প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:১৪
শিশুরা পরিবার ও সমাজের সবচেয়ে কোমল এবং সম্ভাবনাময় অংশ। আজকের শিশুই আগামী দিনের নাগরিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মানুষ। তাই একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া নয় বরং ভবিষ্যৎ সমাজকে নিরাপদ ও মানবিক করে তোলার ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের চারপাশ সবসময় শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। ঘর, বিদ্যালয়, রাস্তা, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ডিজিটাল জগতেও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে।
শিশুর ঝুঁকি বলতে শুধু শারীরিক আঘাতকে বোঝায় না। মানসিক নির্যাতন, অবহেলা, বুলিং, যৌন হয়রানি, শিশুশ্রম, শোষণ, সড়ক দুর্ঘটনা, অনলাইন হয়রানি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতারণাও শিশুর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এসব ঝুঁকি সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা যত বাড়বে, শিশুদের নিরাপদ রাখার সুযোগও তত বাড়বে।
নিরাপদ পরিবেশ কেন প্রয়োজন
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু যখন ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপত্তার মধ্যে বড় হয়, তখন তার আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং সে নিজের কথা প্রকাশ করতে শেখে। অন্যদিকে ভয়, অপমান, নির্যাতন বা অনিরাপত্তার পরিবেশ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অনেক সময় শিশুর আচরণে পরিবর্তন দেখা গেলেও বড়রা বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অথচ শিশুর আচরণ অনেক সময় তার ভেতরের সমস্যার একটি সংকেত হতে পারে। তাই শিশুর কথা শোনা এবং তার আচরণের পরিবর্তনের প্রতি মনোযোগী হওয়া জরুরি।
ঝুঁকি শুধু অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না
শিশুকে প্রায়ই বলা হয়, ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না। এটি প্রয়োজনীয় শিক্ষা হলেও শিশুর নিরাপত্তার জন্য একমাত্র শিক্ষা নয়। কারণ শিশু কখনো পরিচিত পরিবেশেও সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। বিদ্যালয়, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, খেলাধুলার জায়গা, যাতায়াতের পথ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সব জায়গাতেই শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই শিশুকে ব্যক্তিভেদে নয়, আচরণভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া বেশি কার্যকর। কোনো আচরণে সে অস্বস্তি বোধ করলে বা ভয় পেলে কী করবে, কাকে জানাবে এবং কীভাবে সাহায্য চাইবে এসব বিষয় তাকে বয়স অনুযায়ী বোঝানো প্রয়োজন।
শিশুকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে
শিশুর নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশু যেন তার সমস্যার কথা বলতে ভয় না পায়। অনেক শিশু কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলেও তা প্রকাশ করে না। কারণ সে হয়তো মনে করে তাকে বকা দেওয়া হবে, কেউ বিশ্বাস করবে না অথবা ঘটনাটির জন্য তাকেই দায়ী করা হবে। তাই বাবা মায়ের উচিত শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। প্রতিদিন কিছু সময় তার সঙ্গে কথা বলা, স্কুলের খবর নেওয়া, বন্ধুদের সম্পর্কে জানা এবং তার আনন্দ কষ্টের কথা শোনা প্রয়োজন। কোনো শিশু অভিযোগ করলে তাকে প্রথমেই দোষারোপ করা উচিত নয়। শান্তভাবে তার কথা শুনতে হবে। শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে হবে এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হব।
শিশুকে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখাতে হবে
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া দরকার। তাকে শেখাতে হবে যে, কোনো আচরণে অস্বস্তি হলে সে ‘না’ বলতে পারে এবং নিরাপদ কোনো বড় মানুষের কাছে বিষয়টি জানাতে পারে। কেউ যদি তাকে ভয় দেখিয়ে কোনো বিষয় গোপন রাখতে বলে, তাহলেও বিশ্বস্ত অভিভাবক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানানো উচিত এ কথাও তাকে বোঝাতে হবে। তবে নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে গিয়ে শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত ভয় তৈরি করা উচিত নয়। বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কীভাবে নিরাপদ থাকা যায়, সেটিই শেখানো প্রয়োজন।
বিদ্যালয় হোক নিরাপদ স্থান
শিশুর দিনের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে কাটে। তাই বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ ও শিশুবান্ধব হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ে বুলিং, অপমান, শারীরিক শাস্তি কিংবা হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর সচেতনতা প্রয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শিশুর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। কোনো শিশু হঠাৎ বিদ্যালয়ে যেতে না চাইলে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জায়গার ব্যাপারে ভয় প্রকাশ করলে কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তবে কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করে যথাযথভাবে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
অনলাইনেও শিশুর নিরাপত্তা প্রয়োজন
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট শিশুদের শিক্ষা ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অনলাইন জগতে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ার করা, সাইবার বুলিং, প্রতারণা এবং অনুপযুক্ত কনটেন্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অভিভাবকদের তাই শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। শুধু মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে নিরাপদ ব্যবহার শেখানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে বোঝাতে হবে পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। কোনো অস্বস্তিকর যোগাযোগ হলে তা গোপন না রেখে বিশ্বস্ত বড় কাউকে জানাতে হবে।
শিশুর আচরণে পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিন
শিশু সবসময় মুখে তার সমস্যার কথা বলতে পারে না। কখনো তার আচরণের মধ্য দিয়েও সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। হঠাৎ অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া, ঘুমের পরিবর্তন, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ভয়, নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে অনীহা কিংবা সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা গেলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তবে এসব লক্ষণ দেখলেই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয় । শিশুর সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুশ্রম ও শোষণ
দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকটের কারণে অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হয়। এতে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশ্রাম ও স্বাভাবিক শৈশব ব্যাহত হতে পারে। একটি শিশুর হাতে বই ও শিক্ষার সুযোগ থাকার কথা তার শৈশব যেন অকাল দায়িত্বের ভারে হারিয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব। শিশুশ্রমের পেছনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলা না করলে শুধু সচেতনতার মাধ্যমে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। তাই পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের
শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার চলাফেরা সম্পর্কে বয়সোপযোগী ধারণা রাখা এবং তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা এসব সাধারণ বিষয়ই বড় ধরনের ঝুঁকি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু যেন জানে সমস্যায় পড়লে সে বাবা মায়ের কাছে নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে। ভুল করলে বকা দেওয়ার পরিবর্তে ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সত্য কথা বলার জন্য সে ভয় না পায়।
সমাজের দায়িত্বও কম নয়
শিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের বিষয় নয়। শিক্ষক, প্রতিবেশী, স্থানীয় সমাজ, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সবার দায়িত্ব রয়েছে। কোনো শিশুর প্রতি গুরুতর নির্যাতন বা ঝুঁকির বিষয় জানা গেলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে যাচাই না করে গুজব ছড়ানো বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ করাও উচিত নয়। শিশুর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, বয়স অনুযায়ী নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া। তৃতীয়ত, বিদ্যালয় ও অনলাইন পরিবেশ নিরাপদ করার বিষয়ে সচেতন থাকা। চতুর্থত, শিশুর আচরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া। পঞ্চমত, কোনো অভিযোগকে উপেক্ষা না করে দায়িত্বশীলভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করা। ষষ্ঠত, শিশুর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও অধিকারকে সম্মান করা।
একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব তার অধিকার। শিশুকে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষা দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না তাকে নিরাপদ পরিবেশ, ভালোবাসা, সম্মান এবং নিজের কথা বলার সুযোগও দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে শিশু দুর্বল নয়, কিন্তু নিরাপদ বেড়ে ওঠার জন্য সে বড়দের দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভরশীল। আজ আমরা যদি পরিবারের ভেতর সচেতনতা তৈরি করি, বিদ্যালয়কে নিরাপদ করি, অনলাইন ব্যবহারে শিশুকে সচেতন করি এবং সমাজে দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলি, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। শিশুর হাসি যেন ভয় ও অনিরাপত্তায় থেমে না যায় এ দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক : এমকম (হিসাববিজ্ঞান), এমপিএইচ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য)। সহকারী অধ্যাপক হিসাব বিজ্ঞান, আজীবন সদস্য— হিসাববিজ্ঞান ফোরাম, সিলেট।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন