টাঙ্গুয়ার হাওরের ইতিবাচক রূপান্তর দেখতে চাই

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৩

একজন জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক বলেছিলেন, দার্শনিকেরা এই পৃথিবীকে বিভিন্নভাবে কেবল ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো একে পরিবর্তন করা। আমরা এই কথার মর্ম উপলব্ধি করে কেবল বলতে চাই, টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে অনেক ব্যাখা—বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু আসল কাজ হলো হাওরের ঐতিহ্য ও উৎপাদনশীল চরিত্র ফিরিয়ে আনা। পরিবর্তনের এই কাজে দশকের পর দশক ধরে সীমাহীন ব্যর্থতা দেখে দেখে আমরা এতোটাই হতাশ হয়ে গেছি যে, এখন আর কোনো কথায় আশাবাদ জাগ্রত হয় না। এই আশাবাদের জাগরণ ঘটাতে দরকার দৃশ্যমান কাজ। যে কাজে হাওর ফিরে পাবে লুণ্ঠিত—হারানো প্রাকৃতিক ঐশ^র্য। শুক্রবার সুনামগঞ্জের সার্কিট হাউস সভাকক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’—এর আয়োজনে জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার বিষয়ক মতবিনিময়’ সভা হয়েছে। যেখানে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সারগ্রাহী বক্তব্য দিয়েছেন। বলা হচ্ছে— ‘জলাভূমি সম্পদ’—এর ব্যবহার, আমাদের প্রশ্ন হলো টাঙ্গুয়ার হাওরে কি এখন কোনো জলাভূমি সম্পদ অবশিষ্ট আছে ? হাওরের মাছ গেছে, গাছ গেছে, পাখি গেছে, লতাগুল্ম গেছে। আমাদের নিকৃষ্ট ব্যবস্থাপনার কারণে টাঙ্গুয়ার হাওর নিরাভরণা হতশ্রী চেহারা নিয়ে এখন কেবল জলের মরুভূমিতে পরিণত হয়ে আছে। এই জলের উপর দিয়ে উল্লাসরত পর্যটকরা যান্ত্রিক নৌ—দানবে চড়ে আনন্দ—ফূর্তি করতে করতে হাওরের কঙ্কালটিকেও এখন বিলীন করে দিতে চাইছেন। এরকম অবস্থায় হাওরের জলাভূমি সম্পদ এর ব্যবহার হবে কী উপায়ে ? আসল কাজ হলো, হারিয়ে যাওয়া সম্পদের পুনরুদ্ধার করা। আদৌ এই কাজ সহজ কিছু নয়। বিশেষ করে প্রচলিত ‘সিস্টেমে’ এটি আদৌ সম্ভব কি—না তাও আরেক ধাঁধা বটে। এর আগেও এরকম বিদেশি দাতাদের অর্থায়নে এই হাওরে সমাজভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। মূলত ওই সময়েই টাঙ্গুয়া যাবতীয় সম্পদ ও উৎপাদনশীলতা হারিয়েছে। একই কায়দায় একই ধরনের বিদেশি অর্থায়নে এখন নতুন যে প্রকল্প চালু হতে যাচ্ছে, তার প্রভাব দেখতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। 

 


টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন দৃঢ়চেতা ও জুৎসই ব্যবস্থাপনা কৌশল, কাঠামো এবং পরিকল্পনা। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ যদি উপযুক্ত ক্যারিসমা দেখাতে পারেন তাহলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই প্রকল্পের বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানা না গেলেও যতটুকু জানা গেছে তাতে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে— বাস্তুততন্ত্র পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, বিকল্প জীবিকা ও সমাজভিত্তিক সহ—ব্যবস্থাপনা। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শাব্দিক জাদুমায়ায় ভরপুর, অতীতে যে—রকমটি ছিলো। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে নিবেদিত থাকার পরিবর্তে যদি প্রকল্পটি আগের মতো নিস্ফলা চেহারা নিয়ে হাজির হয় তাহলে এর মধ্য দিয়ে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সুবিধা হতে পারে, টাঙ্গুয়ার হাওরের কোনো পরিবর্তন হবে না। হাওরপাড়ের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হলে শক্তিশালীভাবে করতে হবে। এই সম্পৃক্তিকরণ যাতে আবারও পুরনো লুটপাটের নতুন সংস্করণ না হয় সে—দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ—জন্য প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, পর্যালোচনা ও নাগরিক নজরদারির ব্যাপকতা দরকার। এ—রকম প্রকল্প বাস্তবায়নে লুকোচুরি করার প্রবণতা থাকে। বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্প হলেও এর অর্থবহ পরিবর্তন ও প্রভাবের বিষয়টি সর্বদা স্থানীয় জনসাধারণকে অবহিত না করা হলে প্রকল্পটি হয়তো অর্থ—ব্যয়ের ক্ষেত্রে সফল হবে, কিন্তু হাওরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অসফলই থেকে যাবে। 

 


টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র, উদ্ভিদবৈচিত্র, প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ কৃষিক্ষেত্রে এই হাওরের শক্তিশালী ঐতিহাসিক চরিত্রকে ফিরিয়ে আনার দাবি সমগ্র হাওরবাসীর। এটি কেবল একটি হাওরই নয়, এটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত ঐতিহ্য। এটি এই অঞ্চলের উৎপাদন—অর্থনীতি এবং জীবন—জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী এক অপরিহার্য সত্ত্বার নাম। এই হাওরের উৎপাদনশীলতা ফিরিয়ে আনা গেলে মিঠা পানির সুস্বাদু মাছের উৎপাদন বাড়বে, পাখ—পাখালির ডাকে প্রকৃতির সৌন্দর্যের উদ্ভাসন ঘটবে, নানা জাতের বৃক্ষ ও উদ্ভিদের সমারোহের মধ্যে প্রাণ—প্রকৃতি নিজের বেঁচে থাকার উপায় খোঁজে নিবে। হাওরকে সালঙ্করা রূপে ফিরিয়ে আনতে খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। বন্ধ করতে হবে কেবল হাওরের উপর নির্মম অত্যাচার। তখন প্রকৃতিই হাওরকে পুনর্গঠন করে নিবে। এইটুকু নিরুপদ্রব পরিবেশ উপহার দিতে পারলেই হাওরের উন্নযনের জন্য বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি সার্থকতা লাভ করবে। নতুন প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব দেখার জন্য সমগ্র হাওরবাসী অপেক্ষায় রয়েছেন।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার