না। 
যৌনতা নিয়ে ভÐামিহীনতার একটি উদাহরণ উদ্ধৃত করছি, যেটা আমদের সমাজে কল্পনাতীত, কিন্তু দৃশ্যমানতার আড়ালে বাস্তবিক অর্থে বাস্তব । “সেখানে একটি মেয়ে যদি বিয়ের আগে অন্তত একটি সন্তান জন্ম দিতে না পারে তবে সেই মেয়ের আর কখনো বিয়েই হবে না। কেনো না বিয়ের পরে সে সন্তান জন্ম দিতে পারবে এমন নিশ্চয়তা তারা কেমন করে পাবে? তাদের চাই অজ¯্র সন্তান। তাই জাম্বিয়াতে প্রতিটি পরিবারের কুমারী মেয়েদের অন্তত একটি করে সন্তান আছে। ... এখানে মেয়েদের বারো বৎসরের পরে পূর্ণ যুবতী হিসাবে ধরা হয; এমনকি নিজেদের বসবাসের বাড়ির বাইরে কুমারী মেয়েদের জন্য একটি করে অস্থায়ী টং ঘর তুলে দেওয়া হয় যাতে মেয়েরা সেখানে ছেলেদের ডেকে এনে নিজেদের ইচ্ছামাফিক সেক্স করতে পারে। এটা আফ্রিকান মেয়েদের মৌলিক অধিকার হিসাবে ধরা হয়। বিয়ের পূর্বে বাচ্চা নেওয়াটা ওদের এখনো স্বাভাবিক একটি পারিবারিক প্রথা।” [কমোডর শহীদ সরওয়ার নিজাম (অব.), কালো মানুষের দেশ আফ্রিকায় ৬১ মাসের ভ্রমণ ও স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও সম্পাদনা : রাশেদ মামুন, শোভা প্রকাশ ঢাকা, ফেব্রæয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা :  ২৭।] । এবংবিধ লৈঙ্গিক সম্পর্কসম্পন্ন সামাজিক সংস্কৃতির অধিকারী অনেক জাতি এখনও বিশ^ পরিসরে বিভিন্ন দেশে বিরাজ করছে। অধিকাংশ সভ্য দেশেই ‘সিঙ্গল মাদার’-এর সামাজিক স্বীকৃতি একটি সাধারণ ব্যাপার অথবা প্রথা, লজ্জার কোনও বিষয় নয়। পিতৃপরিচয়হীন মানুষ সচ্ছন্দে  সমাজের সকল মানুষর সঙ্গে উঠসব চলাফেরা করছে, কোনও বিঘœ তৈরি হচ্ছে না, ব্যক্তিগতভাবে কেউ তাকে হেয় প্রতিপন্ন করছে না। আমাদের বাঙালি সমাজে  ‘সিঙ্গল মাদার’ বা জাম্বিয়ার মেয়েদের  মতো ‘বিয়ের পূর্বে বাচ্চা নেওয়াটা’ ধর্মসম্মত নয় এবং সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত ঘৃণ্য একটি বিষয়। কিন্তু আমাদের সমাজ  ‘বিয়ের পূর্বে বাচ্চা নেওয়াটা’ রহিত করে ‘বিয়ের আগে বাচ্চা হওয়া’ বা বিবাহবহির্ভূত যৌনসংসর্গের ঘটনাকে প্রতিরোধ করতে পারছে না, এমন কি আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করা পর্যন্ত ব্যাহত ও ব্যর্থ  হচ্ছে। যে-পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বিবাহবহির্ভূত যৌনসংসর্গকে নিষিদ্ধ করেছে সে-পুরুতান্ত্রিকতাই এই নিষিদ্ধ কাজের সঙ্গে একান্ত গোপনে জড়িত হয়ে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের মতো অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। নিষিদ্ধতার কারণে সৃষ্ট সকল কলঙ্ক নারীর ঘাড়ে বহন করতে দিয়ে পুরুষ ক্ষিপ্ত কুকুরের মতো ধাওয়া করে ফিরছে নারীর পিছনে পিছনে, জন্ম দিচ্ছে অবৈধ সন্তান, নারীকে বেশ্যা অভিধা দিয়ে যথারীতি পিতৃত্ব অস্বীকার করছে। অর্থাৎ প্রকৃতপ্রস্তাবে বাইরে সমাজটা বিবাহবহির্ভূত যৌনসংসর্গের অথবা নির্বিচার যৌনাচারের বিরোধী কিন্তু নিতান্ত গোপনে সেটার বিরোধী নয়, বরং সমর্থক, বরং ধর্ষণচর্চায় এক ধরণের অদ্ভুত তৃপ্তি বোধ করে। শেষ বিচারে এরকমটাই প্রতিপন্ন হয় যে, এখানে মানুষেরা সভ্য একটি সমাজের প্রতিনিধি বটে কিন্তু অন্তরের গভীরে প্রচÐ প্রতারক, অসভ্য ও  ভÐ। নারীকে জীবনসঙ্গিনী নয়, নিতান্ত কাপড়চোপড়ের মতো পুরুষের ব্যবহারের সামগ্রী করে তোলার এই জঘন্য দায় এড়ানোর কোনও  যুক্তি নেই এই সমাজের। 
নয়নতারার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে ? অপরাধীর মা-বাবা, মামলার তদন্ত প্রতিবেদক এবং সমাজের সাধারণ মানুষ কেউই ধর্ষিতা নয়নতারার পক্ষে দাঁড়ায় নি, প্রকারান্তরে ধর্ষকের পক্ষাবলম্বনই করেছে। কেবল পক্ষে দাঁড়িয়েছে বিজ্ঞান, যে বিজ্ঞানচর্চা এ দেশে এখনও অবহেলিত। এতে যা কীছু হচ্ছে তাতে প্রতিপন্ন হয়ে যে, এই সমাজটা আসলেই পুরুষ কর্তৃক নারীর সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার অপকর্ম করার জন্যে মুখিয়ে আছে।  যদিও বলা হয়, সমাজ তো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মানুষের যৌথযাপন। ধর্ষণের সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে বুঝা যায় যে, এমনটা সত্য নয়, প্রতারণামূলক প্রচার মাত্র। এখানে ছ’সাত বছরের মেয়েকেও ধর্ষণ করে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলছে পুরুষেরা। মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় রাস্তাঘাটে  দিনের পর দিন সপ্তম শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে উত্যক্ত করা হয়েছে, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে নি। শেষে সুযোগ বুঝে অপহরণ করে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষিতা কিশোরীকে ধর্ষকের এক বন্ধুর বাড়িতেও অন্তত এক রাতের জন্য রাখা হয়েছে। কিন্তু বন্ধু এবং বন্ধুর বাড়ির লোকেরা কীছু বলে নি, সহায়তা করেছে । পরের দিন ধর্ষিতা ছাত্রীকে তার নিজের বাড়িতে ফেরত দেওয়া হয়েছ। ধর্ষিতার পরিবার ও গ্রামের লোকেরা কীছু করে নি। প্রকারান্তরে এইভাবে এই সমাজ লৈঙ্গিক সম্পর্ককে কলঙ্কিত ও একটি অপরিণামদর্শী প্রপঞ্চ রূপে প্রতিপন্ন করে। 

ইসলাম এবংবিধ বিবাহবহির্ভূত যৌনতাকে সমর্থন করে না, বরং জঘন্য অপরাধ বলে বিবেচনা করে। ব্যভিচারে রত বিবাহিত পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য ‘রজম’-এর (কোমর পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদÐ কার্যকর করা) ধর্মীয় নির্দেশ আছে। 
এমতাবস্থায় ধর্ষককে চিহ্নিত করার জন্যে আইনকে বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হওয়ার পথ আইনগতভাবেই সুগম করে দিতে হবে। অর্থাৎ ধর্ষণের ঘটনা কিংবা মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে ধর্ষককে চিহ্নিত করে তার কঠোর দÐ নিশ্চিত কারাই অধিক সঙ্গত এবং এমন ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার খরচ অবশ্যই সরকারকে বহন করতে হবে। এই করে ধর্ষণকে প্রতিরোধ করার একটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বটে, কিন্তু মনে হয়, চিরতরে নির্মূল করা যাবে না। 
ধর্ষণকে চিরতরে নির্মূল করতে হলে ধর্ষণ যে আর্থনীতিক পদ্ধতির অভ্যন্তরে উদ্ভূত হয়েছে তার বিপরীত পদ্ধতির ভেতর দিয়ে সমগ্র সামাজিক, রাজনীতিক ও আর্থনীতিক কর্মক্রিয়ার পরিক্রমণ সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ সমাজে ব্যক্তিমালিকানা থেকে উদ্ভূত শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। তা হলেই লৈঙ্গিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে পুরুষের কাছে নারীর অধঃস্তনতা বলে কীছু থাকবে না, নারী তাঁর নিজের উপর নিজের কর্তৃত্ব ফিরে পাবেন। কেবল তখনই ধর্ষণ নির্মূল হতে পারে, এর আগে নয় এবং এর কোনও বিকল্প নেই। ভুলে গেলে চলবে না যে, ব্যক্তিমালিকনার উদ্ভব ও তার থেকে শ্রেণিভিত্তিক অসমতার আবির্ভাবের কারণে নারীর অধঃস্তনতার উদ্ভব ঘটেছে। তার আগে উৎপাদিত সম্পদের উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি থেকে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব ঘটে  এবং নারী এর অনিবার্য পরিণতিতে সম্পদ, উৎপাদিত দ্রব্য ও তার নিজের উপর কর্তৃত্ব হারায়।
সুনামগঞ্জ \ ১ মে ২০২৫।


 

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার