প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ২৩:১৬
দেশের ব্যাংক, বীমা প্রভৃতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হলো গ্রাহক আস্থা ও বিশ্বাস। এই ভিত্তি দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠান বিশেষের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত বীমা প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামি লাইফ ইন্সু্যরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, সুনামগঞ্জ শাখা প্রায় ৬০০ গ্রাহকের আমানতের মেয়াদ ১০ বছর পূর্তির পরও তাঁদের পাওনা টাকা ফেরত দিতে পারছে না। দূর—দূরান্ত থেকে টাকা ফেরত নেয়ার আশায় গ্রাহকরা ইন্সুরেন্সের অফিসে এসে বিফল মনোরথে ফিরে যাচ্ছেন বলে ওই সংবাদ থেকে জানা যায়। সংবাদ প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক তালাবদ্ধ দেখতে পান। তখনও টাকা ফেরৎপ্রত্যাশী কিছু গ্রাহককে অপেক্ষমাণ দেখতে পাওয়া যায়। ইন্সু্যরেন্স কোম্পানিটির সুনামগঞ্জ অফিস প্রধান তথা সহকারি আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মেহেদি হাসান সুনামগঞ্জের খবরকে ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়কালের লুটপাটের চাপ এই প্রতিষ্ঠানেও পড়েছে’ উল্লেখ করে বলেন, মানুষের চাপ সামলাতে না পেরে তিনিও অফিসে কম আসেন। আমানতকারী গ্রাহকদের টাকা ফেরতের বৈধ দাবিকে উপেক্ষা করে অফিসে না আসার মতো পলায়নমনোবৃত্তি কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অবশ্য তিনিই বা কী করবেন ? মেয়াদ শেষ হওয়া দাবিপ্রত্যা্শীদের টাকা ফেরৎ দেয়ার সিদ্ধান্ত আসে প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে। সেখান থেকে কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না, ফলে তিনি গ্রাহকদের নিকট থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করছেন। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে বীমার গ্রাহক সৃষ্টি করে আমানত সংগ্রহ করে। এই গ্রাহকদের অধিকাংশই সমাজের প্রান্তিক অবস্থানের। অনেক কষ্ট করে এই প্রান্তিক গ্রাহকরা ইন্সু্যরেন্সে টাকা জমিয়েছিলেন সুদিনের প্রত্যাশায়। কিন্তু তাঁদের কাক্সিক্ষত সুদিন এখন চরম দুর্দিনে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সুনামগঞ্জ শাখার এই ৬০০ গ্রাহকের আড়াই কোটি টাকা ফেরৎ দেয়ার নিশ্চয়তা এখন কে দিবেন ?
গত আওয়ামী সরকারের সময়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক দখলদারিত্ব ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা সকলের জানা। বলা চলে বেপরোয়া দস্যুবৃত্তি চলেছে কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। কয়েকটি ব্যাংক এখন গ্রাহকদের সঞ্চিত টাকা ফেরৎ দিতে পারছে না। ফারইস্টও যে ওই সময়ের আর্থিক ব্যভিচারের শিকার হয়েছিলো তা প্রতিষ্ঠানটির সুনামগঞ্জ অফিস প্রধানের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার। কিন্তু এর দায় কখনও সাধারণ গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপানো সম্ভব নয়। ফারইস্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশ^স্ত করেছেন যে, আমানতকারীদের আস্তে আস্তে সকল দাবিই পরিশোধ করা হবে। প্রয়োজনে তাঁরা নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে এই দায় শোধ করবেন। এজন্য নাকি মেয়াদ পূর্তির তারিখের ভিত্তিতে একটি ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই ক্রম অনুসারে পর্যায়ক্রমে সকলেই টাকা ফেরত পাবেন। প্রতিষ্ঠানটির যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে হয়তো এই সংকট একসময়ে কাটিয়ে উঠা যাবে। কিন্তু ওই সদিচ্ছা রয়েছে কি—না সে নিয়েই প্রচণ্ড সন্দেহ তৈরির অবকাশ রয়েছে। গ্রাহকদের পক্ষে কথা বললে নাকি প্রধান কার্যালয় অতিশয় রুষ্ট হয়। গ্রাহকস্বার্থে কথা বলায় তিনজন ইনচার্জ চাকুরি হারিয়েছেন, এমন ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সুনামগঞ্জ অফিস প্রধান। প্রতিষ্ঠানের উঁচু থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত তো সকলেরই গ্রাহক স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়ার কথা। গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হরে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে কোন্ ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ? অবস্থাদৃষ্টে অনুমিত হয়, ইন্সুরেন্স কোম্পাটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সদিচ্ছার প্রবল ঘাটতি বিদ্যমান। নতুবা তাঁরা এমন আচরণ করতে পারতেন না। এ বিষয়ে সরকারের বীমা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে বলে আমরা মনে করি। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের চাপে রেখে কেন্দ্রীয় অফিস দায় এড়ানোর চেষ্টা করবে, এমন অবস্থা মেনে নেয়ার মতো নয়। আরও আশ্চর্যের কথা হলো, প্রতিষ্ঠানটি তার কর্মীদের নিয়মিত বেতন দেয়ার সক্ষমতাও হারিয়েছে। গত দুই বছর ধরে কেউই নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, হয়রানির শিকার গ্রাহকরা অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্টদের ডাকা হবে, এছাড়া বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে। আমরা অনুরোধ করি গ্রামাঞ্চলের অসচেতন প্রান্তিক গ্রাহকদের নিকট থেকে প্রথানুগত অভিযোগের অপেক্ষা না করেই জেলা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আর অজানা হিসেবে গণ্য হওয়ার উপায় নেই। প্রতিষ্ঠানের হেড অফিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে গরিব আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া দরকার। ইন্সু্যরেন্স ঝুঁকি মোকাবিলা করে, এখন যদি ইন্সুরেন্স নিজেই ঝঁুকি তৈরি করে তাহলে কী বলার আছে ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন