প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৫২
সুনামগঞ্জের আলোচিত বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদীতে আগামী ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এসময় নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিপরীতে সরকারি রাজস্ব আদায় করা হবে। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যাদুকাটায় পাড়কাটা ও পরিবেশ প্রতিবেশ সুরক্ষার জন্যই এই উদ্যোগ বলে দাবি করা হয়েছে।
ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় জেলার যাদুকাটা নদীর ‘যাদুকাটা—১’ ও ‘যাদুকাটা—২’ বালুমহাল থেকে সব ধরনের বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। গেল ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল দুটির ইজারা কার্যক্রমসহ সব ধরনের বালু উত্তোলন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
তবে বালুমহাল থেকে সরকারি রাজস্ব আদায় এবং বৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হবে, সেই বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে জেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে আগামী ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার মাধ্যমে সবোর্চ্চ দরদাতা নির্বাচিত করে খাস আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করা হবে।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনিয়ম, নদীর তীর ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
.jpg)
আগামীকাল বৃহস্পতিবার জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে খাস আদায়ের মাধ্যমে আগামী ছয় মাস বালু উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, দেওয়া হলে কীভাবে তা পরিচালনা করা হবে এবং রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি কী হবে, এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, পাড়কাটা, অবৈধ খননযন্ত্র বোমা মেশিন, ড্রেজার মেশিন, সেভ মেশিনসহ নানা জাতের যন্ত্র দানব কাজে লাগিয়ে সুনামগঞ্জের সর্ববৃহৎ বালু—পাথর মহাল যাদুকাটায় গেল ২০ বছরেরও বেশি সময় হয় অত্যাচার চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যাদুকাটার পাড় কাটতে কাটতে এমন অবস্থা হয়েছে, এই নদীর প্রশস্ততায় এখন দেশের বৃহৎ নদী পদ্মা— মেঘনারও লজ্জ্বা পাবার মত অবস্থা হয়েছে।
১৯৯৬ সালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও জাতীয় নেতাদের সহযোগিতায় প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৭৬ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন এই মহাল। এরপরের চার বছর আাজম খান ও শ্রীপুর দেবোত্তর স্টেইটের নামে কাউকে কোন টাকা না দিয়েই রয়েলিটি আদায় করেন ইজারাদার জয়নাল আবেদীনের লোকজন। জয়নাল আবেদীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায়ই এই মহালের মালিকানার গেজেট হয় খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নামে। ২০০১ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ২০০২ এর এপ্রিল পর্যন্ত মহাল শাসন করেন প্রয়াত রাজনীতিবিদ সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেনসহ তাঁর সমর্থক বিএনপি নেতারা। ওই সময় নোয়াখালীর রফিক উল্লাহ্ ও বশির আহমদের মালিকানাধীন প্লাওয়ার ট্রেড ইন্টার ন্যাশনাল ও সৌদা এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে মাত্র চার লাখ টাকায় সাত মাসের জন্য সাব ইজারা নেন তারা। জানা গেছে, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ওই সময় ছয় বছরের জন্য ১২ লাখ টাকায় ইজারা দিয়েছিল নোয়াখালীর ওই দুই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে। এরপর আবার এই মালিকানা বদল হয়। বিশ^ম্ভরপুরের শাহ্পুরের মাওলানা বদর উদ্দিনের নামে ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরে ১২ লাখ টাকায় ইজারা হয় মহালের। ওই পর্বে নেপথ্যে ছিলেন তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ বিএনপির ১৫ জন নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। তাদেরকে শর্ত দেওয়া ছিল বছরে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে ২৫ শতাংশ।
২০০৯ সালে ক্ষমতার পালা বদল হলে লুটপাটের এই ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ স্থানী কয়েক ব্যবসায়ী। কোন রাজস্ব না দিয়েই ২০০৯ থেকে ২০১৪ খ্রি. পর্যন্ত চলে মহালে লুটপাট। এই সময়ে পাড় কাটা, ড্রেজার ও বোমা মেশিনের শব্দ শুনা শুরু হয় যাদুকাটা পাড়ের গ্রামবাসীর।
২০১৫—২০১৬ ইংরেজিতে দশ লাখ টাকা বছরে রাজস্ব দিয়ে আবার মহাল ইজারা হয় সুনামগঞ্জের তোফাজ্জল হকের নামে। মূলত এমপি রতনসহ আগের ইজারাদাররাই তোফাজ্জল হকের নামে ইজারা নেন। ২০১৭ ইংরেজি পর্যন্ত এরাই ভোগ দখলে ছিলেন নামেমাত্র রাজস্ব দিয়ে। ২০১৮ ইংরেজিতে সাবেক জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম এই মহাল থেকে কৌশলে রাজস্ব বঞ্চিত করার বিষয়ে সরকারের উর্ধ্বতনদের অবহিত করেন। একপর্যায়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সাত কোটি ৫০ লাখ টাকায় ইজারা হয় মহাল।
২০২১ সালে এসে আবার নানা কৌশলে কিছু অংশ মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় ১২ কোটি টাকায় ইজারা নেন আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম আহমদ ও আজাদ হোসেন। তবে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে তাদের কোন সীমারেখা ছিল না। ২০২২ সালে একইভাবে ১২০ হেক্টর খনিজ মন্ত্রণালয় থেকে ১৬ কোটি টাকায় ইজারা নিয়ে পুরো মহাল শাসন করেন এরাই। ২০২৩ সালে ইজরাদার রতন মিয়া ও যুবলীগ নেতা মঞ্জুর খন্দোকার ৭০ কোটি টাকায় যাদুকাটা—১ ও ২ ইজারা নেন। ওই সময় পাড় কাটা ও ড্রেজারসহ সকল প্রকার খনন যন্ত্রের মেলা বসে যাদুকাটায়। স্থানীয় সংসদ সদস্য রনজিত সরকারসহ সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ দায়িত্বশীল নেতারাই তখন পরোক্ষ—প্রত্যক্ষভাবে ইজারাদারদের সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রতিবাদকারীরাও দুর্বল হয়ে যায়। অসৎ পুলিশ—সাংবাদিক সকলেই ওই সময় থেকে লুটের ভাগ পাওয়াও শুরু হয়। ২০২৪ সালে আবার জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মুজিবুর রহমান ও রতন মিয়া এই দুই মহালের ইজারা নেন। ওই বছর সিণ্ডিকেট করে যাদুকাটার রাজস্ব কমিয়ে দেওয়া হয়। সরকার বিপুল অংকের টাকা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এই খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়। ২০২৫ সালে ১০৭ কোটি টাকায় যাদুকাটা ইজারা নেন শাহ্ রুবেল ও নাছির মিয়া নামের দুজন ইজারাদার।
আদালতে মামলা থাকায় দরপত্র গ্রহণের পর প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় পর পাড় না কাটা, ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে বালু না তোলা পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ করা যাবে না শর্তে আদালতের আদেশে তাদের কাছ থেকে রাজস্ব গ্রহণ করে জেলা প্রশাসন। ইজারা ব্যবস্থাপনায় শাহ্ রুবেল ও নাছির মিয়ার সঙ্গে পঁুজি বিনিয়োগে বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাসহ আওয়ামী লীগেরও ধনাঢ্যরা ছিলেন বলে প্রচার আছে।
বিগত বছরে অনেকটা মব কায়দায়
পাড় কাটা হয়েছে
গেল বছরের (২০২৫ ইংরেজিতে) আট নভেম্বর থেকে চার পাঁচদিনে আলোচিত এই সীমান্ত নদীর পাড় কেটে বালু লুট হয়েছে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার। ওইদিন (আট নভেম্বর) রাত ১২ টার পর হঠাৎ করেই দুই থেকে আড়াই হাজার বাল্কহেড প্রবেশ করে যাদুকাটায়। একেকটি বাল্কহেড ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক ছিল। এদের দেখে মনে হয়েছে পূর্ব থেকে পরিকল্পনা করে একসঙ্গে ঢুকেছে তারা। এরা তাহিরপুর সীমান্তের সবচেয়ে বড় বিজিবি ক্যাম্পের (লাউড়েরগড়) কাছাকাছি স্থান থেকে নদীরপাড়ের সাহিদাবাদ পর্যন্ত পাড় কাটা শুরু করে। একইভাবে চারদিন লাগাতার দিনে রাতে পাড় কেটেছে তারা। ঘটনার আকস্মিতকতায় হতভম্ব হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও। বিজিবি’র পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে লুট শুরু’র একদিন পরই জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
পাড় কাটার এই ঘটনায় ইজারাদারদেরও দায়ী করা হয়, গণমাধ্যমে ছাপা হয় তিনটি পক্ষ এখানে লাভবান হয়েছে, একপক্ষ পাড়ের সরকারি জমি বিক্রয় করেছে, আরেকপক্ষ এই জমি থেকে বালু কেটে নিয়ে বিক্রয় করেছে, আরেকপক্ষ রয়েলিটি নিয়েছে। ওই ঘটনার সময় তাহিরপুর থানা পুলিশ, কিছু সাংবাদিক এবং প্রভাবশালী রাজনীতিকদের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে।
ইজারাদার নাছির মিয়া অবশ্য এই ঘটনার পর সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলেছিলেন, পাড় কাটা ঠেকাতে পাড়ের দিকে বাশ দিয়ে আড় দেওয়া হয়েছে তাদের উদ্যোগে। তিনিও ওখানে পুলিশ ক্যাম্প বসানোর দাবি করেছিলেন।
রয়েলিটি আদায়ের
নামে জুলুম হয়েছে
যাদুকাটায় রয়েলিটি আদায়ের নামে জোর— জুলুম পাঁচ আগস্টের আগেও হয়েছে, পরে সেটি আরও বেড়েছে। গেল পাঁচ আগস্টের পর বর্তমান সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরুল ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আনিসুল হকসহ রাজনীতিবিদদের চেষ্টায় প্রতিফুট বালু ১৫ টাকার স্থলে নয় টাকা আদায়ে বাধ্য হয় ইজারাদার। স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয় এই উদ্যোগ। কয়েকদিন নয় টাকা আদায়ের পর, আবার ১১ টাকা আদায় করতে থাকে ওই ইজারাদার কতৃর্পক্ষ। নয় টাকা থেকে ১১ টাকা করতেও ওখানকার রাজনৈতিক নেতাদের সম্মতি ছিল বলে স্থানীয় বিএনপি নেতারাই জানিয়েছিলেন। এরপর ওই মহালে প্রতি ফুট বালুর রয়েলিটি ২০ টাকাও আদায় হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি একেএম আবু নাছার বললেন, যাদুকাটা বালু মহালে বালু নেই। তাহলে কিভাবে প্রশাসন খাস আদায় করবে? এখন নদীর পাড় কাটা ছাড়া কোনো বালু নেই। এই কাজই হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তাই আমরা অনুরোধ করবো যাদুকাটা নদীতে ইজারা বা খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, রাজস্ব আদায়ের জন্য যাদুকাটা নদীর বালু বহাল থেকে খাস আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সবোর্চ্চ দরদাতাকে দায়িত্ব প্রদান করা হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কমিটির সভা রয়েছে। ওই সভায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন