প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৪৬
গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেলার সহকারি শিক্ষক পদে উপজেলাওয়ারী নিয়োগপত্র জারি করেছেন। এই নিয়োগে সহকারি শিক্ষক পদে মোট ৪৯৭ ব্যক্তি চাকুরি পেয়েছেন। তাঁদের যোগদানপত্র দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে কাগজপত্র যাচাইয়ের পর সহকারি শিক্ষক পদে ৬১৭ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য মনোনীত করা হয়েছিলো এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এই ৬১৭ জনেরই নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু বৃহস্পতিবার জারি করা অফিস আদেশে এই ৬১৭ জনের মধ্যে ১২০ জনকে বাদ দেয়া হয়েছে। কী কারণে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ১২০ জনকে বাদ দেয়া হলো সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ পরিষ্কারভাবে কিছু বলছেন না। তবে ‘চূড়ান্ত যাচাই—বাছাইয়ে’ এই ১২০ ব্যক্তি নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন বলে জানা যায়। কেবল সুনামগঞ্জ জেলা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় সুপারিশকৃত প্রার্থীদের অনেককেই নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি বলে জানা যায়। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি’র ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ আরও কিছু সংগঠন। নিয়োগবঞ্চিতরাসহ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশসহ বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন। এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার দিকেও কেউ কেউ ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ভেরিফিকেশন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলেছেন, ‘যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ নেই, তাঁদের নিয়োগ অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে।’ (সূত্র দৈনিক প্রথম আলো, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। ধারণা করা হচ্ছে, বিগত অন্তবর্তী সরকারের সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ শেষে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করার পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে ওই তালিকা পুনরায় যাচাই বাছাই করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এতে সকল জেলায়ই কিছু সংখ্যক সুপারিশপ্রাপ্ত মেধাবী বাদ পড়েছেন। তবে সুনামগঞ্জের মতো এতো বিশাল সংখ্যক ব্যক্তিকে বাদ দেয়ার ঘটনা অন্য জেলায় নেই। মেধার ভিত্তিতে সুপারিশপ্রাপ্তদের চাকুরি বঞ্চিত হওয়ায় বিষয়টি ইতোমধ্যে সকল মহলের সমালোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের উচিৎ এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য সামনে আনা।
পুলিশ ভেরিফিকেশন সরকারি চাকুরির নিয়োগ লাভের একটি অপরিহার্য ধাপ। পুলিশ ভেরিফেকেশনের মাধ্যমে প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা, প্রার্থীর মামলা ও অপরাধের তথ্য ইত্যাদি যাচাই করা হয়। প্রার্থী বিশেষের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা তাঁর পরিবার ও আত্মীয়—স্বজনের রাজনৈতিক পরিচিতি এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হওয়ার কথা নয়। প্রার্থী কোনো তথ্য গোপন না করলে এবং কোনো মামলা বা অপরাধের সাথে জড়িত না থাকলে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকুরি পাওয়া রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার। কিন্তু অতীতেও এই ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীর বা তাঁর পারিবারিক ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকার কারণে অনেককেই নিয়োগ বঞ্চিত করার অভিযোগ ছিলো। অতীতের সকল মন্দ প্রপঞ্চ থেকে মুক্ত থাকার অঙ্গীকার ছিলো এবার। কিন্তু আলোচ্য নিয়োগ নিয়ে যে ধরনের সমালোচনা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, অতীতের সেই দুষ্ট সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, সুনামগঞ্জের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য মোতাবেক জেলায় সহকারি শিক্ষকের ৮৬৮ টি ও প্রধান শিক্ষকের ৩৪৯টি পদ শূন্য। এই তথ্য ২৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত বলে দেখা যায়। এর পর বদলি, পেনসন ইত্যাদি কারণে আরও কিছু পদ শূন্য হওয়ার কথা। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ জেলায় সহকারি শিক্ষক পদে ন্যূনতম ৮৬৮ জনকে নিয়োগ দেয়া যায়। এই পর্যায়ে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন ৬১৭ জন, যা মোট শূন্য পদের চাইতে অনেক কম। তদ্সত্বেও এই ৬১৭ জনের ১২০ জনকে নিয়োগ না দেয়ার কারণে জেলার সহকারি শিক্ষকের সংকট কাটছে না। সরকার মানসম্মত শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের বহুমুখী পরিকল্পনা দৃশ্যমান। এই জায়গায় সফলতা অর্জন করতে হলে সকল বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন। তাই বাদ পড়া প্রাথীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ না থাকলে তাঁদের নিয়োগ দানের সুযোগ এখনও আছে। নিয়োগের জন্য যাঁরা চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তাঁরা একটি সরকারি চাকুরি পাওয়ার আনন্দে বিভোর ছিলেন। তাঁদের পরিবারেও খুশির পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে যখন তাঁরা নিয়োগবঞ্চিত হলেন তখন তাঁদের মনোকষ্ট কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবিতর্কিত উপায়ে বিষয়টির সুরাহা করা উচিৎ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন