প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪০
প্রাথমিকসহ দেশের সকল স্তরের শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যথেষ্ট তৎপরতা দেখাচ্ছেন। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ^ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জে টিকে থাকার মতো দক্ষ, সৃজনশীল ও ধীমান মানবসম্পদ তৈরি করাকে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সরকার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মান যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সোমবার সুনামগঞ্জ জেলা সফর করেছেন। এসময় জেলার কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শনসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের সাথে মতবিনিময় করেছেন তিনি। সুনামগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের কথা সর্বজনবিদিত। মন্ত্রীও তা জানেন। সুনামগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী সিলেট বিভাগে সবচাইতে কম শিক্ষক আছেন উল্লেখ করে বলেন, এক্ষেত্রে সুনামগঞ্জ চ্যাম্পিয়ন। অর্থাৎ সিলেট বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক শিক্ষক সংকটগ্রস্ত জেলা হলো সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ প্রধানত হাওরবেষ্টিত জনপদ। জেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দুর্গম হাওরাঞ্চলে অবস্থিত। যাতায়াত প্রতিবন্ধকতায় ভোগেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়, হাওরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয় সময়মতো পাঠদান শুরু করতে পারে না এবং সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে বহু বিদ্যালয়ে যথাযথ পাঠ দান করা সম্ভব হয় না, এমন সংবাদও হরহামেশা পাওয়া যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য সরকারের বিশেষ নীতিমালা দরকার। দেশের অন্য অঞ্চলের মতো একই নীতিতে হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করা হলে কখনও কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বুঝা যায়। মন্ত্রী বলেন, হাওর অঞ্চলসহ প্রতিকূল ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ হচ্ছে। স্কুল সময় পরিবর্তনসহ যাতায়াতের জন্য নৌকা দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে বলে মন্ত্রী জানান। দ্রুত সাড়ে চৌদ্দ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এই নিয়োগ দেয়ার পর শিক্ষক সংকট কিছুটা কমবে।
সমতল বা উন্নত অঞ্চলে একটি বিদ্যালয়ে যে অনুপাতে শিক্ষক দেয়া হয়, দুর্গম হাওরাঞ্চলের জন্য তা পরিবর্তন করে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাওরাঞ্চল দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার সাথে দারিদ্রতার অভিঘাতে জর্জরিত। অনুন্নত এইসব অঞ্চলের অভিভাবকরা সন্তানের লেখাপড়ার উন্নতির জন্য স্কুলের বাইরে বাড়িতে বিশেষ কোনোকিছু করতে পারেন না। এইসব দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যা শিখে তাই শেষ। সুতরাং এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীর পিছনে অধিক সময় ও মনোসংযোগ ব্যয় করতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করা না হলে অনগ্রসর অঞ্চলকে উন্নয়নের মূল ে¯্রাতে নিয়ে আসার জাতীয় লক্ষ্য অর্জিত হবে না। মন্ত্রী বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ক্যাচম্যান্ট এরিয়া ভিত্তিতে হয় বলে সকল অঞ্চলে পর্যাপ্ত শিক্ষক পাওয়া যায় না। হাওরসহ অনুন্নত অঞ্চলের জন্য শিক্ষক নিয়োগের এই নীতিমালায় পরিবর্তন আনা আবশ্যক। ক্যাচম্যান্ট এরিয়াকে সমগ্র উপজেলা বিবেচনা করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হলে আমাদের বিশ^াস এই সংকট থাকবে না।
শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে সরকার ইউনিফর্ম ও স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু করেছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের হীনমন্যতা দূর হবে। সকল শিক্ষার্থী একই স্তরের ভাবতে অভ্যস্ত হবে। এই মানসিক পরিবর্তনটি অতীব জরুরি। মন্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পঠন ফলাফল নিয়মিত তদারকি করার জন্য শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাহিরপুর উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের কিছু ঘাটতি দেখতে পান। এই ঘাটতি দূর করতে তিনি এক মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। বলেছেন, এ সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যেকোনো জায়গায় প্রত্যাশিত উন্নতি চাইলে তার ব্যবস্থাপনাগত উপযুক্ততা নিশ্চিত করা দরকার সর্বাগ্রে। আমাদের জেলার প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা হয় বলে মনে হয় না। তদারকি বাড়ালে পাঠদানের জায়গায়ও দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জাতির ভিত্তি তৈরির কারিগর হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতি গঠনের কাজে নিয়োজিত শিক্ষকদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের জাগৃতি ঘটলেই আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি পাব। কার্যকর ব্যবস্থাপনা কৌশল তা অর্জনে সহায়ক। শেষ কথা হলো এই, শিক্ষক সংকটে চ্যাম্পিয়ন থেকে শিক্ষার মানোন্নয়ন কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং দ্রুত জেলার শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে। হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য ইতিবাচক ধারার পরিবর্তনগুলোও দ্রুত শুরু করতে হবে। তবেই বোরো ফসলের সোনালী শীষের মতো হাওরের শিক্ষার্থীদের স্বর্ণালি সম্ভাবনার কুঁড়িগুলোও আকাশে মাথা তুলবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন