প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৭
তাহিরপুরের শান্তিপুরে ইজারাবিহীন নদীর বালু মজুদ, নদীপথে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়, যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বালুমহাল ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে ইজারার বাইরে বালু উত্তোলন ও নদীর তীর কাটার কারণে বসতভিটা ও গ্রাম বিলীন হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় শান্তিপুরের বালু মজুদ, নদীপথে অতিরিক্ত টাকা আদায়, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল, নদীভাঙন এবং নৌযান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সুনামগঞ্জ—১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন— দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে শান্তিপুরের বালু এনে মজুদ করা হয়েছে। অথচ কারা এই বালু এনেছে, তা নিয়ে প্রশাসন বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
কামরুজ্জামান কামরুল: শান্তিপুরের বালু হাওরের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ। আমি এসপি, ডিসি, ইউএনও ও ওসিকে বারবার বিষয়টি জানিয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে যে বালু রাখা হয়েছে, সেটি কারা এনেছে তা তদন্ত করতে ইউএনও এবং ওসিকে বলেছি। বালু যদি বৈধ কোনো উৎস থেকে আনা হয়ে থাকে, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু যদি শান্তিপুর থেকে অবৈধভাবে আনা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি জব্দ করতে হবে এবং যারা এনেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে আমি ইতোমধ্যে ইউএনও ও ওসিকে বলে দিয়েছি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শান্তিপুরের বালু রক্ষা করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে কেন এটি বন্ধ করা যাচ্ছে না?
কামরুজ্জামান কামরুল: সমস্যাটা হচ্ছে নগদ টাকার লোভ। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি চলে আসছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে মানুষ এভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক সময় যার জমি নদীর পাশে, সে নিজের জমি থেকেই বালু বিক্রি করে দেয়। কারণ এক লাখ বা পাঁচ লাখ টাকার জমি থেকে অনেক বেশি টাকার বালু বিক্রি করা যায়। এ কারণে অনেকে নিজের জমিই বিলীন করে দিচ্ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নদীপথে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আপনি কঠোর অবস্থানের কথা বললেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। এর কারণ কী?
কামরুজ্জামান কামরুল: বিষয়টি দীর্ঘ ১৫ বছরের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে। যেখানে ৫০ পয়সা নেওয়ার কথা, সেখানে দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় হচ্ছে। এ কারণে কেউ না কেউ কোনোভাবে জড়িত হয়ে যাচ্ছে। আমি বিভিন্ন সময়ে ওসি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্পটে পাঠিয়েছি। ফাজিলপুর টোলটেক্স ও ঘাগড়াঘাটসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি। কিন্তু অভিযান চালানোর পর কিছুদিন পরিস্থিতি ঠিক থাকলেও, আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনি বলেছেন, আপনার নিজের স্বজন কিংবা দলের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
কামরুজ্জামান কামরুল: আমি প্রশাসন ও সাংবাদিকসহ সবাইকে বলতে চাই, আমি কারও জন্য সুপারিশ করি না। এই ধরনের কাজে যে—ই জড়িত থাকুক, সে আমার ভাই হোক, আত্মীয় হোক কিংবা বিএনপির বড় নেতা হোক—তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমি এ কথা প্রকাশ্যেই বলে আসছি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়েছে। সামনে কি আবার ইজারা দেওয়া হতে পারে, নাকি খাস আদায়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা হবে?
কামরুজ্জামান কামরুল: যতটুকু জানি, আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে যে মেয়াদ ছিল, সেটিও শেষ হয়েছে বলে শুনেছি। নতুন করে খাস কালেকশনের একটি সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কখন এবং কীভাবে দেওয়া হবে, তা আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর কেটে গ্রাম বিলীন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগানও ঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিযোগ। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
কামরুজ্জামান কামরুল: আমাদের চেষ্টা করতে হবে গ্রামগুলো রক্ষা করার। ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান সারা বাংলাদেশের মধ্যে পরিচিত একটি জায়গা। সেখানে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। এটিকেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পাটলাই ও যাদুকাটা নদীতে বালু—পাথর ও কয়লাবাহী নৌযান থেকে বিভিন্ন পক্ষ চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আপনার বক্তব্যের পরও কেন এটি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না?
কামরুজ্জামান কামরুল: যারা চাঁদাবাজি করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাদের এ কাজ থেকে সরানো কঠিন। তবে আমি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। এখানে নৌ পুলিশ দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছি। এসপি ও নৌ পুলিশের এসপির সঙ্গেও কথা বলেছি। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে আমি নিয়মিত কথা বলছি। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি যেভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরছি, অন্যদেরও সহযোগিতা করতে হবে। চাঁদাবাজ হয়তো চার—পাঁচজন বা ১০ জন, কিন্তু আমরা হাজার হাজার মানুষ। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন