মুক্তমত

কিশোর অপরাধ ও কিশোর গ্যাং: দায় কার? করণীয় কী?

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:০৬

কিশোর—কিশোরীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু পারিবারিক অশান্তি, খারাপ সঙ্গ, মাদক, সামাজিক অবক্ষয় ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সংঘবদ্ধভাবে অপরাধে যুক্ত হয়ে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

 

 


কিশোর অপরাধ ও গ্যাং
আইন ও সামাজিক মূল্যবোধবিরোধী কাজে কিশোরদের জড়িয়ে পড়াকে কিশোর অপরাধ বলা হয়। কয়েকজন কিশোর সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে তাকে কিশোর গ্যাং বলা হয়। মারামারি, ছিনতাই, চুরি, মাদক, চাঁদাবাজি, ভয় দেখানো ও অনলাইন হয়রানি এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কিশোর অপরাধ ও গ্যাং সৃষ্টির কারণ—

 

 


ক. পারিবারিক কারণ:
বাবা—মায়ের সময় ও নজরদারির অভাব। পারিবারিক কলহ, অশান্তি ও বিচ্ছিন্নতা। অতিরিক্ত শাসন অথবা সন্তানের প্রতি অবহেলা। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাব।

 

 


খ. সামাজিক কারণ:
খারাপ বন্ধু ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির সংস্পর্শ। মাদক ও অপরাধের সহজ বিস্তার। খেলাধুলা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

 


গ. শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত কারণ:
বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি বা পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্নতা। নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। সহিংস ও অপরাধমূলক কনটেন্টের প্রভাব।

 


ঘ. ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক কারণ:
দ্রুত অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। হতাশা, একাকিত্ব ও ভুল পরিচিতি তৈরির প্রবণতা। অর্থনৈতিক সংকট ও মাদকাসক্তি।

 


প্রতিরোধে পরিবারের করণীয়:
সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে এবং তার সমস্যা শুনতে হবে। ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা ও নজরদারি রাখতে হবে। সন্তানের বন্ধু ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে। অপরাধ বা মাদকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হবে।

 


প্রতিরোধে সমাজের করণীয়:
পাড়া—মহল্লায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। কিশোরদের জন্য পাঠাগার, ক্রীড়া ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে।

 


প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়:
মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। মাদক ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু—কিশোরদের জন্য সংশোধন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। অনলাইন অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 


কিশোরদের নিজেদের করণীয়:
ভালো বন্ধু নির্বাচন করতে হবে। মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে। পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকতে হবে। অপরাধী গোষ্ঠীর প্রলোভন বা চাপ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

 


কার দায় কতটুকু?
কিশোর অপরাধের জন্য এককভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করা যায় না। পরিবারের দায়িত্ব সবচেয়ে প্রাথমিক, কারণ মূল্যবোধ ও আচরণ গঠনে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের দায়িত্ব নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিক্ষা, নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কিশোরেরও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।

 


প্রতিকার:
অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের শুধু শাস্তি না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। 
কিশোর অপরাধ ও গ্যাং সৃষ্টি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা। এর সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারিবারিক ভালোবাসা, নৈতিক শিক্ষা, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রেখে যোগ্য ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।


লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (ভৌত বিজ্ঞান), সরকারি সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।

উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার