প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৪
অপরাধী যতো বড় অপরাধই করে থাকুক না কেন, তাকে আইনের হাতে তোলে দেয়ার আগে গণপিটুনি ও চোখে চুনমিশ্রিত পানি ঢেলে দেয়ার মতো পৈশাচিকতা প্রদর্শন সভ্য সমাজের রীতি হতে পারে না। এমত কর্মকাণ্ড সমাজের স্থিতিশীলতা ভয়ানকভাবে নষ্ট করে। আইনি কাঠামো বলবৎ থাকলেই সমাজের শান্তি—শৃঙ্খলা বজায় থাকে, এর ব্যত্যয় ঘটলে অরাজকতা বৃদ্ধি পায় যা মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাসের অন্তরায়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের পালইছড়া গ্রামে গরু চোর সন্দেহে আটক তিন ব্যক্তিকে গণপিটুনি ও চোখে—মুখে চুনমিশ্রিত পানি ঢেলে পরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। সংবাদ—তথ্য থেকে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের দুইটি গরু চুরি হয়। ওইদিন ভোরে পালইছড়া গ্রামে গরুসহ সোনাই মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দেখা যায়।
স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তাকে আটক করা হয়। স্থানীয়রা সোনাই মিয়ার স্বীকারোক্তি মতে চুরির সাথে জড়িত আবুববক্কর ও নিজাম উদ্দিন নামের দুই ব্যক্তিকে আটক করে আনেন। এ সময় ‘উত্তেজিত জনতা’ চোর সন্দেহে আটক তিন ব্যক্তিকে মারধর করেন এবং তাদের চোখে চুন ঢেলে দেয়া হয়। গণপ্রহারে আবুবক্করের একটি পা ভেঙে যায়। খবর পেয়ে দোয়ারাবাজার থানা পুলিশ জনতার হাতে ধরা পড়ে প্রহৃত হওয়া তিন চোরকে আটক করে। দোয়ারাবাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আটক ব্যক্তিদের সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলে সদর হাসপাতাল থেকে তাদের সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সবচাইতে অবাক করা ঘটনা হলো— একজন বিএনপি নেতা ও একজন ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে রীতিমতো সালিশ করে আটক চোরদের মারধর ও চোখে চুন ছিটানো হয়েছে। বিষয়টি কেবল লোমহর্ষক ও বর্বরই নয় বরং প্রচলিত আইনি কাঠামোকে অস্বীকার করে নিজের হাতে আইন তোলে নেয়ার মাধ্যমে ভিন্ন আরেকটি অপরাধকর্ম সংঘটিত হয়েছে।
চোর সন্দেহ হলে কাউকে আটক করা এবং পুলিশে সোপর্দ করা যেকোনো নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু চোর ধরে তাকে মারপিট ও চোখে চুন ছিটানোর ফলে আটককৃতদের গরু চুরির অপরাধকে ছাপিয়ে অন্য আরেকটি বড় অপরাধ করার ক্ষমতা কোনো সালিশ ব্যক্তিত্বের নেই। সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদে দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে যে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে গরুর মালিক লিখিত অভিযোগ করলে তাদের গ্রেফতার দেখানো হবে। কিন্তু পালইছড়া গ্রামে যে নির্মমভাবে চোর সন্দেহে আটকৃকতদের বেদম প্রহার ও চোখে চুন দেয়ার মতো বর্বরতা হলো সে বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো মতামত দেননি। কেন ? চোর হলেই কি কাউকে যত্রতত্র যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে মেরে আহত করা যায় ? অপরাধীর সাজা দেয়ার দায়িত্ব দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার। এর বাইরে কাউকে কোনো সাজা দেয়ার অধিকার আর কারও নেই। চোর সন্দেহে আটকৃকতদের মারধর করার ঘটনায় জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা দরকার। নতুবা সমাজে এই ধরনের অরাজকতার প্রসার ঘটবে। আইন নিজের হাতে তোলে নিয়ে যারা কাউকে আঘাত ও আহত করে, দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুষ্পষ্ট পদ্ধতি বর্ণিত আছে। তাই গরুচোরদের যেমন আইনের মুখোমুখী দাঁড় করাতে হবে তেমনি এই চোর সন্দেহভাজনদের মেরে আহত করার জন্য দায়ীদেরও একইভাবে আইনের আওতায় নিতে হবে।
চোখে চুন ঢালার কারণে সংশ্লিষ্টদের চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে এক ব্যক্তির পা ভাঙায় উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে তিনিও পঙ্গুত্ববরণ করতে পারেন। তাই সর্বাগ্রে আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। চোর হলেও তাদের নাগরিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। তাদের কৃত অপরাধের সাজা নিশ্চয়ই পাবে কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বেআইনিভাবে তাদের মেরে আহত করে ফেলা হবে। সম্প্রতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে অসহিষ্ণুতা, সংযমের অভাবসহ নানবিধ অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। তুচ্ছ কারণে হিংসাশ্রয়ী হয়ে উঠার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। পালইছড়া গ্রামের সালিশ ব্যক্তিরা যদি আটককৃত চোরদের মারধর না করে পুলিশের হাতে তুলে দিতেন তাহলে নাগরিক কর্তব্য পালনের একটি অনুপম দৃষ্টান্ত তৈরি হতো। কিন্তু তাঁরা সেটি না করে নির্মমতার এক উদাহরণ তৈরি করলেন। এমন তৎপরতাকে প্রশ্রয় দেয়া একেবারেই অনুচিত। নতুবা অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই সন্দেহভাজন ব্যক্তির জীবন সংশয় হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে। এ বিষয়ে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ দেখার জন্য সকলেই অপেক্ষমাণ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন